Amar Praner Bangladesh

আগামীর স্বপ্নসৌধ নির্মাণের মূলকেন্দ্র শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত

 

শের ই গুল :

বিশ্ব চিরাচরিত যে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ছিল এবং অর্থনৈতিকভাবে পৃথিবী বিগত দশকগুলোতে যে অগ্রগতির ধারায় এগুচ্ছিল, কোভিড-১৯-এর কারণে ব্যাপকভাবে তার নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘকালের ধারাবাহিকতায় শিক্ষা ব্যবস্থার ধরন ও স্বরূপ বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং ক্রমশ তার আধুনিকায়ন ঘটেছে।

কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে যে পরিবর্তন ঘটেছে তাতে নতুন প্রজন্মের আগামীর স্বপ্নসৌধ নির্মাণের মূলকেন্দ্র শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। করোনার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় মোট শিক্ষার্থীর ৯৪ ভাগ কোনো-না-কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ৯৯ ভাগই নিম্ন বা নিম্নমধ্য আয়ের দেশের শিক্ষার্থী। বর্তমান পৃথিবী এমন এক বিপর্যয়ের শিকার, যার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পড়বে, মানবজাতির অন্তর্গত যে সম্ভাবনা রয়েছে তা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, বিগত দশকগুলোর উন্নতির যে ধারা তা বাধাগ্রস্ত হবে।

শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ব্যাঘাতের কারণে শিশুদের পুষ্টিহীনতা, বাল্যবিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপক আশংকা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, করোনার কারণে প্রায় ১ কোটি আর কখনো স্কুলে ফিরবে না। প্রায় ১২ কোটি বাচ্চার পরিবার দারিদ্র্যের শিকার হবে। বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নাইজার, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, ইয়েমেন, গিনি, মরিটেনিয়া, লাইবেরিয়া ও চাদ- এসব দেশের শিক্ষার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। পুরো পৃথিবীর এমন ভয়াবহ মহামারির রূপ এই প্রথম। এত বড় আঘাত পৃথিবীতে আর কখনো ঘটেনি। ১৯০ টিরও বেশি দেশের প্রায় ১.৬ বিলিয়ন শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পৃথিবী নিজেই যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, সেই পৃথিবীর ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ এখানে মৃত্যু আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, শিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ভয়ংকর ক্ষতির শিকারে পরিণত হচ্ছি। তারপরও মানুষ সবসময় সব ধরনের প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে, মহামারিকে জয় করে জীবন জয়ের গান গেয়ে। করোনা মহামারীতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থা চরম সংকটে। এই শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। পরিবেশের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্ষমতা দখল বেদখলের প্রক্রিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা করুন ছিল সবসময়।

এখনতো মহামারী এই মহামারীকে নিয়েও চলছে অনেক ব্যবসা ও রাজনীতি। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট অর্থাৎ সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে রেখে কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলতে পারেনা। অনেকের মতে বাজার সহ মার্কেট চলছে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ চলছে তার মধ্যে আবার লকডাউনও চলছে, মাঝখানে স্কুল কলেজ বন্ধ। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ গড়িমসি করলে এর কুফল সম্পূর্ণ জাতিকে পোহাতে হবে। করোনাভাইরাস মহামারিকালে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এক বেসরকারি গবেষণায় উঠে এসেছে যে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশই নিতে পারেনি।

স্কুল বন্ধ থাকায় ক্লাস পরীক্ষা আর মূল্যায়নের যে বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটি নিয়েও নানা রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ঠ সবার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরাও চান ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থা তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে আরো আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক আর সবার সাধ্যের আনা হোক। এ অবস্থায় চলমান মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে শিক্ষায় ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে মতামত আসছে। সরকারের পক্ষ থেকেও জাতীয় পাঠ্যক্রম সংস্কারের উদ্যোগের কথা জানা যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরেই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গত শিক্ষাবর্ষেও ক্লাস-পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন হয়েছে বিকল্প পদ্ধতিতে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা অনেকেই ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষায় যারা অংশ নিয়েছে, তারাও বলছে যে বহুরকম সমস্যায় তাদের পড়তে হয়েছে। উত্তরবঙ্গের একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, কোন কিছু না বুঝলে তারা শ্রেণীকক্ষে যেভাবে শিক্ষককে প্রশ্ন করে বুঝে নিতে পারতো, সেটা অনলাইনে সম্ভব হয়নি। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় ডিভাইসের সংকটের কথাও জানাচ্ছিলেন আরেকজন শিক্ষার্থী।

ঢাকার একজন শিক্ষার্থীও জানিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে সে অনলাইনে কোনো ক্লাসই করতে পারেনি। প্রাণঘাতী করোনায় দীর্ঘ বন্ধে আর্থিক সঙ্কটে পড়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পেতে চায় দেশের বেসরকারী শিক্ষাখাতের প্রায় সকল সংগঠন, প্রতিষ্ঠান। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারী স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা ছাড়া বেসরকারী শিক্ষার সকল স্তরের পক্ষ থেকেই সহায়তার দাবি উঠেছে। শিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশের যোগান দেয়া বেসরকারী খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও কর্মচারী সমিতির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই সরকারের কাছে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধার জন্য আবেদন করা হয়েছে। কেউ কেউ আবেদনের পর সংবাদ সম্মেলনেও দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন।

শিশুদের কিন্ডার গার্টেনসহ বেসরকারী স্কুল, কলেজ, থেকে শুরু করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা সকলেই সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। সহায়তা চেয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরাও। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও এ দাবিকে যৌক্তিক অভিহিত করে শিক্ষা খাতের বর্তমান আর্থিক সঙ্কট ও ভবিষ্যতের ঘনায়মান আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এজন্য প্রয়োজনে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করে শিক্ষাবিদরা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো র্দুর্বল হয়ে পড়লে মালিকরা প্রতিষ্ঠান চালাতে গণহারে ছাঁটাই করবে। জনবল না কমালে তারাও চালাতে পারবে না। চাপ দিলেও ফল পাওয়া যাবে না। ফলে বেসরকারী শিক্ষা খাতে প্রণোদনা না দিলে শিক্ষা বিস্তার তো বটেই আরও অনেক ধরনের সঙ্কট তৈরি হবে। এখানে লাখ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী আছেন তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার সামাজিক অবস্থার কারণে তারা করো কাছে সাহায্যও চাইতে পারবে না।

এজন্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও দেশের বড় বড় নামী বেসরকারী স্কুল ও কলেজকেও মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিষেজ্ঞরা। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থেকেরই বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত নন। তাদের বেতন ভাতা হয় প্রতিষ্ঠানের আয় থেকেই। বেসরকারী স্কুল, কলেজের উদ্যোক্তারা বলছেন, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে সম্প্রতি এক আদেশে টিউশন ফি আদায়ে চাপ প্রয়োগ না করতে তাদের নির্দেশ দিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে বকেয়াসহ মাসিক বেতন আদায়ের কথা বলেছে।

এমন অবস্থায় উভয়সঙ্কটে পড়েছেন তারা। কারণ তারা বেতনও চাইতে পারছেন না। বেশির ভাগ অভিভাবকও এ মুহূর্তে বেতন দিতে রাজি নন। আবার বেতন আদায় না করলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না। করোনার সঙ্কট আরও দীর্ঘায়িত হলে বিপদ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের। দেশের বেসরকারী শিক্ষার কোন কোন ক্ষেত্রে মান ও বাণিজ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংখ্যাগত দিক চিন্তা করলেই করোনার এই ছোবলের মধ্যে সরকারী সহায়তার যৌক্তিকতা সামনে চলে আসে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই বেসরকারী খাতের অংশগ্রহণ ৯০ শতাংশের বেশি। কোন কোন স্তরে ৯৫ শতাংশেরও বেশি। কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার বেশিরভাগই বেসরকারী। সরকারী ও এমপিওভুক্ত বাদে এ খাতে ছোট-বড় মিলিয়ে সাড়ে সাত হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সম্পূর্ণই নিজস্ব আয়ে চলে। তারা টিউশন ফি নিতে না পারায় বেশ সঙ্কটে পড়েছে।

পরিস্থিতি তুলে ধরে বাংলাদেশ বেসরকারী পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ও রাজধানীর শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ এম এম সাত্তার বলছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত চেষ্টায় দেশের কারিগরি শিক্ষায় আজ যে অর্জন তা কিন্তু বেসরকারী স্তরেই। আজ যে সঙ্কটে পড়েছে এ খাত সেখানে যদি প্রণোদনা না দেয়া হয় তাহলে জননেত্রী শেখ হাসিনার এ অর্জন যেমন সঙ্কটে পড়বে তেমনি আর কতদিনে এ খাত দাঁড়াতে পারবে তাও ভাবা কঠিন। প্রণোদনা দিলে বেসরকারী বিশাল এ খাত একটু হলেও দাঁড়াতে পড়বে। চরম সঙ্কটে পড়েছেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন। সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)।