মাদারীপুরের সেনদিয়া গণহত্যা দিবস আজ

প্রকাশ : শনিবার, মে ১৮, ২০১৯ অপরাহ্ণ ১১:৩৭

মাদারীপুর প্রতিনিধি :

 

আজ (১৯ মে) মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সেনদিয়া গণহত্যা দিবস। একাত্তর সালের ওই দিন রাজৈরের খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া, পলিতা, ছাতিয়ানবাড়ি ও খালিয়া গ্রামের দেড় শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ প্রাণ রক্ষা করতে পার্শবর্তী আখ ক্ষেত ও ঝোঁপ-জঙ্গলে পাকি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামসদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

 

স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও এই গণহত্যা দিবস পালন বা স্মৃতি রক্ষার্থে কোন উদ্যোগ আজো গ্রহণ করা হয়নি। ফলে শহীদ পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও স্বজনহারা ব্যথা বুকে নিয়ে এখনও ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।

 

১৯৭১ সালের ১৯ মে মাস। (৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮) বিকেল ৪টা থেকে ৫টা। পাকিবাহিনী লঞ্চ যোগে গোপালগঞ্জ জেলার ভেন্নাবাড়ি ঘাটে নেমে চরচামটা এলাকা থেকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। সেখান থেকে পাকিবাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় নৌপথে গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর হয়ে রাজৈরের কদমবাড়ী এলাকায় গান বোট থেকে নেমে সড়ক পথে বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে আসছে এমন খবর পেয়ে খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া, পলিতা, খালিয়া ও ছাতিয়ানবাড়ি এলাকার শত শত নর-নারী তাদের শিশু সন্তান নিয়ে আখ ক্ষেতসহ বিভিন্ন ঝোঁপ জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। যারা বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাতে পারেনি তাদেরকে ধরে নিয়ে যায় পশ্চিম সেনদিয়া ফকিরবাড়ির ভিটায়, সেনদিয়া বাওয়ালী ভিটায়, বারিকদার বাড়ীর উত্তর বাঁশ বাগানে, শচীন বারিকদারের বাড়ির দক্ষিণ খালপাড় এবং ছাতিয়ানবাড়ির পুকুর পাড়ে। কারো চোখ বেঁধে, কারো হাত-পা বেঁধে, বাবা-মায়ের সামনে সন্তানকে, আবার সন্তানের সামনে বাবা-মাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আবার কাউকে বুটজুতা দিয়ে লাথি মেরে ক্ষত-বিক্ষত করে আগুনে পুড়ে ও গুলি করে হত্যা করে। অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

 

দীর্ঘ সময় এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে নরপিশাচরা ফেরার পথে পশ্চিম সেনদিয়া গ্রাম দিয়ে যেতেই আখ ক্ষেতে মানুষের শব্দ পেয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। নিমিষেই প্রাণ হারায় শতাধিক মানুষ। এছাড়াও পাকিবাহিনীর দোসররা আখক্ষেত এবং ঝোঁপ জঙ্গলে তল¬াসী চালিয়ে মাটির গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ও ঝোঁপ-জঙ্গলের মধ্যে ৬টি স্পটে দেড় শতাধিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। নারকীয় এ তান্ডব শেষে পাকিবাহিনী ও তাদের দোসররা চলে যাবার পর গ্রামের অন্যান্য লোকজন ও আত্মীয় স্বজন এসে ঝোঁপ জঙ্গল এবং আখ ক্ষেতের মধ্য থেকে লাশ উদ্ধার করে খালের পাশে ৬টি স্থানে দেড় শতাধিক মানুষকে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। এ সকল স্থানে মাটি খুড়লেই মাটির মধ্যে থেকে এখনও মাথার খুলি ও হাড়-গোড় বেড়িয়ে আসছে। সেদিনের ঘটনায় দেড় শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং গুরুতর আহত হয় অনেকেই।

 

১৯৭১ থেকে আজ ২০১৯ সাল। এরই মধ্যে কেটে গেছে ৪৮ বছর। গণসমাধিগুলো সংরক্ষণ বা শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নেয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্ম পাকিবাহিনী ও তাদের দোসররদের এই নারকীয় ঘটনার স্মৃতি ভুলতে বসেছে। সেনদিয়া গণহত্যার স্মৃতি স্মরণ করে স্থানীয় শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ২০০৯ সালের ১৪ এপ্রিল (১ বৈশাখ ১৪১৬) সেনদিয়া গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন। ওই স্মৃতিস্তম্ভে ১২৬ জন শহীদের নাম সম্বলিত একটি স্টোন লাগানো হয়েছে।

 

এ ব্যাপারে রাজৈর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সেকান্দার আলী শেখ বলেন,সঠিক জায়গা সেলেকশন করতে না পারায় ও স্থানীয় প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবে দীর্ঘদিনেও শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা সম্ভব হয়নি । তবে রাজৈর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহানা নাসরিনের সাথে এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেস্টা করেও তাকে না পাওয়ায় তার মন্তব্য জানা যায়নি।