মোঃ নূর ইসলাম নয়ন, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ সেই অতি পরিচিত তাঁতের মাকুর ঠুকঠুক শব্দ আর আগের মত শোনা যায় না। মাকুর ঠুকঠুক শব্দে ভোররাতে মানুষের ঘুমও ভাঙে না। দিনাজপুরে তাঁত শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, সুদক্ষ তাঁত শিল্পী, সহজলভ্য শ্রমিক থাকা সত্ত্বেও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, বাজারজাতের অভাব এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের সূতা-রঙ দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শিল্প আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে । ফলে এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে অতি মানবেতরভাবে জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে যে ক’টি তাঁত চালু অবস্থায় রয়েছে সেগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে । গ্রামীণ ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অনন্য একটি অংশ তাঁত শিল্প। দেশের বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
এক সময় এ পেশাটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনরা বেশি জড়িত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্ব পর্যন্ত এ পেশা তারাই ধরে রেখেছিল। তখন তাদের বলা হতো আশ্বিনী তাঁতী। আমাদের দেশে এ পেশাজীবীদের বিভিন্ন উপাধিও রয়েছে। যেমনÑ বারাশ, বসাক, নন্দী, পাল, প্রামাণিক, সাধু, সরকার, শীল ইত্যাদি। ১৯২০ সালের প্রথমার্ধে শহরে তাঁতীদের থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির একদল তাঁতী পূর্ববঙ্গে এসে আবাস গাড়েন। তাদেরই আসল তাঁতী বংশোদ্ভূত বলে গণ্য করা হয়।
পরবর্তী সময়ে মুসলমানরাও এ পেশাতে জড়িয়ে পড়ে। তারা নিজেদের কারিগর বলতে পছন্দ করে। আর সেখান থেকেই বোধহয় সৃষ্টি দিনাজপুর চিরিরবন্দর রাণীবন্দর এলাকার কারিগরি পাড়ার। কারিগরি নামটি শুনলেই বোঝা যায় এখানে কারিগরদের বাস। এ পাড়াতে ৪০ থেকে ৫০টি ঘর রয়েছে। যাদের সবারই প্রধান জীবিকাই হচ্ছে এ হস্তচালিত তাঁত। এখানে শুধুই লুঙ্গি তৈরি হয়। প্রযুক্তির বিকাশ যখন তাঁতীদের অনেককে জীবন ধারণের দ্বিতীয় উপায় হিসেবে অন্য পেশা গ্রহণে এবং এ পেশা পরিত্যাগে বাধ্য করছে তখনও কারিগরি পাড়ার লোকজনরা এর উপরেই জীবিকা নির্বাহ করছে। দিন দিন মানুষ যেখানে উন্নতির মুখ দেখে, সেখানে এ পেশাজীবী মানুষরা রয়েছে অনেক পিছিয়ে। যদিও দিন দিন তাদের তাঁতের সংখ্যা বাড়ছে তবুও জীবনযাত্রার মান রয়েছে সেই আগের জায়গায়।
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর ও খানসামা উপজেলার ১৩টি গ্রামে তদানিন্তন ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠে বৃহত্তর রাণীরবন্দর তাঁত শিল্প অঞ্চল। সেই থেকে তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে রাণীরবন্দরের পরিচিতি ছিল দেশ জুড়ে। এখানকার সুদক্ষ তাঁত শিল্পীদের হাতে উৎপাদিত শাড়ী, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালা, মশারী এবং গুলটেক্স চাদর জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হত। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠে ছোট-বড় প্রায় দু’শতাধিক তাঁত শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ হাজার মানুষ। কিন্তু তাঁত শিল্পের ও সূতার দাম বৃদ্ধি পাওয়া এই শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে বলে জানান একজন তাঁত ব্যবসায়ী। তবে তাঁত শিল্প নিয়ে সরকারের যে ভূমিকা এটার প্রশংসা করেছেন বেসিক সেন্টারের লিয়াজো কর্মকর্তা মঞ্জুর হাসান। তাঁত শ্রমিকরা জানান, ১টি শাঁড়ী তৈরী করে মজুরী পাওয়া যায় ৫০ টাকা । সারাদিনে ৩টি শাঁড়ী তৈরী করে আয় হয় ১শ ৫০ টাকা। সামান্য পরিমাণ এই আয় দিয়ে অগ্নিমূল্যের বাজারে আমাদের সংসার আর চলছে না।
পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এ পাড়ার পুরুষদের প্রধান পেশা তাঁতবস্ত্র তৈরি। বাড়ির মহিলারাও সংসারের অন্যান্য কাজের সঙ্গে এ কাজে ব্যস্ত থাকে। পুরুষরা সামান্য কিছু সময় অবসর নিতে পারলেও যেন মহিলাদের ভাগ্যে তা জোটে না। সংসারের সচ্ছলতা আনতে নারী-পুরুষ এক হয়ে কাজ করে যাচ্ছে তবুও সচ্ছলতা আনতে পারছে না। শিক্ষার দিক থেকেও এগুতে পারছে না। স্থানীয় একজন বলেন, ‘পেটে মোর ভাতই জোটে না, পড়াশোনা করামু কেমন করি ।’ তবুও তারা দিন-রাত কাজ করে ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আগের দিনে হস্তচালিত তাঁতের সাহায্যে তাঁতবস্ত্র তৈরির জন্য চরকার বা সুতাকাটার টাকু ব্যবহার করা হতো। আজকাল পর্যাপ্ত পরিমাণে সুতা মেশিনে তৈরি হচ্ছে। পরিণতিতে চরকা প্রায় অবলুপ্ত হতে চলেছে। তবুও ঐতিহ্য ধরে এ পাড়ার কারিগররা চালিয়ে যাচ্ছে চরকা। এখানে একটি পরিবার দিনে সর্বোচ্চ চারটি লুঙ্গি তৈরি করে। আর এসব লুঙ্গি মহাজনদের কাছে বিক্রি করে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। মহাজনরা তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে আরও বেশি টাকা দামে তা বিক্রি করে। এতে মহাজনরা লাভের মুখ দেখলেও কারিগররা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের পরিশ্রমের যথাযোগ্য লাভ থেকে। আর এভাবেই তাদের থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে পরিবার নিয়ে।
মোঃ আব্দুর রহমান। দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে বাস করেন এখানে। দুটি তাঁত সে তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিল। পরিবারে সচ্ছলতা আনার জন্য পরে আরও দুটি তাঁত কেনে। কি‘ তবুও পরিশ্রমের ফল পাচ্ছে না তারা। তিনি জানান, আমাদের দুর্দশা এমনই যে এরশাদ সরকারের আমলে নেয়া ঋণ এখনও শোধ করতে পারিনি। বর্তমানে আমরা সরকারেরও কোন সহযোগিতা পাচ্ছি না। এমনি চললে মসলিনের মতো হস্তচালিত তাঁতও একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে।
নিজেদের কাজ এগিয়ে নিতে তাই সাহায্য নিতে হয় বিভিন্ন এনজিওদের। সেখান থেকে এনজিওরা তাদের ফায়দা লুটে নিলেও শিক্ষার অভাবে ঋণকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহারে ব্যর্থ হচ্ছে তারা। এই অঞ্চলে ব্র্যাক, স্বনির্ভর, আশা, গ্রামীণের মতো বড় বড় এনজিওগুলো বড় সুদে ঋণ দেয়। যা শোধ করতে গেলে মাঝে মাঝে তৈরিকৃত লুঙ্গি আরও কম দামে বিক্রি করতে হয়।
এ পাড়ার আরও একজন কারিগর মোঃ ইদ্রিস। তারও রয়েছে দুটি তাঁত। তিনিও জানান, যদি পড়ালেখা থাকত, তাইলে আর এ পেশায় থাকতাম না। আমাদের প্রতি সরকারের কোন নজরই নেই। যেখানে সরকারের সামান্য সহযোগিতা পেলেই তারা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তাদের তাঁত শিল্পকে সেখানে তারা কেন বঞ্চিত থাকবে? তাই তারাও সরকারের সহযোগিতা আশা করেন। সরকারের প্রতি তাদের চাওয়ার মধ্যে রয়েছে তাঁতী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা। এরশাদ সরকারের আমলে এটা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁতী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলে অনেক কিছুই করতে পারবে বলে আশা করে কারিগররা। অন্তত বাধ্য হয়ে আর কম দামে লুঙ্গি বেচতে হবে না। তৈরিকৃত লুঙ্গি ব্যাংকে জামানত রেখেই তারা তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যাংক থেকে নিতে পারবে এবং নিশ্চিন্তে তা ব্যবহার করতে পারবে। কাঁচা রঙের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং সুতার মূল্য নির্ধারিত করতে হবে। কেননা যে সুতা ব্যবহার করে লুঙ্গি তৈরি করে তা তারা পায় অনেক বেশি দামে। এছাড়া তাঁত উন্নয়ন বোর্ডের অনেক দুর্নীতির কাছেও হেরে যেতে হচ্ছে এসব কারিগরদের।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড রংপুর বিভাগীয় বেসিক সেন্টারের সাবেক এক লিয়াজো কর্মকর্তা এ প্রতিনিেিধকে মঞ্জুর হাসান জানান, তাঁতীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে হিমসিম খাচ্ছেন। এছাড়াও প্রয়োজনীয় উপকরণের দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধির কারণে ধকল কাঁটিয়ে উঠতে পারছেন না তারা। রাণীরবন্দরে তাঁত শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, সুদক্ষ তাঁত শিল্পী, সহজ শর্তে তাঁত ঋণ প্রদান ও ঋণ বিতরণে বৈষম্য এবং পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ, বাজারজাতকরনের ব্যবস্থাসহ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাঁত শিল্পের হৃত গৌরব উদ্ধার করা সম্ভব সেই সঙ্গে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত আরো বেশী মানুষের কর্মসংস্থানসহ দেশীয় পণ্যের ব্যবহার ও চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যই এখন ইতিহাস। কালের বাতাসে এ হস্তচালিত তাঁত শিল্প হারিয়ে না যায় সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন। সেই সাথে বাংলাদেশে তাঁতশিল্পের জন্য সরকারিভাবে একটি আলাদা ‘তাঁতী ব্যাংক’ স্থাপন করবেন সরকার এমনটি দাবী জানিয়েছেন তাঁতশিল্পের জড়িত দিনাজপুরের সকল কারিগররা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here