মাসুদ মোশাররফ, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ঃ
পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি ও সড়ক পথে পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে বাঘাবাড়িতে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ জেলা ট্রাক মালিক সমিতি ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদ গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করায় গত ৮ দিন ধরে শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ি নৌবন্দর,পাবনা জেলার নগরবাড়িঘাট ও বেড়া ঘাট থেকে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় সার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও, রংপুর, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও গাইবান্ধায় সার সরবরাহ বন্ধ থাকায় এ সব এলাকায় ইউরিয়া সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আগের মজুদের কিছু কিছু সার পাওয়া গেলেও বস্তা প্রতি ২০০/৩০০টাকা বেশি দিয়ে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়িতে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ জেলা ট্রাক মালিক সমিতি ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, বাঘাবাড়িসহ এ ৩টি ঘাট থেকে উত্তরাঞ্চেলের ১৬ জেলায় সার পরিবহণের জন্য ট্রাক মালিকদের বস্তা প্রতি ২৪ থেকে ২৫ টাকা করে দেয়া হোত। গত কয়েক দিন ধরে এটি কমিয়ে এখন এ ভাড়া ২০ টাকা করা হয়েছে। ফলে ট্রাক মালিকরা আর্থিক ভাবে চরম লোকসানের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া এই সার পরিবহণকালে প্রতিটি ট্রাক থেকে সড়ক পথের প্রায় ১৫টি স্থানে হাইওয়ে পুলিশ নানা অজুহাতে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে থাকে। পুলিশের এ বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে তারা অতিষ্ঠ্য হয়ে পড়েছে। তাই তারা নিরুপায় হয়ে পুলিশের এই চাঁদাবাজি বন্ধ ও বস্তা প্রতি ট্রাক ভাড়া আগের ন্যায় বৃদ্ধির দাবীতে এ ধর্মঘট শুরু করেছে। তিনি আরো বলেন, মহাসড়ককে টেকসই করতে ও সড়ক দূর্ঘটনা কমাতে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহণে পুলিশ নজরদারি বাড়িয়েছে। এতে ট্রাক মালিকদের ভাড়া কমে যাওয়ায় তারা লোকসানে পড়েছে। তার উপর হাইওয়ে পুলিশ ট্রাকের কাগজপত্র চেকিং ও ফিটনেস চেকিংয়ের নামে হয়রানির পাশাপশি কমপক্ষে ১৫টি পয়েন্টে নানা অজুহাতে চাঁদাবাজি করছে। ফলে তারা আর্থিক ক্ষতিগ্রস্তর পাশাপাশি হয়রানির স্বীকার হচ্ছে। তিনি জানান,আগে ৬ চাকার একটি ট্রাকে ২০ থেকে ২৫ টন অর্থাৎ প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ বস্তা , এবং ১০ চাকার একটি ট্রাকে ৩৫ থেকে ৩৮ টন অর্থাৎ ৭০০ থেকে ৭৫০ বস্তা ইউরিয়া সার পরিবহণ করা হোত। কিন্তু এখন সরকার আইন করেছে ৬ চাকার একটি ট্রাকে ১৩ টন অর্থাৎ ২৬০ বস্তা আর ১০ চাকার একটি ট্রাকে ২০ টন অর্থাৎ ৪০০ বস্তার অতিরিক্ত পরিবহণ করতে পারবেনা। ফলে ট্রাকে আর অতিরিক্ত পরিবহণের সুযোগ নেই। এর উপর সার পরিবহণ ঠিকাদার কোম্পানি গুলো ট্রাক ভাড়া কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ট্রাক মালিকরা চরম লোকসানে পড়েছে। এ লোকসান ঠেকাতে তারা বাধ্য হয়ে এ ধর্মঘট ডেকেছে। এ ছাড়া প্রতিটি ট্রাকের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্বেও উত্তরাঞ্চলে সার পৌছাতে কমপক্ষে ১২ টি পয়েন্টর প্রতিটিতে ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা করে ট্রাক প্রতি পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। এ সব পয়েন্ট গুলো হচ্ছে সিরাজগঞ্জ হাটিকুমরুল রোড, চান্দাইকোণা, গোবিন্দগঞ্জ, বড় দরগা, তারাগঞ্জ, দিনাজপুরের ১০ মাইল, খোচাবাড়ি, বোদা, ময়দানদীঘি, আদিতমারী, বড়খাঁদা ও পাটগ্রাম। এর মধ্যে লালমনিরহাট পয়েন্ট গুলোতে অত্যাচারের মাত্রা খানিকটা বেশী বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে ট্রাকের মালিক ও চালক নজরুল ইসলাম বলেন এ পয়েন্টে ১ হাজার টাকা না দিলে ট্রাক ছাড়তেই চায় না। এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি আব্দুল কাদের জিলানি জানান, শ্রমিকদের এ অভিযোগ সঠিক নয়, সিরাজগঞ্জ হাইওয়ে এলাকায় পুলিশ কোন চাঁদাবাজি করে না। শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেহেলী লায়লা জানান, মালিক শ্রমিকদের কয়েকজন আমার কাছে এ বিষয়ে এসেছিলো। আমি তাদের বলেছি, বিষয়টি আন্তঃ জেলা সংক্রান্ত। তাই বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হবে। আমি বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে এব্যাপারে কিছু জানাননি। তাই আমি এ ব্যাপারে আর কোন পদক্ষেপ নিতে পারিনি।
গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিন বাঘাবাড়ি নৌবন্দর ঘুরে জানাযায়, চট্টগ্রাম, খুলনা ও মংলা বন্দর থেকে ইউরিয়া সার নদী পথে বাঘাবাড়ি নৌবন্দর, বেড়া ও নগরবাড়ি ঘাটে পৌছানো হয়। সেখান থেকে সড়ক পথে ট্রাক যোগে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাতে পৌছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্সের রাজু আহম্মেদ জানান, অতিরিক্ত মাল নিতে না পারায় তারা অতিরিক্ত লাভ করে উঠতে পারছে না। নবাব ট্রেডার্সের হেলাল উদ্দিন জানান, আমরা বা পরিবহন ঠিকাদাররা আগের রেটই বহাল রেখেছি। সাউথ ডেল্টা ট্রেডার্সের সেকেন্দার আলী বলেন, রেট বাড়ানোর অভিযোগ সঠিক নয়। এ সময় বাল্ক ইন্টারন্যাশনাল এবং গ্রাম সিকো’র ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোন প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। বাঘাবাড়িতে অবস্থিত ট্রাক মালিক -শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছে পরিবহণ ঠিকাদাররা সিন্ডিকেট করে সার পরিবহণে এ অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। সড়ক পথে পুলিশের হয়রানি চাঁদাবাজি বন্ধ এবং বস্তা প্রতি ২৭ টাকা থেকে ৩০ টাকা করা না হলে তাদের এ অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হবে না। অপরদিকে এ ধর্মঘটের কারণে বাঘাবাড়ি নৌবন্দর অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে উত্তর জনপদে রবি শষ্য চাষে ইউরিয়া সারের সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here