Amar Praner Bangladesh

পঙ্গপালের মতো হাসপাতালে রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভীড়ে রোগীদের বেহাল দশা

 

(উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল সহ সারাদেশে সরকারী বেসরকারী হাসপাতালের চিত্র একই রকম সকাল থেকে গভীর রাত অবদি সব হাসপাতালই কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভীড় আর তাদের সাক্ষাতের তালবাহনায় রোগীদের ডাক্তারদের সাক্ষাৎ পেতে বেহালদশা।)

 

আর কে রুবেল :

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ, যেখানে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিনিয়ত পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। যেখানে বাংলাদেশ সরকার চিকিৎসা খাতে বৃহৎ বাজেট করেও ফিরিয়ে আনতে পারছেনা চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হচ্ছে ভূয়া চিকিৎসক। এরকম পরিস্থিতিতে যে সমস্ত ডাক্তার বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী হাসপাতালে নিয়োজিত থাকেন, তাদের কাছে রোগীরা আসলেও সময়ের অভাবে ভালভাবে ডাক্তার দেখানো এখন একটি দূরুহ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথমত ডাক্তারদের নেই কোন নির্দিষ্ট ফি, অন্যদিকে প্রত্যেক ডাক্তারের কাছে সকাল বিকাল এমনকি গভীর রাত অবদি ভিজিটে আসছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভ। রোগীদেরকে সিরিয়ালে রেখে ঘন্টার পর ঘন্টা বেশির ভাগ ডাক্তাররা বিভিন্ন রকমের রিপ্রেজেন্টেটিভ বিশেষক্ষেত্রে সুন্দরী কোন ভিজিটরদের সাথে দরজা বন্ধ করে দীর্ঘ সময় কালক্ষেপন করে। কোন রোগী যদি ডাক্তারের রুম থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হয় তার উপর পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে এসব রিপ্রেজেন্টেটিভরা।

প্রেসক্রিপশনে কোন কোম্পানীর ঔষধের নাম লিখল তার ছবি তুলতে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় তারা। অনেক সময় টানা টানি করে রোগীর প্রেসক্রিপশনও ছিড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। এ যেন ছিড়ে ফিড়ে দাও লুটেপুটে খাই। অন্যদিকে অপেক্ষমান রোগীরা শিশু বাচ্চা সহ এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত নিয়ে ব্যাথায় গোঙ্গরাতে থাকলেও কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। ব্যাঙের ছাতার মতো ঔষধ কোম্পানী সহ নামি দামী অনেক ঔষধ কোম্পানীর ভিজিটররা ডাক্তারদেরকে তাদের উৎপাদিত ঔষধ প্রেসক্রাইব করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের উপহার-উপঠৌকন দিয়ে থাকে।

মাঝে মাঝে বিদেশ ভ্রমণের টিকিট সরকারী ডাক্তারদের ক্ষেত্রে দামী গাড়ীও উপহার দেওয়া হয় বলে জানা যায়। রাজধানীর উত্তরার ব্যস্ততম এলাকায় অবস্থিত উত্তরা আধুনিক মেডিকেল হাসপাতাল। অনেকে এই হাসপাতালকে বাংলাদেশ মেডিকেল হিসেবে চিনে বলে জানা যায়। হাসপাতালে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, হাসপাতাল প্রাঙ্গনে রিপ্রেজেন্টেটিভদের সারি সারি মটরবাইক। হাসপাতালের ভিতরে ডাক্তারদের চেম্বারের মুখে ঔষধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভ উঠতি বয়সী সুন্দর তরুণ তরুণীরা আধুনিক পোশাকের সাজসজ্জায় নিজেকে প্রেজেন্ট করার প্রয়াসে দরজার সামনে অপেক্ষমান থাকে প্রতিনিয়ত।

একজনের পর একজন ভিতরে প্রবেশ করে ডাক্তার বাবুকে পীর সাহেবের মতো ভক্তি শ্রদ্ধা করে উপহারডালি রেখে দেয় তার টেবিলের উপরে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী রোগীরা অপেক্ষমান থেকে ডাক্তার সাহেবের সাক্ষাতের স্বপ্নে চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করতে থাকে। এই চিত্র শুধু উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে নয় সারাদেশে বিদ্যমান। এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বোর্ডের বিশিষ্ট্যজনের সাথে সংবাদের প্রতিবেদক আর কে রুবেলের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এ বিষয় নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রুলস রেগুলেশন থাকা উচিৎ। রোগী দেখার সময় কিংবা হাসপাতালে রোগী ভিজিট করার সময় কোন ডাক্তাররা ঔষধ কোম্পানীর কারোও সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেনা।

সেই ক্ষেত্রে রিপ্রেজেন্টেটিভরা হাসপাতাল কিংবা ডাক্তারের চেম্বারে ভীড় না করে একটি নির্দিষ্ট সময় খুব সকাল বেলা ডাক্তারের বাসা কিংবা তার ব্যক্তিগত দপ্তরে সাক্ষাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ করলে অনেকটা সমস্যার সমাধান হতে পারে। এতে করে হাসপাতাল গুলোতে অনেকটা অযথা ভীড় কমে আসবে। এ বিষয় নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে আগত রোগীদের সাথে আলোচনা করলে তারা জানায়, আমরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসলে এসব রিপ্রেজেন্টেটিভদের কারণে ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদেরকে ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেতে অপেক্ষা করতে হয়।

এমনকি বিরক্ত হয়ে অনেক সময় এদের কারণে ডাক্তারের নাগাল না পেয়ে আমাদেরকে বাড়ীও ফিরে যেতে হয়। এসব রিপ্রেজেন্টেটিভদের সাক্ষাতের সময় আর রোগীদের সাক্ষাতের সময় আলাদা আলাদা হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর কামনা করছি। এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে বলে জানায় অনেক ভুক্তভোগীরা। এরকমটা হলে হয়তো হয়রানি থেকে রেহাই পেতে পারে সাধারণ জনগণ, নয়তো চিকিৎসা ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না।