মেহেদী হাসান, বাগেরহাট প্রতিনিধি :

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় বাগেরহাট জেলার ৮টি উপজেলায় আউট অব স্কুল এডুকেশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য সুখী মানুষ নামের একটি এনজিও দায়িত্ব পেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাথের চেষ্টায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে সংস্থার এ অনৈতিক কাজে পূর্ববর্তী সহকারী পরিচালকগণ সহযোগিতা না করায় তাদের বদলী করে মুন্সীগঞ্জ জেলা থেকে হুমায়ুন সরদার নামে একজন বিতর্কিত সহকারী পরিচালককে বাগেরহাট জেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে আনা হয়।

জানা যায়, এই কর্মকর্তা সুখী মানুষ সংস্থার নির্বাহী পরিচালকের পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্টজন। বাগেরহাট জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাথের পরিকল্পনা ও পরামর্শ তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে দিতেন এবং এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য পূর্ববর্তী দুজন সহকারী পরিচালকের উপর প্রভাব বিস্তারসহ ফোনে চাপ সৃষ্টি করতেন।

তিনি বাগেরহাটে যোগদান করার সাথে সাথে সুখী মানুষ এনজিওর পূর্বের সকল অনিয়মকে বৈধতা দিয়ে অর্থ ছাড়করণে মরিয়া হয়ে উঠেন।

অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে সুখী মানুষ এনজিওর অর্থ ছাড় বন্ধ রাখার আদেশ থাকলেও গত জুন মাসে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আদেশ অমান্য করে হুমায়ুন কবির সরদার সুকৌশলে এজি অফিস থেকে বিপুল পরিমান অর্থ উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি জানতে পেরে বিলটি অনুমোদন করেন নি।
বাগেরহাট সদর, চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট ও কচুয়া উপজেলায় কাগজে কলমে প্রকল্পের স্কুল চালু করা হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে সেখানে সঠিক শিক্ষাথী নেই। এ সকল বিষয়ে যাচাই করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের উপর দায়িত্ব প্রদান করা হলে বাগেরহাট জেলার জেলা প্রশাসক ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখ ৪০৯ নম্বর স্মারকে কমিটি গঠন করে ইউএনও দের চিঠি দিয়েছেন। ফলে এনজিও ও শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির সরদার উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ দায়িত্ব প্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার জন্য যোগাযোগসহ ভিত্তিহীন বিভিন্ন চিঠিপত্র লিখছে।

এ বিষয়ে বাগেরহাট সদর উপজেলার এক রিপোটে জানা যায় সদর উপজেলায় ঝরেপড়া শিক্ষার্থী আছে মাত্র ৩৯ জন। অথচ এনজিও ও সহকারী পরিচালক যোগসাজসে সদর উপজেলায় ১৮৫৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করছে। একইভাবে ফকিরহাট উপজেলায় ১৭৭৭ জন, মোল্লাহাট উপজেলায় ২১০০ জন এবং চিতলমারী উপজেলায় ২৫২৯ জন শিক্ষার্থী রয়েছে দাবী করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের পায়তারা করছে সহকারী পরিচালক হুমাউন কবির সরদার। এ প্রকল্পের কর্মকর্তা হুমায়ুন সরদার যোগদান করার মাত্র ছয় কর্মদিবসের মধ্যে এবং ১৮ জুন’২২ তারিখে মাত্র এক দিনের পরিদর্শনে প্রায় তিনশত বিদ্যালয় এবং ৮২৬২ জন শিক্ষার্থী সব সঠিক আছে বলে ১৯জুন’২২ তারিখে ৮৪ নম্বর পত্রে প্রতিবেদন দিয়েছেন।

এ সময়কালে তিনি একই সাথে ৩টি জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তাই ১৮ জুন’২২ তারিখ পর্যন্ত বাগেরহাট জেলায় তার কর্মদিবস হয় মাত্র দুই দিন। এ বিষয়ে সুখী মানুষ এনজিওর সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজারসহ সংস্থার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সংস্থাটি ঊর্ধ্বত্বন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের জন্য নামমাত্র কয়েকটি স্কুল স্থাপন করেছে। খবর পেলে মোবাইলে জানানো হয় এবং শিক্ষিকারা আশপাশের বাড়ির স্কুল পড়ৃয়া ছেলেমেয়েদের জড়ো করে স্কুল পরিচালনা দেখায়। পরিদর্শক ফিরে গেলে সকলেই বাড়ি চলে যায় বলে প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন।

তবে শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্প কর্মকর্তা হুমায়ুন সরদার ও সুখী মানুষ সংস্থার নির্বাহী পরিচালকের নির্দেশনার বাইরে তাদের কিছু করনীয় নেই বলে জানান। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে মোড়েলগঞ্জ, রামপাল ও মোংলা উপজেলায় দায়িত্ব প্রাপ্ত সহযোগী এনজিও প্রতিভা ও সিডোপ সংস্থা শিক্ষার্থী জরিপ করে স্কুল চালু করার প্রস্তুতি নিলেও অজ্ঞাত কারনে তাদেরকে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষা দপ্তরের প্রকল্প কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির সরদার মোটা অংকের অর্থ দাবী করেছেন বলে অভিযোগ করেছে ঐ দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বৃন্দ। এমনকি কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবৈধ নিয়োগ অনুমোদন, প্রায় একবছর আগের পিছনের তারিখ দেখিয়ে অবৈধভাবে বাতিল ও অনুমোদন, শোকজ ও প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিকট থেকে হুমায়ুন সরদারের বিরুদ্ধে অর্থ দাবীর অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও নারী কেলেংকারীসহ নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং শাস্তি স্বরূপ তার দুটি ইনক্রিমেন্ট কর্তন করা হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ধরনের একজন অসৎ ও বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সুদূর মুন্সীগঞ্জ থেকে বাগেরহাটে দায়িত্ব প্রদান করায় জনমনে নানাবিধ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে তার চাকরি আছে মাত্র এক মাস। এর মধ্যে যেভাবেই হোক তিনি একটি বিরাট অংকের অর্থ উত্তোলন করে অবসরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাই তিনি তার মূল কর্মস্থলে না গিয়ে সব সময় বাগেরহাট থাকেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপনে মূল কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের নিয়ম থাকলেও গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসেও তিনি তার মূল কর্মস্থলে যাননি।

অন্যদিকে সুখী মানুষ সংস্থার বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট তথ্য গোপন করে শিক্ষক নিয়োগ কমিটির বৈধ সদস্য সচিব ব্যতীত সকল উপজেলায় বিধি বহির্ভূতভাবে শিক্ষক নিয়োগ, বৈধ শিক্ষার্থী জরিপ ব্যতীত শিক্ষক তালিকা তৈরী, ক্যাম্পেইন কমিটির সভাপতি প্রধান শিক্ষকের অনুমোদন ব্যতীত শিক্ষার্থীদের ভূয়া তালিকা প্রস্তুত করা, কর্মীদের বেতন ভাতা না দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, জামানতের নামে কর্মীদের নিকট থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায়, ব্যাংক জালিয়াতি, প্রকল্প কর্মকর্তার স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে পার্টনার এনজিওদের সাথে অর্থের বিনিময়ে প্রতারণামূলক চুক্তি করাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে ‘সিটিজেন ভয়েস’ এর অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

সুখী মানুষ এনজিও ও বাগেরহাটের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রকল্প কর্মকর্তা হুমায়ুন সরদারের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে বাগেরহাট জেলার আউট অফ স্কুল চিলড্রেন শিক্ষা প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে সচেতন মহল।

এ বিষয়ে এই শিক্ষক সুমি আক্তার জানান, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত আছি আজ পর্যন্ত আমাদের কোন বেতন দেয়নি কেন্দ্র পরিচালনার জন্য কোন ঘর ভাড়া দেয়নি বাড়ীর মালিক ঘরে তালা দিয়ে দিয়েছে বর্তমানে কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ঘরের মালিকের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রগ্রাম অফিসার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, ২০২১ সারে আমার নিয়োগ হয় আজ পর্যন্ত কোন বেতন ভাতা পাইনাই। শিক্ষাকেন্দ্রের জন্য যে, সকল ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম তারা ঘরে তালা দিয়ে দিয়েছে। তাদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমার শিক্ষকরা ও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এখন আমাদের চাকুরীচুত করার জন্য সহকারী পরিচালক ও সুখি মানুষের নির্বাহী পরিচালক উঠেপড়ে লেগেছে।

নিকেতন সমাজ কল্যান সংস্থার চেয়ারম্যান ইউনুছ শিকদার জানান, গত ৩১ আগষ্ট ২০২২ তারিখ কচুয়ায় কেন্দ্র উদ্ভোধন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইচ চেয়ারম্যন সহ এলাকার গন্যমান্যব্যক্তিবর্গ আমাদের কেন্দ্রের উদ্ভোদন করেছে। আশারাখি এমাসের শেষের দিকে কেন্দ্র চালু করতে পারব। শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রীর তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এমাসের শেষের দিকে পাওয়া যাবে। এবিষয়ে টেংরাখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, ৩১ আগষ্ঠ আমার বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের ঐ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী দেখিয়েছিল।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সহকারী পরিচালক হুমাউন কবির সরদার বলেন, কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধআছে ঘরভাড়া না দেওয়ার কারনে ঘর মালিকেরা তালা দিয়ে দিয়েছে। আমি আমার নিজের পকেট থেকে কয়েক জন ঘর মালিকে ঘরভাড়া দিয়ে দিয়েছি। ঘরভাড়া না দেওয়ার বিষয়টা শুধু বাগেরহাটের না সারা বাংলাদেশের একই অবস্থা। মনিটরিং ভেরিভিকেশন রির্পোট গেলে তার পর অর্থ ছাড় হবে । ভেরিভিকেশন রির্পোট বিলম্বে হওয়ায় এসমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোসাব্বেরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি আমাদের কাছে কিছু অনিয়মের অভিযোগ আসলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আমারকাছে তদন্তের জন্য আসলে আমারা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সহায়তায় সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের মাধ্যমে তদন্ত করিয়েছি এবং শিক্ষার্থীদের তালিকা যাচাইবাছাই করে দেখেছি এসব কেন্দ্রে যতজন ঝরেপড়া শিক্ষাথী থাকার কথা তার চেয়ে অনেক কম রয়েছে।

সুখি মানুষ আমাদের ১৮৫৬ জনের একটা তালিকা দিয়েছে। এর ভিতরে অনেক শিক্ষার্থী পার্শবর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে বা তার পার্সবর্তী একটি বিদ্যালয়ে পড়ে বা আফতেদায়ী মাদ্রাসায় পড়ে এখানে কিছু শিক্ষাথী ১৪ বছরের উপরে রয়েছে। আবার ৮ বছরের কম বয়েসের শিক্ষার্থী রয়েছে। দেখাগেছে বিশাল অংকের শিক্ষাথী এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষা গ্রহন করার উপযুক্ত নয়। ৩৯ জনের একটি তালিকা আমাদের প্রথমিক শিক্ষা দপ্তর থেকে পেয়েছি যারা এই প্রকল্পের উপযুক্ত শিক্ষার্থী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here