একজন আদর্শ মা শেখ রেহানা

আপ্রান চেষ্টা করেন মানুষকে সহযোগিতা করার


লেখক : আলহাজ্ব এস এম তালাল রেজভী :
একটি ফল, খাদ্যপ্রাণসমৃদ্ধ  মৌমাত-করা ঘ্রাণযুক্ত ফল। আরবি শব্দ ‘রেহানা’র অর্থ এরকমই। শেখ রেহানা, তাঁর একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে। হয়তো এই পরিচয়েই নিভৃতে নিস্তরঙ্গভাবে আনন্দে-সুখে সারাটা জীবন পার করতেন, যদি পঁচাত্তরের নির্মম-নৃশংস ঘটনা না ঘটত। সেই ১৫ আগস্ট চিরদিনের জন্যে উলটেপালটে দিয়েছিল তাঁর ও তাঁর আপা শেখ হাসিনার জীবন। সে এক মহাবৈরী সময়। পাথরসময়। যেন সেই পাষাণের ভার আর নামবে না কোনোদিন। বলা যায়, ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন নতুন সংগ্রামে। তারপরের ঘটনার পরিক্রমা হার মানায় অতি কল্পঋদ্ধ উপন্যাাসকেও।
পনের আগস্টের পর তাঁদের পিছু নিয়েছিল ‘অযোগ্যের উপহাস’। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন- ‘নক্ষত্র খসিল দেখি দীপ মরে হেসে। / বলে, এত ধুমধাম, এই হল শেষে! /রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে,/যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় চুকে।’
অযোগ্যদের ষড়যন্ত্রকারীদের সেই তেল এখন তলানিতে। তারপরও নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ডানা মেলার চেষ্টা করে তাঁদের ঘিরে। এসব ষড়যন্ত্র কীভাবে মোকাবেলা করেন তাঁরা? কোথা থেকে শক্তি পান জীবন- সংগ্রামের। দু:সময়ের দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে কীভাবে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়িযেছেন তাঁরা? কী তাদের জীবনদর্শন?
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুন হওয়ার সময় বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে বেলজিয়াম ছিলেন শেখ রেহানা। পরে দুলাভাই এম ওয়াজেদ মিয়ার কর্মস্থল জার্মানির কার্লসরুই থেকে ভারতে চলে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে। পরে লন্ডনে গিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন শেখ রেহানা। তার তিন ছেলে-মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক লেবার পার্টি থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত। ছোট মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক এখনও শিক্ষার্থী।
শেখ রেহানার পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন শেখ রেহানা। অতীব কষ্টে কালাতিপাত করেছেন, যদিও তাঁর সম্পর্কে রটনা কম নয়। সাদাসিধে ছোট একটি আড়ম্বরহীন ফ্লাটে বসবাস করেন; বাসে, টিউবে-রেলেই চলাফেরা করেন, পার্টটাইম চাকরি করেন। তিন সন্তান-রেদওয়ান সিদ্দক ববি, টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রুপন্তী। টিউলিপ সিদ্দিক কাউন্সিলার নির্বাচিত হয়েছেন লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলের লেবার পার্টির পক্ষ থেকে। বর্তমানে তিনি পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য।
তিনি পারিবারিক, কিছুটা বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু। তার সন্তানরা  ওই দেশের (ব্রিটেনের) নাগরিক। ওখানে পড়াশোনার এত সুযোগ-সুবিধা! মানুষ জমি- বাড়িঘর বিক্রি করে ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠায়। সে চিন্তা থেকই এই সুযোগ থেকে ওদের বঞ্চিত করেন নি। শেখ রেহানা নিজে থেকেও টাকা-পয়সার কারণে পড়াশোনার সুযোগ পাননি- ওটাও একটা কারণ। আর, নিরাপত্তা তো ছিলই। কারণ এখানে ( বাংলাদেশে) নানারকমের হুমকি-টুমকি পেতেন। সেজন্য সন্তানদের ওখানেই পড়ান।

আজকাল যাদের সামর্থ আছে তারা বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। তাদের বাচ্চারা বাংলাটা ভিন্নরকম অ্যাকসেন্টে বলে। কিন্তু তার বাচ্চাদের সাথে কথা বললে মনে হয়,এই সমস্যাটা তাদের নেই। কারণ শেখ রেহানা তার সন্তানদের জন্য প্রথম কথাই ছিল- তারা বাড়িতে বাংলা বলবে। বাংলা পড়তে হবে। কারণ তারা বঙ্গবন্ধুর নাতি। তাদের মা শেখ রেহানার সঙ্গে গ্রামগঞ্জে যেতে হবে। সেখানে আত্মীয়-স্বজন সবাই ইংরেজি পারে না, একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। তো তারা অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলে, কিন্তু বাড়িতে বলত বাংলা। কোনো একসেন্ট দিয়ে তারা বাংলা বলে না। স্পষ্ট বাংলা বলে। বাসায় তাদের মা শেখ রেহানা প্রচুর বাংলা বই পড়াতেন। প্রথম ভাষাটাই তারা বাংলা শিখে।
নজরুল-রবীন্দ্রনাথ আর নেতাজী সুভাষের বই বেশি পড়াতেন। কবিতা পড়াতেন। জীবনানন্দ দাশ ও সুকান্তের কবিতা পড়াতেন। বেগম রোকেয়ার বই তিনি পড়ে পড়ে শোনাতেন।
শেখ রেহানার মা প্রচুর বই পড়তেন। আর পিতার কাছ থেকে তো অবশ্যই। শেখ রেহানা এ্যাডভান্স বাংলার ছাত্রী ছিলেন কলেজে। ছোটবেলায় ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরেরও সদস্য ছিলেন। মাঝে মধ্যে একটা- দুইটা লেখাও ছাপা হত তার।
বড় বোন শেখ হাসিনা এবং পিতা বঙ্গবন্ধুর মত তিনি লেখা-লিখি করেন কিন্তু ছাপানোর ইচ্ছেটা কম। তবে শেখ রেহানা অনেক ঘটনা অল্প অল্প করে লিখে রাখেন। অনেক সময় বিভিন্ন ঘটনা যখন মানুষ পেপারে মিথ্যা কথা লেখে, তখন তিনি মিথ্যা কথাগুলোর সঠিক জবাব লিখে রাখেন- ঘটনা এটা না, ওটা। কেননা তখন শেখ রেহানা ছোট হলেও অনেক ঘটনার স্বাক্ষী। আর বঙ্গবন্ধুর কোনো গুণ না পেলেও স্মরণশক্তিটা তার এখনও আল্লাহর রহমতে খুব ভাল আছে। তিনি একবার যেটা দেখেন বা শুনেন সেটা সহজে ভুলেন না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়- ছোট হলেও দেখেছেন, কিভাবে কি ঘটনা ঘটছে তা কিছু হলেও জানতেন।  অনেক সময় তার মা আলোচনা করতেন। ৬ দফার সময় খুব ছোট ছিলেন। বাড়িতে তো একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। শেখ রেহানা ছোট থেকেই বাচ্চাদের রাজা-রানির গল্পের পাশাপাশি রাজনীতির কথা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখে শুনেছেন।
সংগ্রামের সময় যখন এত কষ্ট এত সংগ্রামের মধ্যেও কিন্তু মা তাদের ভাইবোনদের মানুষ করেছেন। এখনকার দিনে দেখা যায়, পাঁচটা বাচ্চা থাকলে অনেক সময় তিনটাই বখে যায়। আবার বাবা-মা যখন বিখ্যাত হন তখন অনেক সময় বাচ্চাদের মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু তারপরেও তারা একদম মাটির সাথে মিশে বড় হয়েছেন। বিদেশে লেখাপড়া করার পরেও বাংলার মাটির সাথে গ্রামের সাথে একটা সংযোগ তৈরি হয়েছে। যা মা-বাবার দেশের প্রতি ভালবাসা দেখে এবং দাদির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখে নিজের ভেতর থেকে দেশের প্রতি অন্যরকম ভালবাসা জন্মেছে। শেখ রেহানার  মায়ের জীবনে এত কষ্ট, এত সংগ্রাম ছিল! ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য তার মাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। কিন্ডার গার্টেন, শাহীন স্কুল, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পড়ানো, নাচ শেখানো, বুলবুল একাডেমিতে ভর্তি করানো- সবই মায়ের উৎসাহে।
মায়ের সেই শিক্ষাকে আদর্শ করেই নিজের সন্তানদের মানুষ করেছেন শেখ রেহানা। বর্তমানে এই সংযমটা আজকাল বাচ্চারা পারে না। শুধু বলে- দাও দাও। আর মায়েরা খুশি করার জন্য দিয়েও দেয়, সংযম শেখানোর কষ্টটা মায়েরা নিতে চায় না। কিন্তু শেখ রেহানা  নতুন কিছু হাতে দেখলে প্রশ্ন করতেন, এটা কোথায় পেলে? তার সন্তানরাও তার কাছে নতুন কিছু দেখলে প্রশ্ন করে, মা এটা কোথায় পেলে? যেটা তার মাও করতেন।
বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, সেই নৃশংসতার মধ্যেও কিছু মানুষ কুৎসা রটান যে ওই বাড়িতে অনেক সোনা-দানা, সোনার মুকুট। কিন্তু যখন বাড়ি সার্চ করা হলো-তখন এসব কুৎসা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কোথাও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কাগজপত্র- কিছুই দেখাতে পারল না। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িটি ছাড়া আর কোথাও কেউ কিছু দেখাতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলেও না। শেখ রেহানা ও শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে তখন দেশেও আসতে পারতেন না। এই বলে যে, বাক্স ভর্তি টাকা এসেছে। লন্ডনে শেখ রেহানার বিপুল অর্থসম্পদ! এই যে একেবারে বানোয়াট কথা, এসব শুনেও শুধু মাত্র দেশের প্রতি ভালবাসার টানে পড়াশুনা শেষ করে দেশেই ফিরে এসেছেন।  তার বাচ্চাদের যে এত সুন্দর করে মানুষ করেছেন, সেটা দেখলেও আমাদের দেশের অনেকে ভাবে- এইসব অর্জন বুঝি বাংলাদেশে যেমন একে-ওকে ফোন করে পাওয়া যায়, তেমনি করে পাওয়া।

এতকিছুর পরেও শেখ রেহানা চিন্তা করেন, আর ভাবেন তিনি কত ভালো আছেন! আর, তার  থেকে কত কষ্টে আছে কত মানুষ। এই যে ইয়াং মেয়েরা, যাদের স্বচ্ছলতা নেই, যারা বস্তিতে থাকে। জীবনে আনন্দ কী জিনিস জানে না। কর্মজীবী মেয়েদের কত সমস্যা, কত বাধা থাকে। তখন চিন্তা করেন তারা কত লাকি। একটা সাজের জিনিস, একটা লিপিস্টিক পেলে তার মেয়ে কত খুশি হয়! ঠিক রুপন্তীর বয়সের আরেকটি মেয়ে, তারাও পেলে খুশি হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু পায় না। তাই যতটুকু পারেন তিনি আপ্রান ভাবে চেষ্টা করেন মানুষের সহযোগিতা করার।