Amar Praner Bangladesh

ইটভাটার বাতাসে পুড়ছে ধান, কাঁদছেন কৃষক

 

 

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

 

উর্বর ভূমির জেলা লালমনিরহাটে তিন-চার ফসলি জমি রয়েছে। চরাঞ্চলে বালুর মধ্যেই ফলছে হরেক ফসল। প্রতি বিঘায় ভুট্টার গড় উৎপাদন ৫৫ মণের বেশি, ধান প্রায় ত্রিশ মণ।

প্রতি বছরই হঠাৎ বান-খরা কিংবা কীট-বালাই মোকাবেলা করে এসব ফসল ঘরে তুলছিলেন কৃষক। নতুন করে কৃষকের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে ইটভাটার গরম বাতাস। ইটভাটার উত্তাপ বয়ে প্রবহমাণ হাওয়ায় পুড়িয়ে ফেলছে হাজার হাজার বিঘার ফসল। পুড়ে যাচ্ছে ধান, মরে যাচ্ছে ঘাস, সুপারির গাছের ডগা পর্যন্ত খসে পড়ছে।এসবের জন্য দায়ী ইট ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়াযুক্ত গরম বাতাস। পরিবেশবাদীরা এটাই বলছেন। অভিযোগ কৃষকদেরও।

সরেজমিনে দেখা যায়, লালমনিরহাটে অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ কৃষি জমির উপর আর ঘনবসতি পূর্ণ এলাকাতে। ইটভাটার কারণে এই ফসলহানি ঘটনায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটছে। উপায়ন্তর না পেয়ে কৃষকরা দুটি ইটভাটার বেচাবিক্রিও বন্ধ করে দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে জরিপ ও ক্ষতি নিরুপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে, সবই হচ্ছে ধীরগতিতে। কিন্তু স্থানীয় সুধী সমাজ দ্রুত এই পরিস্থিতির সমাধান চাইছেন।

সুধী সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, পরিশ্রমের ফসল নষ্ট হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা হতাশ। কোনো কৃষক বর্গা চাষ করেন, কেউ লিজ নিয়ে চাষ করেন। এমন অবস্থায় ধান-ভুট্টা নষ্ট হলে, এক বছর ওই সব কৃষকদের অভুক্তই থাকতে হবে। পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

কৃষকরা বলছেন, তাদের ক্ষেতের ধান-ভুট্টা আর মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ঘরে তুলবেন। কিন্তু ইটভাটার কারণে সব চিটা হয়ে আছে। এতে ষোল আনার এক আনা ফসলও তাদের ঘরে উঠবে না।

দুর্গাপুরের কৃষক আলী হোসেন বলেন, ইটভাটার গ্যাস এক সাথে ছেড়ে দিয়েছে। গরম বাতাসে ধান শেষ। সবজি শেষ। সুপারি গাছের আগাল (ডগা) ভেঙে ভেঙে পড়তেছে।

একই এলাকার কৃষক আবুল কালাম বলেন, দুই দোলার (বিল) প্রায় দেড় হাজার একরের ধান নষ্ট হয়েছে। আবু কালাম, শহিদুল, একরামুল, জাহেদুলরা বন্ধকি জমি চাষ করেছেন। তাদের জমিগুলো দুই উপজেলায় পড়েছে। সদর উপজেলা, আদিতমারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে নালিশ করেছেন। ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেখে গেছেন। এখনও কোনো তদন্ত হয়নি,পাননি কোনো সহায়তাও।

ওই এলাকার শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি কৃষক- আমার সংসার চলে ফসল বেচে। ইটভাটায় ৭ দিনে যে গ্যাস বের হওয়ার কথা, সেটা বের হচ্ছে একদিনেই। এ কারণে জমির ধান ও ভুট্টা পুড়ে গেছে।

হাতিবান্ধা উপজেলার মতিয়ার রহমান বলেন,আমার ২০ বিঘা জমির ধান পুড়ে গেছে। কারো ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমির ধান নষ্ট হয়েছে। আমাদের প্রায় ২ হাজার বিঘার ধান নষ্ট হয়েছে।

নথি সূত্র বলছে, লালমনিরহাট জেলায় ২৩টি ইটভাটা রয়েছে। একটিকে অবৈধ দেখানো হয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলায় ২টি ইট ভাটা, দুটোই বৈধ। হাতিবান্ধার ৪টি ইট ভাটার তিনটিকে বৈধ দেখানো হয়েছে। একটির কোনো তথ্য নেই।কালিগঞ্জের ৬টি ইট ভাটার ৪টি জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, ২টিকে দেখানো হয়েছে কৃষি জমির উপর। আদিতমারী উপজেলায় ৬টি ভাটার তিনটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, কৃষি জমির উপর একটি,তথ্য নেই বাকি দুটি ইটভাটার। সদর উপজেলার ৫টি ইটভাটার।তিনটি কৃষি জমির উপর, একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, তথ্য নেই একটি ইটভাটার।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক রাইহান হোসেন বলেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। এটা আমাদের রুটিন কাজ। তবুও কোনো ইটভাটা সমস্যা তৈরি করলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিবো।ইমেইল, ডাক, ফোন, স্বশরীরে যেভাবে যে কেউ অভিযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নিবো।

তিনি বলেন, এত সব ক্ষতির কারণ আপাতত ৪টি ইট ভাটা। আদিতমারীর ওয়ান স্টার ব্রিকস, লালমনিরহাটের টু স্টার ব্রিকস, হাতিবান্ধার এ এমবি ব্রিকস ও দুর্গাপুরের একটি।

টু স্টার ব্রিকস এর ব্যাবস্থাপক মমিন বলেন,আমরা আমাদের স্বাধ্যমত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে দিবো। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সাথে আমরা জরিপ করে ক্ষতিপুরণ দিবো।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলীনূর বলেন,আমরা বিষয়টা শুনেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রনোদনার ব্যবস্থা করবো। আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করা হবে। আমাদের প্রতিবেদনে স্যাররা ব্যবস্থা নিবেন।আমাদের দপ্তর আন্তরিকতার সাথে বিষয়টা দেখবে।

হাতিবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজির হোসেন বলেন, আমরা আপনাদের স্থানীয় কলিগদের কাছে শুনেছি।কৃষি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ইটভাটার গরম বাতাসে ফসলের ক্ষতির বিষয়টি উপজেলাগুলোকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তারা তদন্ত প্রতিবেদন দিলেই ইটভাটার মালিকদের থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এটা আমরাই করে দিবো। পরিবেশ অধিদপ্তরকেও বলা হয়েছে। কৃষি বিভাগ যদি প্রনোদনা দেয়, সেটা ভালো। তারা তা করতে পারে। আমরা আমাদের মত করে কৃষকদের ক্ষতির বিষয়টা বিবেচনা করবো।