এক নজরে সাহারা খাতুনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

 

ইমরান হোসাইনঃ

 

চলে গেলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঢাকা-১৮ আসেনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ।জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন ঢাকা-১৮ আসনের এই এমপি (ইন্নাল্লিাহি——রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।

১৯৪৩ সালের ১ মার্চ ঢাকার কুর্মিটোলায় জন্মগ্রহণ করেন সাহারা খাতুন। তার বাবার নাম আব্দুল আজিজ ও মার নাম টুরজান নেসা।

শিক্ষাজীবনে তিনি বিএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

তৃণমূল থেকে লড়াই করে রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসা সাহারা খাতুনের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে গত কয়েক মেয়াদ ধরেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। এর আগে দলের বিভিন্ন পদে ছিলেন। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি।  আন্তর্জাতিক মহিলা আইনজীবী সমিতি ও আন্তর্জাতিক মহিলা জোটের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জাতীয় নেতা মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা গঠন করে দিয়েছিলেন। তখন থেকেই মিছিল মিটিং সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করেছেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দিনও তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শেখ হাসিনা তখনকার ছাত্রলীগ নেত্রীর সাথে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি প্রথমে নগর আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে মহিলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক, পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদিকা এবং একই সাথে নগর আওযামী লীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-আইন সম্পাদিকা, পরে তিনি আইন সম্পাদিকা নির্বাচিত হন, তখন তিনি নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদ এবং মহিলা আওযামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ আর গ্রহণ করেননি। অতঃপর তিনি পরবর্তী কাউন্সিলে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। এখনও তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে আছেন।

ঢাকা-১৮ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সাহারা খাতুন তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে স্বরাষ্ট্র এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশের প্রথম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির বিডিআর বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজপথের রাজনীতিতে সব সময়েই সরব ছিলেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, আইয়ুব-ইয়াহিয়া বিরোধী আন্দোলন, দেশ স্বাধীনের আন্দোলন, ৭৫’র পর অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন করেছেন রাজপথে। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হরতাল, সভা-সমাবেশ করতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার এবং নির্যাতিত হয়েছেন।

আইনপেশায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বহ সংখ্যক নেতাকর্মীর মামলা বিনাপয়সায় লড়েছেন এবং তাদের জেল থেকে মুক্ত করেছেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে আওয়ামী লীগের যে কয়েকজন নেতা দলীয় সভানেত্রীর প্রতি আনুগত্য ধরে রেখে ছিলেন সক্রিয়, তাদেরই একজন সাহারা। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকলেও শেখ হাসিনার পক্ষে তখন আইনজীবী হিসেবে দাঁড়িয়েই ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। বিনা পারিশ্রমিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নামে করা মামলা পরিচালনায় ভূমিকা রেখেও দলের নেতা-কর্মীদের কাছাকাছি ছিলেন সাহারা।

রাজনৈতিক জীবনে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন। এর মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। সেনাসমর্থিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও সাহারা খাতুন রাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।

জ্বর, অ্যালার্জিসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে অসুস্থ অবস্থায় গত ২ জুন সাহারা খাতুন ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে আইসিইউতেও ছিলেন কিছুদিন।

অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে কয়েকদিন পর তাকে আইসিইউ থেকে ফিরিয়ে আনা হলেও অবনতি ঘটলে আবার নিতে হয়। এর মধ্যেই পরিবারের সদস্যরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে চাইছিল, যদিও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তাতে দেরি হয়। সবশেষে গত সোমবার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে থাইল্যান্ড নেওয়া হয়। বিকাল চারটার দিকে তাকে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মারা যান সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।