Amar Praner Bangladesh

আজ কমিশনিং করবেন প্রেসিডেন্ট খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন টাগ

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো: সশস্ত্র বাহিনীসমুহের প্রধান ও প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ আজ খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত দুটি যুদ্ধ জাহাজসহ ২টি সাবমেরিন টাগ-এর কমিশনিং করবেন। খুলনার ‘বিএনএস তিতুমির ঘাটি’তে এসব সমর নৌযানের কমিশনিংসহ বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর করবেন প্রেসিডেন্ট। এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে নৌ বাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমদ, ওএসপি, এনডিসি, পিএসসি-বিএন ছাড়াও খুলনার কমোডর কমান্ডিং ও খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস’াপনা পরিচালকসহ উচ্চ পর্যায়ের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপসি’ত থাকবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ত্রীমাত্রীক নিরপত্তা সমর কৌশলে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন টাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। খুলনা শিপইয়ার্ড প্রথমবারের মত এত বড়মাপের যুদ্ধ জাহাজ ছাড়াও অত্যাধুনিক সাবমেরিন টাগ নির্মানের ফলে সমর নৌযান নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশেষ মর্জাদা লাভ করতে যাচ্ছে। এমনকি দেশে প্রথমবারের মত এধরনের যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন টাগ নির্মাণের ফলে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রারও সাশ্রয় হচ্ছে।
২০১৫-এর ৬সেপ্টেম্বর ‘বিএনএস নিশান’ ও ‘বিএনএস দূর্গম’ নামের বড়মাপের যুদ্ধ জাহাজ দুটির কীল-লে’র মাধ্যমে নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৮শ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এসব যুদ্ধ জাহাজ নৌ বাহিনী প্রধান গত ২৯ডিসেম্বর ও ১৫মার্চ আনুষ্ঠানিক লঞ্চিং-এর মাধ্যমে শিপইয়ার্ড-এর স্লীপওয়ে থেকে রূপসা নদীতে ভাসান। এর আগে খুলনা শিপইয়ার্ড ৫টি পেট্রোল ক্রাফট-এর নির্মান কাজ সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করে নৌ বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব যুদ্ধ জাহাজের নির্মান কাজের সূচনা ও তা কমিশনিং করে নৌবাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছিলেন।
চীনের সিএওসি এর কারিগরি সহায়তায় নির্মিত ৬৪.২০মিটার দৈর্ঘ ও ৯মিটার প্রস’ বিএনএস নিশান ও বিএনএস দূর্গম নামের যুদ্ধ জাহাজগুলোতে সারফেস টারগেট-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ৭৬মিলিমিটার ও ৩০মিলমিটারের দুটি গান ছাড়াও সাবমেরিন-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য টর্পেডো লাঞ্চার সহ বেশ কিছু সয়ংক্রীয় অস্ত্র সংজোযন করা হয়েছে। যুদ্ধ জাহাজ দুটি থেকে আকাশে শত্রু যুদ্ধ বিমান ছাড়াও ভূমিতে ও সমুদ্রে সাবমেরিন সহ যেকোন সমর নৌযানকে ঘায়েল করা সম্ভব হবে। এছাড়াও এসব সমর নৌযানে এয়ার এন্ড সারফেস সার্চ রাডার, ট্রাকিং রাডার, নেভিগেশন রাডার এবং হাল মাউন্টেড সোনারও সংযোজন করা হয়েছে।
চায়না ক্লাসিফিকেসন সোসাইটি-সিসিএস-এর নিবিড় তত্ববধানে নির্মিত যুদ্ধ জাহাজ দুটি ৬৭৪টন পানি অপসারন করে প্রতি ঘন্টায় ২৫নট বা প্রায় ৪৭কিলোমিটার বেগে ছুটে চলতে সক্ষম। একনাগারে ২হাজার নটিক্যাল মাইল বা ৩হাজার ৮শ কিলোমিটার নৌপথ, সাগর ও উপকূলীয় এলাকায় চলাচলে সক্ষম এ যুদ্ধ জাহাজ দুটিতে ৭০জন নৌসেনা ও নাবিক থাকছে। চীনে তৈরী ৭,৬৪০অশ্বশক্তির দুটি মূল ইঞ্জিন ছাড়াও এসব যুদ্ধ জাহাজে আমেরিকার কেটারপিলার কোম্পানীর ১৬৫কিলোওয়াটের দুটি করে জেনারেটর ইঞ্জিনও থাকছে।
অপরদিকে নৌ বাহিনীর জন্য সংগৃহীত দুটি সাবমেরিন’কে পোতাশ্রয় থেকে সাগর মোহনায় আনা নেয়ার জন্য খুলনা শিপইয়ার্ড ২টি সাবমেরিন টাগও নির্মাণ করেছে। সাফল্যজনকভাবে নির্মাণ শেষে ‘বিএনএস হালদা’ ও ‘বিএনএস পশুর’ নামের এসব সাবমেরিন টাগ গত ৩১অক্টোবর ও ১৫মার্চ নৌ বাহিনী প্রধান খুলনা শিপইয়ার্ড-এর স্লীপওয়ে থেকে লঞ্চিং করে রূপসা নদীতে ভাসান। ফ্রান্সের ‘ব্যুরো ভেরিটাস’ এর তত্ববধানে ৩২মিটার দৈর্ঘ ও ১১.৬০মিটার প্রস’ এসব সাবমেরিন টাগ ঘন্টায় ১২নটিক্যাল মাইল বা ২২.৪৫কিলোমিটার পথে সাবমেরিন টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম। কানাডার বিখ্যাত ডিজাইন ফার্ম ‘রবার্ট আল্লান লিমিটেড’ এর নকশায় মালয়েশীয়ার ‘গ্রেড ওয়ান মেরিন শিপইয়ার্ড’-এর কারিগরি সহায়তায় এসব সাবমেরিন টাগ নির্মিত হয়েছে। আমেরিকার ‘কামিন্স’ কেম্পানীর আড়াই হাজার অশ্ব শক্তির ২টি করে মূল ইঞ্জিন ছাড়াও টাগগুলোতে ১৩৬কিলোওয়াটের ২টি করে জেনারেটর ইঞ্জিনও সংযোজন করা হয়েছে।
বিএনএস হালদা ও বিএনএস পশুর নামের এসব সাবমেরিন টাগ ৮৫২টন পানি অপসারন করে একনাগারে দেড় হাজার নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২হাজার ২৭কিলোমিটার নৌপথে সাবমেরিন সহ ঐ ধরনের সমর নৌযান টেনে নিতে সক্ষম। নব নির্মিত এসব টাগে অত্যাধুনিক ভিএইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেম ছাড়াও নেভিগেশনাল রাডার, ডিজিপিএস রিসিভার ভিএইচএফ যন্ত্রও সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিটি টাগ পরিচালনার জন্য ১৭জন করে নৌসেনা ও নাবিক থাকছে।
এসব যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন টাগ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন খুলনা শিপইয়ার্ড-এর কারিগরি সক্ষমতা ছাড়াও এর দক্ষতাও বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবাহাল মহল।
১৯৫৭সালে স’াপিত খুলনা শিপইয়ার্ড স্বাধিনতার পরে অব্যাহত লোকশানী প্রতিষ্ঠান থেকে রূগ্ন শিল্পে পরিনত হয়। একপর্যায়ে তা বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও তা সম্ভব হয়নি নানা জটিলতার কারণে। পরবর্তিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৯৯৯ সালের ৩অক্টোবর প্রায় পৌনে ২শ কোটি টাকার দায়দেনা নিয়ে খুলনা শিপইয়ার্ড বাংলাদেশ নৌবাহনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এক সময়ের রূগ্ন ও লাগাতর লোকশানী প্রতিষ্ঠানটিকে। সব দায়দেনা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গত প্রায় ১৭বছরে ৪শতাধীক কোটি টাকা মুনফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। গত অর্থ বছরেও খুলনা শিপইয়ার্ড এযাবতকালের সর্বোচ্চ মুনফা অর্জনে সক্ষম হয়। নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রনাধীন এ প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছর ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সেরা করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবও স্বীকৃতি লাভ করছে ।
এব্যাপারে খুলনা শিপইয়ার্ড-এর ব্যবস’াপনা পরিচালক কমোডর অনিসুর রহমান মোল্লা (এল) এনইউপি, পিএসসি-বিএন জানান, এসব যুদ্ধ জাহাজ ও সাবমেরিন টাগ নির্মানের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে দেশে ফ্রিগেট-এর মত অত্যাধুনিক বড়মাপের সমর নৌযানের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বিশেষ মর্জাদা লাভ করবে বলেও জানান তিনি। খুলনা শিপইয়ার্ড-এর উন্নয়ন প্রসঙ্গে কমোডর আনিস বলেন, পায়রা সমুদ্র বন্দরের কাছে একটি ফরোয়ার্ড ইয়ার্ড নির্মানের লক্ষে খুলনা শিপইয়াডের্র জন্য জমি বরাদ্বের বিষয়টি চুড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে বিদেশেী বিনিয়োগে সমুদ্রগামী নৌযান সহ সব ধরনের সমর ও বানিজ্যিক নৌযান নির্মানের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান। খুলনা শিপইয়ার্ডকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে নৌ বাহিনী প্রধান সহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টার কথাও জানান তিনি।