মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:০৬ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :

লোহাগড়ায় মধুমতি নদীর অব্যাহত ভাঙনে অসহায় তিন গ্রামের মানুষ

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • ৮ Time View

মোঃ বুলবুল খান,লোহাগড়া(নড়াইল) :
মধুমতি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার তেতুলিয়া গ্রাম। দুদিন আগে তেতুলিয়া গ্রামের শেষ বাড়িটিও মধুমতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তেতুলিয়া গ্রামটি জেলার মানচিত্রে থাকলেও আর দৃশ্যমান নেই। এখন চরবকজুড়ি ও কামঠানা গ্রামও বিলীনের পথে। গত ১৫ দিনের মধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে এ এলাকার ৩০টি বসতভিটা, বাড়িঘর ও বহু গাছপালা। এছাড়া প্রায় দুই বছর আগে নদীতে বিলীন হয়েছে তেতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচ বছরের ব্যবধানে তেতুলিয়ার দু’টি কবরস্থান এবং ১০ বছর আগে তেতুলিয়ার একমাত্র মসজিদটিও। তবুও ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
লোহাগড়া উপজেলার লোহাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত তেতুলিয়া গ্রাম। এই ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) চাঁন মিয়া মোল্যা জানান, নবম সংসদ নির্বাচনের সময় তেতুলিয়া গ্রামে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০জন। ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৪৫০জন; এই ভোটারের মধ্যেও বেশির ভাগ ভাড়া থাকেন জেলা ও উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায়। সর্বশেষ তেতুলিয়া গ্রামে নান্নু মোল্যাদের বাড়িতে তিনটি পরিবারে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৯জন। দুদিন আগে মধুমতি নদীর ভাঙনে নান্নুদের বাড়িটিও শেষ রক্ষা হয়নি। গত ১০ বছরে তেতুলিয়া গ্রামের ৪০০ পরিবার নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে। এছাড়া কামঠানা, চরবকজুড়ি ও ছাগলছিড়া গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবার মধুমতি নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।  তেতুলিয়া গ্রামের চাঁন মিয়া মোল্যা বলেন, অনেক পরিবার সাতবার পর্যন্ত বাড়িঘর সরিয়েও রক্ষা পায়নি, গ্রাস করেছে মধুমতি নদী। তবুও পাউবো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভাঙনরোধে এই এলাকায় এক ইঞ্চি কাজও করেনি।
তেতুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের আগস্টে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে চলে যায়। এরপর কামঠানা এলাকায় টিনের ছোট একটি ঘরে ক্লাস নেয়া হচ্ছে। জোয়ারের সময় শ্রেণিকক্ষেও পানি উঠছে। ভাঙন প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বর্তমানে যেখানে ক্লাস নেয়া হচ্ছে, সেটিও ভেঙ্গে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য নারায়ন বিশ্বাস বলেন, এ এলাকায় বন্যা নেই। তবে, ভাঙনের কারণে শত শত মানুষকে যেখানে-সেখানে থাকতে হচ্ছে। তেতুলিয়া বিলীন হওয়ার পর চরবকজুড়ি ও কামঠানা গ্রাম ভাঙছে। বলা যায় সবাই সর্বহারা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তেতুলিয়া গ্রামের সব বাড়িই মধুমতি নদী গর্ভে চলে গেছে। নান্নু মোল্যার স্ত্রী মাছুরা বেগম বলেন, নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে আমার দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে রোদ, বৃষ্টিতে অনেক কষ্টে আছি। সরকার একটু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে দিক। কামঠানা গ্রামের হামিদুল শেখ বলেন, তিনবার নদী ভাঙনে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকবার আমাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। এখন পরের বাড়ি থাকি, কৃষি কাজ করি। তেতুলিয়া গ্রামের মগরেব মোল্যা বলেন, আমার বাড়ি সাতবার ভেঙে গেছে। ওই গ্রামের মমরেজ মোল্যা বলেন, নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা সব হারিয়ে তেতুলিয়া ও কামঠানা গ্রামের শত শত মানুষ এখন ফকিরের মতো। বেশির ভাগ এখন কৃষাণ বিক্রি (শ্রম বিক্রি) করে খায়। ২০ বছর ধরে ভাঙলেও কেউ কোনো কাজ করেনি।
তোরাপ মোল্যা বলেন, পাঁচবার বাড়িঘর সরানো হয়েছে। খুব অসহায় অবস্থায় আছি। এছাড়া আমাদের মসজিদ ও কবরস্থান নদীগর্ভে চলে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের-একটাই দাবি, পাথর দিয়ে নদীটা যেন বেঁধে দেয়। চরবকজুড়ি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস মোল্যার স্ত্রী জাহানারা বেগম বলেন, নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখন পরের জায়গা বসবাস করি। চরবকজুড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা চরবকজুড়ির হোসেন চৌকিদারসহ এ এলাকার কয়েকটি পরিবার তাদের টিনের ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ খুলছেন চালা, কেউ বেড়া, কেউবা ঘর থেকে বের করছেন আসবাবপত্র। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য মোবাইল ফোনে অনুরোধ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। এছাড়া বিভিন্ন আকারের মেহগনি গাছগুলো কেটে দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছেন। ওই এলাকার আলেক মোল্যার স্ত্রী বেগম বিবি বলেন, নদী ভাঙনের কারণে বসতঘর ভেঙ্গে এনে পরের জায়গার ওপর রাখছি। এখন চরবকজুড়িতে রাস্তায় পাশে বসবাস করছি।
লোহাগড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মান্টু সিকদার জানান, ছাগলছিঁড়া-আমডাঙ্গা-চরবকজুড়ি থেকে লোহাগড়া উপজেলা সদরে যাতায়াতের কাঁচা রান্তার প্রায় এক কিলোমিটার অংশ এখন মধুমতি নদীগর্ভে। লোহাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল সিকদার বলেন, আমার নির্বাচিত এলাকার মধ্যে ‘তেতুলিয়া’ ওয়ার্ড মানচিত্রে থাকলেও দৃশ্যমান নেই। বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে নদী শাসনে কাজ করলেও আমার এলাকায় কোনো কাজ হয়নি। ভাঙন রোধে দ্রুত কাজ না করলে তেতুলিয়ার পাশের গ্রাম ছাগলছিঁড়া, কামঠানা ও চরবকজুড়িও বিলীন হয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, খবর পেয়ে তেতুলিয়ার ভাঙন কবলিত অংশ পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। প্রয়োজনীয় বাজেট পেলে ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এই সাইটের কোন লেখা কপি পেস্ট করা আইনত দন্ডনীয়

Headlines