খাদ্যে ভেজাল- প্রতিদিন খাচ্ছি বিষ!

শের ই গুল:

 

 

(খাদ্যে ভেজাল-বিষ মানদন্ডে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষে। আইনকে সামান্যতম তোয়াক্কা না করার নেপথ্যে ঘুষ-বানিজ্য, আইনের শাসনহীন দেশের দৃষ্টান্তে পরিনত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্যাকেটজাত দুধের ৯৬টির ৯৩টিতেই মিলছে সীসা ব্যাকটেরিয়া, সব রকমের খাবারে ভেজাল স্লোপয়োজনে হত্যা করছে পুরো জাতিসহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, ধীরে ধীরে আমরা বিশে^র ঠকবাজ জাতিতে পরিনত হচ্ছি, ভেজাল খাদ্যের কারনে এ দেশে বসাবস অনিরাপদ হয়ে উঠেছে-হাইকোর্ট। র‌্যাব মহাপরিচালকের সময়উপযোগী দাবি ভেজালকারীদের মৃত্যুদন্ডের বিধান করতে হবে।)

 

 

 

অপরাধপ্রবনতা সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। হাত-পায়ে পচন ধরলে তার চিকিৎসা আছে, অপারেশনে একটি হাত কেটে ফেললেও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। পচন যদি মাথায় ধরে, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অসম্ভবে পরিনত হয়। এই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মানুষের পচনটা ধরেছে মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-অস্ট্রেলিয়ার ওলিংগং বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথভাবে গবেষনা জরিপ করে দেখেছে যে, রাজধানীর ৯৬ শতাংশ মিষ্টি, ২৪ শতাংশ বিস্কুট, ৫৪ শতাংশ পাউরুটি, ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম, অন্যান্য সব খাবারে ফরমালিন সহ ব্যবহার হচ্ছে ক্যামিকেল। চাল, ডাল, আটা, মাছ, গোশত, তেল, ঘি, দুধ, দই, চিনি, ফলমূল, সবজি, মসলা নিত্য প্রয়োজনীয় সব খাবারে ভেজালে সয়লাব। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য, আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী, ডালে ভাতে বাঙ্গালী, দুধে ভাতে বাঙ্গালী নামে পরিচিত।

 

 

এসবের মধ্যে ভেজালের ছড়াছড়ী, চালে পাওয়া গেছে সহনীয় মাত্রার ৩-৪ গুন বেশি ক্রোমিয়াম, গরু মোটাতাজা করার জন্য খাওয়ানো হয় স্টেরোয়েড ট্যাবলেট, মাছ, গোশত, দুধ ও ফলে মিশানো হয় মরনঘাতী ফরমালিন। মাছের নাড়িভুঁড়িতে ইনজেকশন দিয়ে ফরমালিন নামক বিষ ঢুকানো হয়। আরও অভিনব কায়দায় বরফ তৈরীর সময় কারখানায় ফরমালিন মেশানো হয়। তারপর ঐ বরফে মাছ সংরক্ষন করা হয়। অসাধু ব্যবসায়ীদের কু-কীর্তি শুনলে গাঁ শিউরে উঠে। দুধের ছানার পানির সঙ্গে খাওয়ার সোডা, বিষাক্ত পারক্সাইড ও বিষাক্ত ক্যামিকেল মিশিয়ে তৈরী করা হয় কৃত্রিম দুধ।

 

 

এদিকে নামি-দামি খাবারেও ভেজাল, পোলাও, বিরিয়ানী, তেহারি, রোষ্ট, কাবাব, পরোটা, মোগলাই এসব লোভনীয় খাবার খেতে কার না মনে চায়! তেল, ঘি মসলা ছাড়া এসব মুখরোচক খাবার রান্না করা অসম্ভব, কিন্তু সয়াবিন তেলে মিশানো হয় পামঅয়েল, তেলে মিশানো হয় মরিচের গুড়া, সাবান তৈরির ক্যাস্টার অয়েল ও ক্যামিকেল ঝাঁঝ। মিষ্টি কুমড়া, গাজর পিষে রঙ, ফ্লেভার ও প্রিজারভেটিভ মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গাওয়া ঘি, মন ভোলানো চমৎকার বিজ্ঞাপন দিয়ে নাম করা কোম্পানীর খাঁটি গাওয়া ঘি বলে বিক্রি করছে। মরিচের গুড়ার সঙ্গে মিশানো হয় ইটের গুড়া। ধনিয়ার সঙ্গে মিশানো হয় কাঠের গুড়া, আর ধানের ভুষি,হলুদের রঙ উজ্জল করতে মিশানো হচ্ছে বিষাক্ত ক্যামিকেল, শুধু ছোট কোম্পনী নয় রাঁধুনী, প্রানসহ হলুদের গুড়ায় মাত্রাতিরিক্ত সীসা পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখান করেছে।

 

খাদ্যে ভেজাল ও আমাদের করনীয়:

মুরি ধবধবে সাদা করতে ইউরিয়া দিয়ে ভাজা হয়। গুড়ে হাইড্রোজ মিশিয়ে রঙ উজ্জল করা হয়। মচমচে করার জন্য গাড়ির পোড়া মবিল দিয়ে ভাজা হয় চানাচুর, বিস্কুট, সিঙ্গারা-সমুচা প্যাটিস সহ অনেক কিছু। ফাস্টফুড খাবেন? মৃত্যুর জন্য তৈরি হোন। স্বাদ চড়ানো ক্যামিকেল, কৃত্রিম রঙ ও প্রিজারভেটিভ মিশ্রিত বার্গার, স্যান্ডউইচ, চিকেন ফ্রাই, পিৎজা এসব মূখরোচক খাবারের জন্য আবাল-বৃদ্ধা বনিতা পাগলপারা। কেএফসি-ম্যাগডোলান্ডাস এর কৃত্রিম খাবার দখল করে নিচ্ছে মায়ের হাতের শোভনীয় সুস্বাদু খাবারের প্রয়োগটি। এমন কোন রোগ নেই যা খাবারে মিশানো ক্যামিকেলের কারনে হচ্ছে না। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেছেন, যারা খাদ্যে ভেজাল মেশাবে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের বিধান করতে হবে।

 

 

নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ সংশোধন করে এতে মৃত্যুদন্ডের বিধান অর্ন্তভূক্ত করতে হবে যাতে খাদ্যে কেউ ভেজাল মেশাতে সাহস না পায়। আর এই সাহসি স্লোগান মুখরিত হয়েছে সারা দেশে, মানুষ মনে করে এখনই দেশ থকে খাদ্যে ভেজাল দূর করার উপযুক্ত সময়। শুভংকরের ফাকীতে চলছে পাল্লা, যে যেভাবে পারে মানুষ ঠকাবার কাজের প্রতিযোগিতা চলছে দেশে, সারা রাত জেগে বুদ্ধি করে কালকে কার মাথায়, কোন কারখানা, ফ্যাক্টরীতে কিংবা কোন পরিবারে কাঠাঁল ভাংঙ্গবো। মিথ্যা, শঠমতা, প্রতারনার হাজারো সূক্ষ কারসাজী চলছে নিত্য নতুন ভাবে,দেশে এখন এহেন কোন খাদ্য নাই হোক শিশু খাদ্য কিংবা আশি বছরের বৃদ্ধের খাবার সব রকম খাবারেই অধিক মুনাফার জন্য এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল মিশিয়ে খাদ্যকে প্রয়োজনে বিষে পরিনত করছে যা খেলে মানুষ এর উপকার তো দূরের কথা বরং ধীরে ধীরে স্লোপয়োজনের মতো আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে আর শরীরে দানা বাধছে! ক্যান্সার সহ নানা বিদ মরণগাতী রোগ, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য যাবেন কোথায়? রাস্তার মোরে-মোরে, ভূয়া ডাক্তার, আলীশান চেম্বার নিয়া হরেক রকম ডিগ্রীর লোকমা লাগাইয়া ফাত পাতিয়া বসিয়া আছে। সব রকম চিকিৎসা হয় এসব ডাক্তারের কাছে, কোন রোগী আসলে তার জীবনের সমাপ্তি এখানেই শেষ।

 

এ যেন আফ্রিকার জংঙ্গলের চোঁখ ধাধানো মানুষ খেকো গাছ,কোন পোকা বা ভ্রমর আসলেই তাকে প্যাচাইয়া ধরে আস্তে আস্তে চুষে খেয়ে ফেলে।মানুষ যেদিন থেকে গরুর পেট, নারী ভুরী খাওয়া শুরু করেছে ঐদিন থেকেই এদেশ থেকে শকুনেরা প্রস্থান করেছে।

 

বর্তমানে যেভাবে খাদ্যে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে, বিষ মিশানো হচ্ছে, নানা রকম তৈল,মবিল সহ কলকারখানায় ব্যবহৃত রং ও ক্যামিক্যাল ব্যবহার করছে। অদূর ভবিষ্যতে এদেশ থেকে মশা,মাছি, মৌমাছি সহ অনেক প্রাণীকুলই প্রস্থান করবে।দেশে এখন প্রতিবছর প্রায় চারশত থেকে পাঁচশত টন ফরমালিন লাগে, দেশের মানুষের পেটে এই সব ফরমালিন প্রবেশ করছে, অনেক ভেবে চিন্তে দেখেছি এর একটা সুফল হয়ত হতে পারে মৃত্যুর পর লাশ দীর্ঘদিন পচার সম্ভাবনা কম এমনকি পোঁকা মাকঁড়েও খাবেনা। আর যদি আপনার কবর বৃষ্টির পানি কিংবা অন্য কারণে ভেংগে যায়, সবাই আপনার অক্ষত মৃতদেহ দেখে বলবে লোকটি খুবই নেক্কার মানুষ ছিলো। মাঝে মাঝে খাদ্যে ভেজাল আছে কিনা পরীক্ষা করতে ম্যাজিষ্ট্রেট সহ পুলিশ- র‌্যাব বাজারে যেয়ে নাকী অবাক হয় ভেজাল ছাড়া কোন খাদ্য পন্যই না পেয়ে, সব রকম ফল থেকে শুরু করে মিষ্টি, দই, মাছ, মাংস, থেকে শুরু করে শিশু খাদ্য শাক সবজি সর্বত্রই ভেজাল- ভেজাল আর ভেজাল। তাহারা সারাদিন ঘুরিয়া-ফিরিয়া কিছু জরিমানা, কিছু বন্ধুত্ব, কিছু ফোনালাপ, আর কিছু ফটো ও সেলফি তুলিয়া জাতিকে জানাইয়া দেয় আজ বড় দেশের কাজ করিয়াছি, ভেজালকারীরা আবার পূর্বের মতোই তাদের পসরা খুলিয়া বহল তবিয়তে ফরমালিন মিশ্রিত খাবার বিক্রি করে যায়, আরোও সুবিধা হয় একবার জরিমানা করিলে আগামী পাচঁ- ছয় মাস আর কেউ বিরক্ত করিবেনা বলিয়া সার্টিফিকেট অর্জনের ফলে নতুন কেউ আসিলে জরিমানার সিলিপ খানা দেখাইয়া বলে এক মুরগী আর কয়বার জবাই করবেন।

 

 

বাংলাদেশের মানুষের একদিক দিয়ে আবার ভাগ্য ভালো, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী আর সচিব, আমলারা ফরমালিন থেকে দূরে আছে। কোন একদিন এক বন্ধুর সাথে গিয়াছিলাম, এক মন্ত্রীর দাওয়াতে, সেখানে মন্ত্রী মহোদয়, গল্পের ছলে বলছিলেন চাল আমার ক্ষেতের, মাছ, মাংস সবজী সবই আমার খামারের, শুধু লবণ ছাড়া আমি কিছুই কিনিনা। আহারে! আমারো খুব ভালো লাগলো ফরমালিন ছাড়া একজন নাদুস-নুদুস মানুষকে দেখতে পেলাম, তাও আবার মন্ত্রী মহোদয়।

 

 

শুশাসন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের অভাবে বাজারে ভেজাল খাদ্য বিক্রয়ের পরিমান ক্রমাগত বাড়ছে। জনগণ বিশুদ্ধ খাদ্য খাওয়ার অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে, শাক-সবজী, মাছ, মাংস, খাওয়ার পানি, ফলমূল সহ বিভিন্ন প্রকার খাদ্য পন্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগের মতো গর্হিত কর্মকান্ড অব্যাহত গতিতে বেড়েই চলছে। ক্রেতা সাধারণ নিরুপায়, তাই বাধ্য হয়ে তারা ভেজাল খাদ্য পন্য ক্রয় করে এবং খেয়ে জীবন ঝুকিপূর্ণ করে তুলছেন। টিআইবি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে খাদ্য ভেজালে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ঘুষ দুর্নীতি আইনি ফাকফোকর ইত্যাদির কারণে খাদ্য পন্যে ভেজাল প্রয়োগ বন্ধ করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

 

 

এই মূহুর্তে সরকার যদি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করণ কর্মকান্ড জোরদান না করে, তাহলে জন জীবন মারাত্মক হুমকির মধ্যে পতিত হবে। আমাদের দেশে যারা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রয়ের সঙ্গে জরিত, তাদের অভিযুক্ত করে যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তা খুবই দায় সারা গোছের। এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে ভেজাল খাদ্য বিক্রয়ের প্রবনতা কমছে না। জনগণের জীবন মরণ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সরকার কঠোর না হলে এবং এব্যাপারে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষৎতে এর ভয়াবহতা রোধ করা অসম্ভব হয়ে পরবে, মাদক বন্ধে ক্রসফায়ার, চাঁদাবাজ, খুনী, রাজনৈতীক প্রতিহিংসায় যদি ক্রসফায়ার হয় গুম হয় তাহলে খাদ্যে ভেজালকারীরা যারা শিশুর গলা টিপে মারার মত স্লোপয়োজন দিয়ে ধিরে ধিরে মারছে, আর যে সমস্ত ভূয়া ডাক্তার চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে ভূল চিকিৎসা করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাদের জন্য কি শাস্তি হওয়া উচিৎ? ক্রসফায়ার? ফাঁসী? নাকী, ফরমালিন খাওয়াইয়া মৃত্যু কার্য়কর করা, এখন কঠিন থেকে কঠিন তম সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

 

বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে আলাপকালে এমনি আরোও অনেক ক্ষোভ আর ভূক্তভোগীদের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা শুনা যায়, এক রিক্সাওয়ালা জানায় ছেলে আঙ্গুর খাবে বলিয়া বায়না ধরলে একশত গ্রাম আঙ্গুর কিনে তাকে খাওয়াইলে আমার ছেলে ফরমালিনের প্রভাবে অসুস্থ হয়। শেষ মেষ রিক্সাটা দশ হাজার টাকা বিক্রি করিয়া ছেলের চিকিৎসা করাতে হয়। যারা খাদ্যে ফরমালিন মিশায় এই জানোয়ারদের সরকার কেনো ক্রসফায়ার দেয়না? রিক্সাওয়ালার কথায় অবাক হইলাম! আবার ভাবিয়া দেখিলাম সত্যিই ইহা সেই জাতী যাদের কে একশত পারসেন্ট ভোল্টেজে আঘাত না করিলে টনক নড়ে না।

 

তাই খাদ্যে ভেজালকারী আর ভূয়া ডাক্তার এর কারণে কারো মৃত্যু হলে বা মৃত্যুর মূখে পতিত হইলে এই অপকর্ম বন্ধে প্রয়োজন মৃত্যুদন্ডের মতো দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি।