আবার অশান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

 

মোঃ সিদ্দিকুর রহমান :

 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবার অশান্তি দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একের পর এক সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অস্থির করে তুলেছে। আর এই অশান্তি এখন স্বাস্থ্য থেকে গড়িয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জনপ্রশাসন সচিবের কাছে টেলিফোনে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। টেলিফোনে তিনি জনপ্রশাসন সচিবকে বলেছেন যে, স্বাস্থ্য সেবা সচিব অনেক মৌলিক নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তের ফাইল তাকে অবহিত না করেই অনুমোদন দিচ্ছেন, এটি রুলস অব বিজনেসের পরিপন্থি।

কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে, স্বাস্থ্য সেবা সচিব নন বরং স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই অ্যালোকেশন অব বিজনেস এবং বিভাজিত মন্ত্রণালয়ের যার যে দায়িত্ব তা লঙ্ঘন করছেন। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের কাজ তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগকে দিয়ে করিয়েছেন। এরকম অন্তত তিনটি ফাইলের তথ্য প্রাণের বাংলাদেশের কাছে এসেছে।

যেখানে দেখা যাচ্ছে, ওই ফাইলটি নিষ্পত্তির এখতিয়ার স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের। কিন্তু ফাইলটি মন্ত্রীর নির্দেশে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ নিষ্পত্তি করেছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজে গতি আনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুটি বিভাগে বিভক্ত করা হয়। একটি হলো স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ- যেখানে হাসপাতালের সেবা সং’ক্রান্ত বিষয়াদি জড়িত। অন্যদিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ- যেখানে পরিবার পরিকল্পনা এবং মেডিকেল কলেজসহ স্বাস্থ্য শিক্ষার বিষয় জড়িত। দুই বিভাগে দুইজন সচিব আছেন।

এদের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান আর স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলী নূর। অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, নতুন সচিব মো. আবদুল মান্নান দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজে গতি আনতে চাইলেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সে গতি রোধ করতে থাকেন। যেকোন ফাইল তিন থেকে চারদিন পর্যন্ত আটকে রেখে কাজের গতি কমিয়ে দেওয়ার এক কৌশল গ্রহণ করেন তিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গতি আনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও উদ্যোগী হয়েছে গত কয়েকমাস ধরে।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একের পর এক অযোগ্যতা, ব্যর্থতা, দুর্নীতির প্রেক্ষিতে বিভিন্ন কর্মপন্থার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পরামর্শগুলো দেওয়া হচ্ছে সচিবকে এবং সচিবকে দ্রুত তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাঁধা সাজছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সব ফাইল দিতে হবে বলেও তিনি অতিরিক্ত সচিবদের ডেকে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী এবং সচিবের এলোকেশন অব বিজনেস রয়েছে। এই বিজনেসে তাঁদের কর্মপন্থা, কার্যপরিধি এবং ক্ষমতার নির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে।

এই এলোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী নীতিনির্ধারনী বিষয়সহ কি কি বিষয়ের ফাইল মন্ত্রীকে দিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে তার বিষদ বর্ণনা রয়েছে। জানা গেছে যে, অতীতে ছোটখাটো বিভিন্ন বিষয়, এমনকি একজন পিয়ন বদলির বিষয়ের ফাইলও মন্ত্রীর কাছে যেত এবং মন্ত্রী এটা চাইতেন। কিন্তু বর্তমান সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এলোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী যেটুকু তাঁর নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা রয়েছে সেটুকু তিনি নিষ্পত্তি করে দেন এবং যে ফাইল মন্ত্রীর কাছে পাঠানো দরকার সেই ফাইল মন্ত্রীর কাছে পাঠান। এর ফলে কাজে গতি এসেছিল।

কিন্তু এটাতে জাহিদ মালেক অসন্তুষ্ট বলে জানা গেছে আর এই কারণে তিনি জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। জনপ্রশাসন সচিব বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য সেবা সচিবের সঙ্গেও কথা বলেছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এইরকম অস্থির অবস্থার মধ্যেই স্বাস্থ্য সেবা সচিবের একটি ফাইল যেটা স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়, সেটাকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগকে পাশ কাটিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগকে দিয়ে মন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন।

সেই ফাইলটি কেন, কিভাবে অনুমোদন দেওয়া হলো সেই সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন জনপ্রশাসন সচিব। এর ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠেছে। একাধিক বিশ্লেষক বলেছেন যে, শুরু থেকেই জাহিদ মালেক এই মন্ত্রণালয়ে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করছেন। পুরো মন্ত্রণালয়কে তাঁর একটি পকেটতস্থ প্রতিষ্ঠান বানানোর চেষ্টা করছিলেন এবং সেই কারণেই এত সমস্যা সবসময় হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সকলেই মনে করেন যে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যতদিন এই পদে বহাল থাকবেন ততদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোন কাজের যেমন সমন্বয় হবেনা, তেমনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সুস্থ এবং স্বাভাবিক ইমেজ নিয়ে জনগণের আস্থাশীল একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবেও দাঁড়াতে পারবে না।