Amar Praner Bangladesh

প্রতিবাদ চলছে আক্রোশমূলক আচরণ ও শব্দ প্রয়োগের

 

 

সাইদুর রহমান রিমন :

 

মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের উন্মোচন নামক প্রোগ্রামের আওতায় ‘সাংবাদিকতার নামে হচ্ছেটা কী?’ শীর্ষক প্রতিবেদন নিয়ে দুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। প্রতিবেদনটির ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, প্রতিবাদ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের আক্রোশমূলক আচরণ ও শব্দ প্রয়োগের ব্যাপারেও। প্রতিবাদী স্ট্যাটাস ও মন্তব্যগুলো পাঠের পরই প্রতিবেদনটি একনজর দেখার প্রয়োজনবোধ করলাম। রিপোর্টার মাজহার মিলন হয়তো ভূয়া সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন তৈরির ভাল উদ্যোগ নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু মাঠে নেমে কয়েকটি পত্রিকাকেই শুধু প্রতিপক্ষ বানিয়ে আগ্রাসী রিপোর্ট দাঁড় করিয়েছেন। কোনো পক্ষ থেকে অনৈতিক কোনো সুবিধা নিয়ে তিনি এমনটা করেছেন এ ধরনের অভিযোগ আমি তুলবো না।

হয়তো মাঠ পর্যায়ে ভুক্তভোগী লোকজনের যন্ত্রণাকাতর কথাবার্তা শুনে তার কোমল হৃদয় হয়তো আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং তিনি নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। রিপোর্টারের এই হৃদয়ক্ষরণ ও আবেগ সরাসরি রিপোর্টে প্রতিফলন ঘটেছে। এ কারণে নিজেই কথিত ভুক্তভোগিদের পক্ষ নিয়ে আক্রোশী আচরণ করেছেন, প্রশ্নবানে জর্জরিত করার মধ্য দিয়ে নিজের অতি দক্ষতার জানান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। বোধকরি এদেশে ভূয়া ও অপসাংবাদিকতা, প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা বিনষ্ট করাসহ সাংবাদিক নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রিপোর্ট, প্রবন্ধ, ফেসবুক স্ট্যাটাস, মত অভিমত লিখিতভাবেই প্রকাশ করেছি।

এমনকি উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারে বিদ্যমান ভূয়া সাংবাদিক লালন ক্ষেত্রগুলোতে রীতিমত যুদ্ধ স্টাইলে সংবাদকর্মিদের আন্দোলনমুখর করে তুলেছি। এদেশে ভূয়া সাংবাদিক চেনার উপায় শীর্ষক আলাদা স্টিকার বানিয়েও তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছি। ভূয়া সাংবাদিকদের অপসাংবাদিকতার ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাঠ পর্যায় থেকেই প্রতিরোধ সৃষ্টিতে অবশ্যই প্রকৃত সংবাদ কর্মিদের আপোষহীন ভূমিকা রাখতেই হবে।

কিন্তু এসব কঠোর ভূমিকা নেয়ার সময়ও কখনোই কোনো মিডিয়াকে আমি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত করিনি। কারণ, গুটিকয়েক মতলববাজ কর্মির প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের জন্য কোনো সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল দায়ী হতে পারে না, দায়ী করা ঠিকও নয়। হ্যা, এমন তথ্যও আসতে পারে যে, একটি পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক, বার্তা সম্পাদক, চীফ রিপোর্টার, রিপোর্টারবৃন্দ, বাণিজ্যিক কর্মিসহ সকল বিভাগের কর্মিরা মিলেমিশে সংঘবদ্ধচক্র হয়েছে এবং তারা বহুমুখী অপরাধ অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের মামলা রয়েছে, একাধিক কেস স্টাডির সমন্বয়ে দারুণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হতেই পারে। তাই বলে একটা কথিত অভিযোগের সূত্র ধরে গোটা পত্রিকাকে অপরাধী বানানোর জোরপূর্বক চেষ্টা খুব বেশি পাঠকনন্দিত হয় না। অনুজ মাজহার মিলন টঙ্গীর কথিত এক নারী সংবাদকর্মীকে ঘিরে শুরু করা প্রতিবেদনটি চমৎকার ছিল। প্রথম কয়েক মিনিট দেখেই মনে হয়েছে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী রিপোর্টার ঝুঁকি নিয়েও তার প্রতিবেদনটি নির্দ্দিষ্ট গতিপথেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন।

কিন্তু দ্বিতীয় কেস স্টাডি হিসেবে তুরাগের ব্যবসায়ি ভদ্রলোকের কাছে গিয়েই তিনি কেন যেন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেললেন। রিপোর্টার সরাসরি ব্যবসায়ির পক্ষাবলম্বন করলেন, হয়ে উঠলেন তারই মুখপাত্র। নিশ্চয়ই ব্যবসায়ি, ভুক্তভোগির পাওনা টাকা আদায়ের ভূমিকা রিপোর্টারের কাজ হতে পারে না। আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে পুরানা পল্টন এলাকায় দৈনিক ভোরের সময় পত্রিকা কার্যালয়ে গিয়ে যা ঘটালেন রিপোর্টার ভাইটি। একটা পত্রিকা অফিসে আরো ৭/৮টি পত্রিকা স্তুপ দিয়ে রাখা আছে, তারাও একই ঠিকানা ব্যবহার করেছে….এটা অপরাধ? স্তুপাকারে রাখা পত্রিকা কিংবা অন্য কাগজপত্রাদি আপনি কার অনুমতি নিয়ে ধরলেন তা জানতে পারি কি? নাকি সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা থাকলেই সবকিছু হালাল হয়ে যায়? ঘটনাস্থলে ওই পত্রিকারই নির্বাহী সম্পাদক যখন পৌঁছালেন তার কোমরে ঝোলানো প্রেস এ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটি বারবার ফলাও করে প্রচার করে বললেন, সাক্ষরের জায়গাটি ঝাপসা হয়ে আছে তা থেকেই বুঝে নেয়া যায় এটা কী ধরনের কার্ড।

অথচ সংশ্লিষ্ট কার্ডধারী সংবাদ কর্মি তার পিআইডি কার্ডের নাম্বার পর্যন্ত জানালেন, একটা ফোন করেই তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার পরিবর্তে সাক্ষরের জায়গা ঝাপসা থাকলে কেমন কার্ড তা বোঝার কষ্টটা চাপিয়ে দেয়ার কোনো দরকারও ছিল না। তবে রিপোর্টার ভাইটির প্রতিবেদন থেকে টঙ্গীর তথাকথিত নারী সাংবাদিকের যে ভয়াল রুপ দেখেছি তাতে নিজেই তটস্থ হয়ে পড়েছি।

এমন সাংবাদিক নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে মাননীয় সম্পাদক সাহেবরা কোন রুপে সাংবাদিকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন? বাপ রে বাপ, কলম কালির দরকার হয় না এসব প্রতারকদের, থানা পুলিশকে পুঁজি করে, সোর্সগিরিকেই রিপোর্টারের আধুনিক খোলস দিয়েছেন তারা। দন্ডমুন্ডের কর্তা হিসেবে পুলিশ কামিয়ে নেয় লাখ টাকা আর সোর্স নামের এ বখাটে রিপোর্টারকে মজুরী বাবদ দুই, চারশ’ টাকা ধরিয়ে দেয় বৈকি। ভূয়া সাংবাদিক লিখলে অনেকেই আবার বাক্য, অর্থ, যুক্তিতর্ক নিয়ে সময় কাটান।

আসলে ভূয়াদের প্রতারণা বিষয়ে কথাবার্তা না বলে আমরা যেন বানান আর বাক্যের অর্থ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি সেই ফন্দি আঁটেন। এতো বাধা বিপত্তির মুখেও মাঠ পর্যায়ে কেমন সাংবাদিকতা চলছে তার খন্ডচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা তো করেছেন মাজহার মিলন? আমরা ভুল ত্রুটি এড়িয়ে শুদ্ধভাবে না হয় ভূয়া নামা তৈরি করি, তাতে প্রতারণার হাত থেকে বেঁচে যাবে বহু নিরীহ মানুষ। সাথে সাথে বাঁচবে সাংবাদিকতার সম্মানও।