আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশকারীদের মসনদ ভেঙ্গে যাবে প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানে

 

(যাদের মুখে নৌকা অন্তরে ধান, তারাই আজ দিচ্ছে বেশি জয়বাংলা স্লোগান। যাদের চৌদ্দগোষ্ঠী দেয়নি নৌকায় ভোট, তাদের গায়ে আজ মুজিব কোট। এমনি মুখরিত স্লোগানে ত্যাগী নেতাকর্মীদের বুঁক ফাটা উচ্চারিত রাজপথ কাঁপানো মুষ্ঠিবদ্ধ মিছিলে জাতির জনকের জ্বালাময়ী ভাষন রক্তের ধাবমান স্রোতে দেশপ্রেমের স্ফূলিঙ্গ ঘাম হয়ে ঝরে পড়ে, এখানে হাইব্রিড অনুপ্রবেশকারী শকুনের দল আচড়ে পড়লে বঙ্গবন্ধুর বেটি মানবে কি করে।)

 

আব্দুল্লাহ্ আল মামুন :

বিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত স্বাধীনতা স্বপক্ষের এই বৃহৎ রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশকারী-হাইব্রিডরা মীর-জাফরের মতো বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের পিঠে বিশ্বাস ঘাতকতার ছুরি মেরে প্রকৃত ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে বেপরোয়া। যা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের জন্য অশনী সংকেত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগপযোগী এই শুদ্ধি অভিযানের কার্যক্রম দলের জন্য ত্যাগী নেতাকর্মীদের সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি আদর্শিক রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ ঘটাবে। বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন উড়ে এসে জুড়ে বসারাই দলে অঘটন ঘটায়।

চলতি মাসেই দেশ জুড়ে জোরালোভাবে শুদ্ধি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একে একে সব বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করাই এর লক্ষ্য। সারা দেশে দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের ৮ হাজার নেতার একটি তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই তালিকা প্রস্তুত করেছেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দলীয় সূত্র জানায়, বিতর্কিত এই ৮ হাজার নেতার মধ্যে ৫ হাজারই বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারী। অনেকে আবার বড় নেতাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত। তবে যত প্রভাবশালী এবং সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের যত ঘনিষ্ঠই হন না কেন, এবার ছাড় পাবেন না কেউ। কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতে নারাজ সরকার ও দল। আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে জানান, ‘সম্প্রতি কয়েক জন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একটি বার্তা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে অপকর্মকারীরা দলের লেবাস ব্যবহার করে ছাড় পাবে না। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। সাংগঠনিক শাস্তি গ্রহণের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আওয়ামীলীগের সম্পাদকমণ্ডলীর তিন জন নেতা জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান জোরালো মর্মে গুরুত্বপূর্ণ  বৈঠক হয় বলে জানা যায়। বিতর্কিতদের দলীয় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। দলের তৃণমূল শাখা সম্মেলনে তাদের অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ থাকবে। রেহাই পাবেন না বিতর্কিত এমপিরাও।

ইতিমধ্যে দলীয় মনোনয়নে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে পাবনা-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে টানা ২৫ বছর পর এ আসনে সাবেক এমপি ডিলু পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্যের পতন হয়েছে। করোনাকালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আরো দুটি আলোচিত ঘটনা হচ্ছে করোনার সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণায় জড়িত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম এবং জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে গ্রেফতার করা।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মহাপ্রতারক সাহেদ আওয়ামীলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকার ও দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। ভবিষ্যতে কোনো কারণে কোনো উপকমিটিতে সাহেদদের মতো কাউকে জায়গা দেওয়া হলে তার দায়দায়িত্ব কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিবকেই নিতে হবে এবং দলের হাইকমান্ডের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে।

ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান প্রথম জীবনে করত জাতীয় পার্টি, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে হয়ে যায় সাতুরিয়া ইউনিয়নের বিএনপি’র সভাপতি আবার বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে রাজাপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি এবং সাতুরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হন।

কিন্তু আওয়ামীলীগের লেবাস লাগিয়ে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে দূর্দান্ড দাপট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শুদ্ধি অভিযানে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে তার কোন পদ নেই। এভাবে তৃণমূল থেকে দলের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত চলবে শুদ্ধি অভিযান। বৈঠক সূত্র জানায়, ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পরে বৈঠকে আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ সম্পাদকমণ্ডলীর বেশ কয়েকজন নেতা বক্তব্য রাখেন।

এ সময় তারা বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের যেন কোনোভাবেই দলে জায়গা না দেওয়া হয় সে বিষয়ে আলোচনা করেন। এদিকে সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুল মানব পাচারে অভিযুক্ত হয়ে কুয়েতে গ্রেফতারের ঘটনায়ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সংসদে বলেছেন, ‘ঐ সংসদ সদস্য (পাপুল) কুয়েতের নাগরিক হলে তার আসনটি (লক্ষ্মীপুর-২) খালি করে দিতে হবে।

বিতর্কিত এমন আরো অনেকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানকে সর্বমহল থেকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশ জুড়ে ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ক্যাসিনোকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় তৎকালীন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়।

একইভাবে নির্মাণ খাতের ‘গডফাদার’ জি কে শামীমসহ যুবলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের আরো কয়েক জন নেতার ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। পদ হারিয়েছেন তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার, সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ অনেকেই।

ব্যাংক হিসাব তলব ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ নানা আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। তদবীর-বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যাওয়া নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকেও জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া অনেক বিতর্কিত এখনো আত্মগোপনে আছেন।

গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। জানা গেছে, গত সাড়ে ১১ বছরে ৫৫ হাজার বিরোধী মতাদর্শী আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে ৫ হাজার অধিকতর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত।

রাজাকার ও পাকবাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত শান্তি কমিটির প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এমন ব্যক্তিও তাদের সন্তান-স্বজনদের কেউ কেউ নানা কৌশলে আওয়ামীলীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোতে ঢুকে পড়েছেন। যেমন গোপালগঞ্জ নিজড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজ রাজাকার পরিবারের বংশধর। যে বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু কিভাবে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়।

এক সময় যারা ফ্রিডম পার্টি, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ২০০৯ সালের পর তারা দলে দলে সরকারি দলে যোগদান করা শুরু করেন। এসব অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয়দাতার তালিকায় আছেন ৬৭ মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা। সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় যেসব জেলা, মহানগর ও সহযোগী সংগঠনের সম্মেলন হয়েছে তাদের আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী কাউকে না রাখতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর একজন সদস্য জানান, দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই দলের নেতাকর্মীদের অপকর্মে জড়িয়ে পড়াকে অপছন্দ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তার কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকে না।

কিন্তু কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন এরই মধ্যে তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে দলে অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আশ্রয়দাতারা আর বিতর্কিতদের রক্ষা করতে পারবে না। উড়ে এসে জুড়ে বসারাই দলে অঘটন ঘটায় : প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা মিলিটারি ডিরেক্টটরদের হাতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক কর্মী বা যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, যুদ্ধাপরাধের মদদ দিয়েছে তারা যেন আমাদের দলে না আসে।

তারা দলের ক্ষতি করে এবং অঘটন তারাই ঘটায়। এসময় তিনি বলেন, দলের যখন কোন্দল শুরু হয় তখন দেখা যায় যে, যারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তারাই এই কোন্দলের জন্য দায়ী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে এদিক ওদিক থেকে কিছু লোক দলে জোটে। অঘটনের বোঝাটা দলকে বয়ে বেড়াতে হয়। তারা ভালো ব্যবহার করে এমনভাবে চলে আসে যে, আমাদের কেউ কেউ তার দল ভারী করার জন্য তাকে কাছে টেনে নেয়।

কিন্তু তাদেরকে নেয়া দলের জন্য সবচাইতে বেশি ক্ষতিকারক। আমাদের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে, আমাদের জনগণ আছে আমাদের সংগঠন আছে। বাংলাদেশে একমাত্র সংগঠন আওয়ামীলীগ তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত, আমাদের সংগঠন সুসজ্জিত । আমাদের নেতার আদর্শভিত্তিক সংগঠন আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই দেশ আজ উন্নত হচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, আমরা পেয়েছি বাংলাদেশ। তার সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে চলছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে। তার কুসুম বাগানে কোন অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিডরা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারবে না। এমনটাই প্রত্যাশা সবার। আগে সোনার বাংলা, পরে অন্যসব। সাধু সাবধান।