বিমানবন্দরে গোল্ডেন শফির ক্যাডারদের দৌরাত্ম থামছেনা

অবৈধ আয়ের উৎস আড়াল করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কাউন্সিলর হয়ে আওয়ামীলীগ-প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে লোক দেখানো রাজনীতিকে দালাল হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধ টাকা আয়ের উৎসকে আড়াল করছে বলে অনেকের অভিমত। নিজ খরচে এলাকায় উন্নয়নের নামে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে শফিকুর রহমান শফিক ওরফে গোল্ডেন শফি

স্টাফ রিপোর্টারঃ

পানের দোকান থেকে জমজম টাওয়ারের মালিক কে এই গোল্ডেন শফি শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে উত্তরাসহ সারাদেশে টপ অব দ্যা টাউনে পরিনত হয়। গোল্ডেন শফির বিরুদ্ধে একের পর এক গোপন অজানা কাহিনী বের হতে শুরু হয়েছে। আমাদের হাতেও এসেছে অনেক গুরত্বপূর্ণ তথ্য। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকায় এবং প্রবেশদ্বার থেকে সকল স্থানে একক আধিপত্য বিস্তার করছে যার নামটি সর্বত্রই সোনা যায় তিনিই হলেন এই গোল্ডেন শফি। একক আধিপত্য থাকায় যেন বিমানবন্দর প্রশাসন সহ সংশ্লিষ্ট সকলেই জিম্মি হয়ে পড়েছেন এই অসাধু সোনা চোরাকারবারির গডফাদার গোল্ডেন শফির কাছে। অনেকেই বলছেন, যেখানে তার জনবল দরকার প্রায় ৫০ জন সেখানে সে প্রায় দু’শতাধিকের বেশি জনবল নিয়োগ দিয়ে তার অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন। এক দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেমন জিম্মি তার কাছে, অপরদিকে তার অবৈধ সকল কার্যক্রম অতি সহজেই বাগিয়ে ফেলেন তার বাহিনী দিয়ে।

 

উল্লেখ্য, একধরনের অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিভিন্ন অভিনব পন্থায় সকল প্রকার অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন গোল্ডেন শফি। যেন দেখার কেউ নাই। সোনা চোরাকারবারির মুল হোতা হিসেবে সুপরিচিত হলেও এবং তার এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে তেমন বেগ পেতে হয়না। এর কারণ হিসেবে জানা যায় যে, বিমানবন্দরের প্রতিটি স্তরেই গোল্ডেন শফি এর নিয়োগকৃত বাহিনী রয়েছে। এরাই কৌশলে সকল স্তর পার করিয়ে দেন সকল অবৈধ কার্যক্রমে। অপরদিকে সরকারী জনবলের থেকে তার বাহিনীর লোকজন অনেক থাকায় এবং সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতায় ও মদদে অবলীলায় চলছে তার সকল অবৈধ কার্যক্রম। সেখান থেকেই বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক।

 

উত্তরা জমজম টাওয়ার, উত্তরায় প্রায় প্রকল্পের কাজ শুরুর দিকে সাফা টাওয়ার, বিভিন্ন সেক্টরে একাধিক প্লটের মালিকানা, বিভিন্ন সেক্টরে একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকসহ নামে বেনামে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন এই সোনা ব্যবসায়ী গোল্ডেন শফি। বিমানবন্দরে কথিত কিছু অসাধু কর্মকর্তার বদৌলতে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সকল অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন গোল্ডেন শফি। যার ফলে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ সকল স্তরে প্রভাব খাটিয়ে দাপিয়ে প্রভাব খাটান এই স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার গোল্ডেন শফি। পুরো বিমানবন্দর এলাকায় যে কোন সময় বড় ধরনের হুমকি কিংবা নিরাপত্তা হীনতায় পরতে পারে দেশের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরটি বলে অনেকেই আশংকা করছেন।

 

এমন একজন চিহ্নিত স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদার এর কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান এই বিমানবন্দরটি ইজারা দেওয়া কতটুকু নিরাপদ এমন প্রশ্নও উঠেছে অনেকের কাছে। প্রকাশ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর উত্তরখান থানা শাখার সহ সভাপতি হওয়ায় যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন এই গোল্ডেন শফি। যেখানে যেই পদ দরকার ব্যবহার করে বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন তার সকল বহুমাত্রিক অবৈধ ব্যবসা। একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, এই গোল্ডেন শফি সিন্ডিকেটই রহস্যজনক কারণে গত ১০ বছর ধরে বিমানবন্দরে পার্কিং কাজের ইজারা পাচ্ছেন। কতিপয় কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে বিমানবন্দরের পার্কিং হাতে রেখে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের এই নেতার সিন্ডিকেট। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকার বেশি সরকারি স্থাপনা ইজারা দিতে হলে দরপত্রের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরে দরপত্র ছাড়াই ১০ শতাংশ মূল্য বেশি দিয়ে বাড়তি একবছর নবায়ন করছে ইজারাদাররা।

 

এছাড়া সর্বোচ্চ দরদাতা না হয়েও দুই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানই ঘুরে ফিরে বারবার পাচ্ছে ইজারা। ফলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশেনের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও উত্তরখান থানা আওয়ামী লীগের নেতা মো. শফিকুল ইসলাম শফিকের মালিকানাধীন মেসার্স শফিক অ্যান্ড ব্রাদার্সকে ২০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ৭ কোটি টাকা মূল্যে দুই বছরের জন্য বহুতল কার পার্কিং ইজারা দেওয়া হয়েছে। যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের ৩০ জুন। পরে ১০ শতাংশ ফি দিয়ে আরও এক বছর নবায়ন করার সুযোগ পাবে এ প্রতিষ্ঠান। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের কার পার্কিংও তারই মালিকানাধীন মেসার্স অথৈ এন্টারপ্রাইজ ইজারা নিয়েছে। ৯৭ লাখ টাকার বিনিময়ে দু’বছর মেয়াদে নতুন করে এ ইজারা নিয়েছেন শফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান। এখানে কার ও মিনিবাস প্রথম তিন ঘণ্টা ১৫০ টাকা, জিপ, ট্যাক্সি ক্যাব ও মাইক্রোবাস প্রথম তিন ঘণ্টা ৮০ টাকা, বেবি ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল প্রথম তিন ঘণ্টা ২৫ টাকা ও বাইসাইকেল প্রথম তিন ঘণ্টা ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই কার পার্কিংয়ের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বহির্গমন কনকোর্স হলও (দ্বিতীয় তলা) নামমাত্র মূল্যে ইজারা পেয়েছে মেসার্স শফিক অ্যান্ড ব্রাদার্স। কনকোর্স হলে দর্শনার্থী প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে নিচ্ছে। এছাড়া ক্যানোপি এলাকায় প্রবেশের বেলায় টাকা দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও সেখানে প্রবেশের জন্যও ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতারণা করে টিকিট ছাপিয়ে জনপ্রতি ৩০০ টাকা নিচ্ছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শফিকুল ইসলাম ২০১০ সাল থেকেই বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা নিয়মিত ইজারা পাচ্ছেন। সিভিল এভিয়েশনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে গত ১০ বছর এককভাবে ইজারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব নিয়ন্ত্রণ করেন শফিকুলের ছোট ভাই জুয়েল।

 

এসব বিষয়ে জানতে মেসার্স শফিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম শফিকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি সাড়া দেননি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করছেন বর্তমান এমন পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থান বিমানবন্দরে সোনা চোরাকারবারিদের কাছে জিম্মি থাকলে যে কোন সময় বড় ধরনের ক্ষতির আশংকাসহ নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশংকাও রয়েছে বিমানবন্দরে। ফলে সরকার ও দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে যার প্রভাব পড়তে পারে সর্বস্তরে বড় ধরনের । তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসহ উর্ধতন সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনেকেই বলছেন, এমন দুষ্কৃতকারী সোনা চোরাকারবারিদের গডফাদার গোল্ডেন শফির বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করতে জোর দাবী জানিয়েছেন। সেইসাথে বিমানবন্দর এলাকা সোনা চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম থেকে বিমানবন্দরকে রক্ষা করত যথাযথ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিমানবন্দরকে অসাধু একক ইজারাদারের জিম্মির হাত রক্ষা করতে জোর দাবী জানিয়েছেন অনেকেই।

 

জমজম টাওয়ারের মালিক ও বিমানবন্দরের সোনা চোরাকারবারির গডফাদার গোল্ডেন শফি এর অন্দরমহলের ভিতরের আরো চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য আগামী পর্বে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে।