Amar Praner Bangladesh

আওয়ামীলীগের এজেন্ট দিয়ে আহবায়ক কমিটি কোন্দলে পুড়ছে ঘাটাইলের বিএনপি

 

 

আ: রশিদ তালুকদার, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি :

আওয়ামীলীগের এজেন্ট ও নিষ্ক্রিয়দের দিয়ে কমিটি গঠন করায় চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পুড়ছে ঘাটাইল উপজেলা ও পৌর বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদকে টাঙ্গাইল -৩ ঘাটাইল আসন থেকে সরাতে একটি মহল স্থানীয় নেতাকর্মীদের দ্বদ্ধে জড়িয়ে বিভক্তির চেষ্টা করছে। এর জের ছড়িয়ে পড়ছে ঘাটাইল পৌরসভা সহ ১৪টি ইউনিয়নে। ঘেষিত আহবায়ক কমিটি চালাতে পারছেনা কোন প্রকার সাংগাঠনিক কার্যক্রম। সাবেক কমিটির কোন নেতাকর্মী তাঁদের সাথে না থাকায় এ কমিটি শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে জানা যায়, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বাসাইলে বাসিন্দা ওবায়দুল হক নাছির মনোনয়ন পেতে দলীয় আদর্শ ভুলে তাঁর পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি গঠন করেছে। বহিরাগত এ নেতার ইচ্ছা অনুযায়ী বিভিন্ন সময় আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িতরা এ কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এ কারনে দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন বেশ কিছু ত্যাগী ও প্রবীণ নেতা। আবার কিছু নেতা সুযোগ বুঝে দুই পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে সরকার বিরোধী আন্দোলনে সাংগাঠনিক শক্তি জোগাতে পারবেনা ঘাটাইল উপজেলা ও পৌর বিএনপি। এ পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মসূচিতে আগের মতো অসংখ্য নেতা-কর্মীও মাঠে পাওয়া যাবেনা। এ কারনে মহাখুশী সরকারি দল।

ঘাটাইল উপজেলা ও পৌর বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলে জানাযায়, উপজেলা বিএনপির আহবায়ক সিরাজুল হক সানা দীর্ঘ দিন যাবত আওয়ামীলীগের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে তিনি প্রকাশে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল হক মঞ্জুর বিরোধীতা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে এ নির্বাচনে তিনি কৃষক শ্রমিক জনতালীগের হয়ে কাজ করেছেন। সদস্য সচিব আলহাজ¦ বেলাল হোসেন কখনো বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। বিএনপি ক্ষতায় থাকা কালে তিনি নিয়োগ বানিজ্য করে কোটিপতি বনে গেছেন।

এ ছাড়া ৮জন যুগ্ম-আহবায়কের মধ্যে ৬জনই আওয়ামীলীগের এজেন্ট। এর মধ্যে অদুদ খান বাদল ১/১১র পর থেকে বিএনপির কোন মিছিল মিটিংএ তাঁর কোন ছায়াও কেউ দেখেনি। হারু-অর-রশিদ ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর সাথে আতাঁত করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। মঞ্জুরুল কাদের বকুল এক সময় জাসদ করতেন। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিলেও গত ২০বছরে বিএনপির কোন কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। মামুনুর রশিদ বাদশা ভূইঁয়া একজন জন বিচ্ছিন্ন লোক। ইতি পূর্বে তাকে ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব করায়। নিজ বাড়ীর সামনে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করে নেতা-কর্মীরা। শফিউর রহমান মুক্তা। যিনি এলাকায় লিয়াজোঁ মাষ্টার হিসেবে পরিচিত। গত ২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামীলীগের সাথে লিয়াজোঁ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এবারও ইউপি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে এবারও ইউপি নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে জেতানোর কৌশল হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেন। শাহীনুর রহমান শাহীন ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামীলীগে যোগদান করেন।

পৌর আহবায়ক কমিটির চিত্র একই রকম। সদ্য সরকারি চাকুরী থেকে অবসরে আসা আব্দুল বাছেদ করিমকে করা হয়েছে আহবায়ক। যাঁর কোন সাংগঠনিক পরিচয় নাই। চাকুরীরত অবস্থায় তিনি আওয়ামীলীগের সাথে লিয়াজোঁ করে চলেছেন। অবসরে এসেও তিনি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন। গত ৫মে আওয়ামীলীগ নেতা এডভোকেট শহিদুল ইসলামের এক মত বিনিময় সভায় তাঁকে মঞ্চে দেখা গেছে। সদস্য সচিব আনোয়ার হোসেন হেলাল এর আওয়ামীলীগের সাথে সখ্যতা রয়েছে। যুগ্ম-আহবায়কদের মধ্যে এস এম আব্দুল লতিফ গত ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় আনুষ্ঠানিক ভাবে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। হাবিবুর রহমান হাবিবকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বিভিন্ন কর্মকান্ডে দেখা গেছে।

ইখতিয়ার মাহমুদ রোবেজ দীর্ঘ দিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। আনোয়ারুল আজিম রানা দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে নেই। আল-হেলাল বিশ^বাসী গত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই আওয়ামীলীগে যোগদেন। কামরুজ্জামান শোয়েব রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। তিনি এখন খুনের মামলায় জেল হাজতে। মূলত যাঁদের দিয়ে উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁদের বেশীর ভাগ আওয়ামীলীগের এজেন্ট।

ঘাটাইলের বিএনপির এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে নাখোশ দলের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। চলমান পরিস্থির জন্য তাঁরা জেলা নেতৃত্বকেই দোষারোপ করছেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদের সাথে সমন্বয় করে কমিটি গঠন করা হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না বলে তাদের ধারণা। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতে লুৎফর রহমান খান আজাদের সঙ্গে কোন আলোচনা ছাড়াই ঘাটাইল উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহবায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘ দিনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তার হাতে গড়ে উঠা নেতা-কর্মীরা হতাশা ব্যক্ত করেন।

এ পরিস্থিতিতে উপজেলা ও পৌর বিএনপিকে রুখে দিতে তৎপরতা চালাচ্ছেন আজাদ অনুসারীরা। অপরদিকে বাসাইলের বাসিন্দা বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঐ সদস্য ঘাটাইলের নেতৃত্ব পেয়ে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। যাতে উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গুলোর কোন সাবেক নেতাই সহায়তা করছে না। তবে দুটি গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেছে অধিকাংশ ইউনিটে। যা আগামী সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দীর্ঘ দিন ঘাটাইল বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া লুৎফর রহমান খান আজাদের ঘনিষ্ঠজনরা মেনে নিচ্ছেনা বাসাইলের বাসিন্দা ওবায়দুলহক নাছিরকে। ঘাটাইলের বিএনপিতে এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। উপজেলা ও পৌর আহবায়ক কমিটি ঘোষনার পর থেকে প্রকাশ্যে বিরোধ শুরু হয়েছে। ঘোষিত কমিটি বাতিলের দাবিতে লুৎফর রহমান খান আজাদ সমর্থকরা বিক্ষোভ করেছেন। ঘাটাইলের রাজনীতিতে শেকড় গাড়তে চেষ্টা করছেন ওবায়দুল হক নাছির। তবে বহিরাগত হওয়ায় দৌঁড়ে টিকতে পারছেনা লুৎফর রহমান খান আজাদের সঙ্গে। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনাও ঘটেছে।

বিরাজমান দ্বদ্ধে ঘাটাইলের বিএনপি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক কমিটির নেতারা। তাদের দৃষ্টিতে এর সমাধান একটাই। আর তা হলো পকেট কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন কমিটি করা। উপজেলা ও পৌর উভয় কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে সবার পরামর্শে সমন্বিত কমিটি গঠনের দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতাদের তারা পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান। ঘাটাইলের বিএনপির জন্য লুৎফর রহমান খান আজাদের বিকল্প নেই বলে দাবী করে তারা বলেন, বিরাজমান সাংগঠনিক সমস্যা সমাধানে জেলা নেতৃবৃন্দকে সোচ্ছার হতে হবে। নিজের লোক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের লোক হিসেবে নেতা-কর্মীদের বিবেচনা শুরু করলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ঘাটাইল পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক পৌর মেয়র, মঞ্জুরুল হক মঞ্জু বলেন, ঘাটাইলে যোগ্য লোকের অভাব নেই। বাসাইলের কোন বাসিন্দাকে ঘাটাইলে বিএনপির হাল ধরতে হবে না। উনার সাংগঠনিক বেশী দক্ষতা থাকলে তা বাসাইলে প্রয়োগ করুক। টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে সবচেয়ে বাসাইলের বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল। টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক কোষাদক্ষ মাইনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামীলীগের এজেন্টদের দিয়ে ঘাটাইলের বিএনপির আহবায়ক কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি বাতিল করে ত্যাগী ও যোগ্যদের দিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সাম্পাদক আ.খ.ম. রেজাউর করিম বলেন, ঘাটাইলের বিএনপি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত ঘোষিত কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি করতে হবে।

ঘাটাইল পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন ধলা বলেন, দুঃসময়ে যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের কাজ করেছে। তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। তদন্ত সাপেক্ষে আওয়ামী এজেন্টদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করতে হবে।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু এ ব্যাপারে বলেন, এটি অল্প সময়ের জন্য, সীমিত পরিসরে কমিটি। এ কারনে অনেক ত্যাগী নেতা কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। সম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হবে। সেখানে সবাইকে জায়গা করে দেওয়া যাবে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান বলেন, এ ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই।