বিমান বন্দরের স্পর্শ কাতর এলাকায় ‘অস্ত্রধারী টয়লেট হান্নান গ্রুপ’ বড়ই ভয়ঙ্কর

মীর আলাউদ্দিন : আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মতো রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর এলাকার অস্ত্রধারী ‘টয়লেট হান্নান’ গ্রুপ রীতিমত অপ্রতিরোধ্য সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তিনি যখন তখন সদল বলে বিমান বন্দরের ক্যানোপি, কাস্টমস, কার্গো হাউজ সহ সিভিল এভিয়েশন জুড়ে অবাধে মহড়া দিচ্ছেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করাটা তার এখন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মতো বিশেষ এলাকায় প্রকাশ্য অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় দেশি-বিদেশি যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠার সৃষ্টি হলেও অজ্ঞাত কারণে বিতর্কিত টয়লেট হান্নানের নামে কোনরকম প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
আওয়ামীলীগ নেতা পরিচয়দানকারী মো: আমিনুল ইসলাম হান্নান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর দক্ষিণ খান থানা, ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের কোন নেতা নন- এমনকি ইউনিট কমিটিতে ও তার নাম নাই। তবুও নিজেকে তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্বঘোষিত দাপুটে নেতা হিসেবেই পরিচয় দিয়ে বেড়ান। তার নানা কর্মকান্ডের ঘনিষ্ঠ সহচরদের নিয়ে দল বেধে বিমানবন্দরের নানা স্থাপনায় হাজির হন আর নিজস্ব ক্ষমতা, দাপটের নানা বুলি আউড়ান। তিনি প্রায়ই বহিরাগত অচেনা যুবকদের নিয়ে এলাকায় মহড়া দেয়ার মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। হান্নান বেশ কয়েক বছর জাপান প্রবাসী ছিলেন বিধায় নিজের নাম, বাড়ির নাম, রোডের নাম কিংবা এলাকার নামের সঙ্গে ‘জাপানি’ নামটি যুক্ত করার ক্ষেত্রে বরাবরই তিনি অতি উৎসাহী। তার এই আত্মপ্রচারণার অহমিকার খেসারতের জের হিসেবে এরই মধ্যে হান্নান গ্রুপ সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং দক্ষিণ খানে দুই- দুইটি খুন হয়। তার এসব অপকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশকারী সাংবাদিককে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়েও তাড়িয়ে বেড়ান হান্নান। দিন দিন স্বঘোষিত নেতা হান্নান এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন যে-তার সামনে কারো টুশব্দটি করারও জো নেই। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য বিষয়েও নিজের লাইসেন্স করা আর্ম সতাক করে ভয় দেখান যে কাউকে। যখন তখন ফাঁকা গুলি বর্ষণ চালানোরও এন্তার নজির আছে হান্নানের। তার বিরুদ্ধে থানায় কেউ অভিযোগ করলে অভিযোগকারীকে তা উঠিয়ে নিতে বাধ্য করানো হয়।
কে এই টয়লেট হান্নান?
উল্লেখ্য এই আমিনুল ইসলাম হান্নান সেনাবাহিনীর একজন ড্রাইভার ছিল। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর সে আদম ব্যবসা করত। আদম ব্যবসার দ্বন্দ্ব নিে য়শীর্ষ সন্ত্রাসী শিহাবের সাথে শত্রুতার জের হিসেবে শিহাব বাহিনী তাকে মেরে ফেলার জন্য গুলি করলে অল্পের জন্য সে প্রাণে রক্ষা পায়। এক পর্যায়ে ভাগ্যান্বেষণে নিজেই পাড়ি জমান জাপানে। সেখানে তার স্ত্রী সন্তান থাকা নিয়েও নানা কথা চাউর আছে এলাকায়। জাপান থেকে ফিরেই নেমে পড়েন এমএলএম বাণিজ্যে। এমএলএম ব্যবসার নামেও সে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি টয়লেট বাণিজ্যে নামতেও দ্বিধা করেন নি। এ কারণে রাতারাতি জাপানি হান্নানের নামটি টয়লেট হান্নান হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি পেয়ে যায়।
সম্প্রতি তিনি সব ব্যবসা বাণিজ্য ফেলে অন্যরকম ধান্ধায় পথ চলা শুরু করেছেন। বেশ কয়েক জন সাঙ্গা নিয়ে গড়ে তুলেছেন টয়লেট হান্নান গ্রুপ। হান্নানের নামে লাইসেন্স কৃত অস্ত্র সমূহ তারই গাড়ি চালক, বাসার দারোয়ান ও অফিস কর্মচারীর কোমরে তুলে দিয়ে বানিয়েছেন অস্ত্রবাজ বাহিনী। তারা সেসব অস্ত্রশস্ত্র প্রদর্শন করে বেড়ায় প্রকাশ্যে, বিচরণ করে বিমান বন্দরের যত্রতত্র। বিমানবন্দর কার্গো হাউজ থেকে বিভিন্ন কৌশলে মালামাল বের করে তা বেমালুম গায়েব করে দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর চোরাই বাণিজ্যেও নেমে পড়েছেন টয়লেট হান্নান। অতি সম্প্রতি সাইফুল ইসলাম নামের জনৈক ব্যক্তির কাগজ পত্রাদি হাতিয়ে নিয়ে প্রায় ২২ লাখ টাকার পণ্য সামগ্রী নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেন তিনি। সে সব পণ্য তিনি চোরাই পথে স্থানীয় ব্যবসায়ি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন বলে সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে সাইফুল ইসলাম তার পণ্য সামগ্রি ফেরত পাওয়ার আশায় টয়লেট হান্নানের বাসায় গেলে ক্ষিপ্ত হান্নান তার কপালে অস্ত্র ঠেকান এবং গুলি করে হত্যা করারও হুমকি দেন। ভীত সন্ত্রস্ত সাইফুল এ ব্যাপারে দক্ষিণ খান থানায় একটি জিডি’র (জিডি নং-১০২০, তারিখ- ১৮/ ৪/ ১৭ ইং) পর পুলিশ তদন্তে নেমেই হান্নানের গোডাউন থেকে আংশিক চোরাই মালামাল উদ্ধারে সক্ষম হয়। তা সত্তেও টয়লেট হান্নান বাকি মালামাল চোখের পলকে গায়েব করে দিতে সমর্থ হন। তদন্তের ভিত্তিতে সাইফুলের জিডিটি মামলায় রুপান্তর হয়েছে এবং এরই মধ্যে ওই মামলার চার্জশীট দাখিল হয়েছে আদালতে। দক্ষিণ খান থানায় সাইফুল, আল আমীন শুধু নয়,  আরো তিনজন ভুক্ত ভোগী হান্নানের বিরুদ্ধে জিডি করেছেন।
সাধারণ লোকজন হান্নানের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার ভয় দেখায়। কোনো কোনো সময় সন্ত্রাসী দিয়ে ওই সব ভুক্তভোগীদের প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া হয়। অভিযোগে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম হান্নান (জাপানি হান্নান ওরফে টয়লেট হান্নান) গত ৩ এপ্রিল আইনুছবাগের ময়লা আবর্জনা অপসারনকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মো: আমিনুল ইসলাম হান্নান নিজের সঙ্গে থাকা পিস্তল দিয়ে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে গুলি করে আহত করে। এ ব্যাপারে দক্ষিণখান মওকা খুঁজতে থাকেন তার সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে বিমান বন্দরের সর্বত্র বিচরণ করলেও টয়লেট হান্নান ও তার সহযোগি রাবরাবরই সোনার বড় বড় চালান হজম সময় পর পর দুটি ফ্ল্যাটে আগত কয়েকজন সোনা চোরা চালানি থেকে ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। করার নেশায় ওৎ পেতে থাকেন। গত বছরের মাঝামাঝি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, সংলগ্ন জানা যায়, থানা পুলিশ হান্নানকে গ্রেফতার করে আদালতে চালান দিলেও পরের দিনই সে জামিনে চলে আসে। কিন্তু এরই মধ্যে গত ৪ এপ্রিল নিজ স্ত্রী ডলি ইসলাম পুতুলকে দিয়ে আহত ঐ এইচএসসি পরীক্ষার্থী সহ এলাকার একশ জনের বেশি লোকের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এতে আইনুছবাগ বাসী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
বিমান বন্দরে নেতা সেজে-ফুটপাত, ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা কিংবা স্থানীয় ঝুট ঝামেলাকে পুঁজিকরে নানা ভাবে কামিয়ে নেওয়া টাকার অঙ্কেও তেমন একটা খুশি হতে পারেন নি হান্নান। তাই সে জোট বেধে বিমান বন্দরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকাতেও ঢুকতে থাকে অনায়াসে। দলীয় নেতা হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে দাপট দেখালেও টয়লেট হান্নান মূলত কাস্টমস হাউজ, কার্গো ভিলেজ, সিভিল এভিয়েশন ভবন, ক্লিনিং বিভাগসহ ২৪টি শাখা-উপ শাখায় হরদম চলে হরে কর কম দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, লুট পাটের মচ্ছব। সেখানে হোমরা চোমরা সেজে কেউ হাজির হলেই সংশ্লিষ্টরা টাকা গুজে দিয়ে ‘উটকো ঝামেলা’ বিদায় করে দেয়। মাসো হারার টাকা নিতে হলে চাঁদাবাজদের পরিচিতি থাকতে হয়। এ জন্য এয়ারপোর্টের প্রবেশ মুখে বড় বড় প্যানাসাইন, বিলবোর্ডে নিজেদের ঢাউস ছবি টানানো থাকে। এসব বিলবোর্ডে নিজেকে রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মি পরিচয় দিয়ে ‘ঈদ মোবারক’, শুভনববর্ষ, রমজানের শুভেচ্ছা জানানোসহ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি যুক্ত করা হয়। চাঁদাবাজ নেতা- কর্মিদের প্যানা সাইন ও বিলবোর্ডের ভিড় ভাড়াক্কায় বিমান বন্দরের প্রবেশ মুখে দৃষ্টি কটু, বিশ্রি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। মাসোহারার চাঁদাবাজি থেকে পুলিশ, গোয়েন্দা, ইমিগ্রেশন বিভাগ, দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স শাখা, সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশল বিভাগ, ক্রয়-ভান্ডার শাখা, রেন্ট এ কার, পার্কিংলট, ক্লিনিংশাখা-কারো রেহাই নেই।  কোনো রকম ট্যাক্স  পরিশোধ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। একই ভাবে এ বিমান বন্দরের কার্গো গোডাউন দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য বাইরে পাচার হচ্ছে। সূত্র জানায়, অধিকাংশ চোরাচালানি গ্রুপের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীর রয়েছে গভীর সখ্যতা।
বিমান বন্দরের লাগেজ পাচার গ্রুপগুলোর মধ্যে ও টয়লেট হান্নান গ্রুপ এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে ঝিনুক গ্রুপ, আলী গ্রুপ, জহির গ্রুপ ও সাঈদ গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপেই ১০-১২ জন সুন্দরী তরুণী রয়েছে। তারাই কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ অন্যান্য বিভাগ ম্যানেজ করে মালামাল বের করে আনেন। সংঘবদ্ধ চক্রের অন্য সদস্যরা হচ্ছে আলাউদ্দিন, হাকিম, সাইদ, আরিফকামাল, ওলি, নাজমুল, রুবেল, হাফিজ, নুরুলইসলাম, ইসমাইল, নাজির, ভুট্টো, কালাম, আলমগীর, জাফর, বাবু, পাপ্পু, জয়- তারা সবাই বিমানবন্দরের পরিচিত চোরা কারবারি। এ চোরা চালানি চক্রকে শেল্টার দিয়ে থাকে টয়লেট হান্নান। বিমান বন্দর এলাকায় সোনার চালানগুলো নির্বিঘœ করতে চোরা কারবারীরা অস্ত্রবাজ পাহাড়াদার হিসেবে হান্নান গ্রুপকে ভাড়া করলেও তারাই অনেক ক্ষেত্রে সে সোনা বেমালুম হজম করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।