Amar Praner Bangladesh

করোনাকালীন আত্মকথন

 

 

ইন্দু বিভা :

 

“জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ” সবকিছু সামলে “হারমোনিয়ামে” বসি।কারণ সুর কন্ঠে তুললে অসুর পালায়।লেখালেখিটা”ও আমার ধ্যান জ্ঞান। এ ছাড়া কোয়ারান্টাইন কালে এগুলো সেরা পথ্য।

কারণ-
বলতে দ্বিধা নেই “সময় গেলে সাধন হবে না” এই নীতিতে ছোট বেলা থেকেই অভ্যস্থ আমি।
স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে কমনরুম আড্ডা বলতে আমার জীবনে তেমন কিচ্ছুটি নেই।
তাই সময় সুযোগ পেলেই ঘর গেরস্থালির আজাইরা কথা না বলে আমি লেখালেখিতেই হর হামেশা ব্যস্ত থেকেছি।
এজন্য অনেক বিড়ম্বনারও শিকার হয়েছি।তারপরও থেমে থাকেনি স্নায়ুকোষ। সব সময় ওরা তাড়িয়ে বেড়ায় এটা লিখতে,ওটা লিখতে।কি একটা ভয়ানক ব্যাধি!শব্দগুলো যেন শাসিয়ে বেড়ায়! আমার মনোজগতে ওদের নিরাপদ স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ।অগত্যা কি আর করা?

কারণ এসব লেখার ভিড় আমার স্নায়ুতন্ত্রকে ভীষণ জ্বালায়।
যারা বিরক্তি বোধ করেন তারা তো বোঝেন না—-
একবার যদি সেই লেখা বা বিষয় আমাকে ছেড়ে যায় অর্থাৎ দৈবাৎ আমার মনন থেকে ছুটে যায় তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনতে কতো কাঠ খড় পোড়াতে হয় বা কতো সময়ের অপচয় হয়,—তা বোঝানো কঠিন।
মাঝে মাঝে মনে হয় “আটচল্লিশ ঘন্টায়” কেন একদিন নয়?
আর “মেয়েরা কেন দশভূজা” নয়!

এ লেখাটিও আমি দ্বিতীয়বার লিখছি।প্রথমবারের লেখাটা সিনিয়র এক বোনের কল সামলাতে গিয়ে উধাও হয়ে গেলো।
অগত্যা আপোষ মানতে বাধ্য হই সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক কলেবরে।

খুব ভালো করেই জানি করোনাকালে কেউই ভালো নেই। দম আটকানো অবকাশে প্রায় সবারই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা । এমন অবস্থা থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়ার আশায় কতো কতো সংযোজন।

অনলাইন” অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, অনুষ্ঠানে দর্শক হয়ে সুন্দর সময় উপভোগ ও ভাবের আদান প্রদান,খাবারের (রোজার মাসের জিলাপির সুন্দর সুন্দর ছবি) রেসিপি ,বাগান,এমনকি নিজে সাজুগুজু করে সেই ছবি পোস্ট দেওয়া।

ভরা পূর্ণিমা, সবুজ ধানক্ষেত, নীলাভ পাহাড়, করোনা কালীন পথ মানুষের অসহায় জীবনচিত্র ইত্যাদিও অসাধারণ সংযোজন।

আবার সম্মানিত কেউ কেউ খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়ে পুষ্টিগুন সম্পর্কে আমাদের আলোকিত করছেন।(হুসাইন কবির ভাই)

এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু বান্ধব,কবি পাড়ার লেখক সাহিত্যিক, পরিবারের লোকজন ও আত্মীয় স্বজনদের ভালবাসা ও না দেখে থাকার স্নেহকাতরতা ও তো কোন অংশে অবহেলা করার মতো নয়।
কখনও কখনও ইনবক্সে কুশল জানাতে ও করোনা মোকাবেলায় সাবধানী হতে পরামর্শ নিয়ে হাজির হন খুব নরম মনের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ।

আবার কেউ কেউ নতুন নতুন গ্রুপ খুলে আড্ডা জমাচ্ছেন ঘন্টার পর ঘন্টা।কেউ কেউ পেইজ খুলছেন নিজের নাম দিয়ে ফুল,পাখি,কবিতা সহ বিভিন্ন বিষয় সম্বলিত।কেউ কেউ চমৎকার সব কবিতা আবৃত্তি, গানের লাইভ প্রোগ্রাম উপস্থাপন করেছেন আমাদের মন ভালো রাখার জন্য।

কবিমহলে উৎসব চলছে আশংকা মুক্ত থাকার চেষ্টায়।পাঁচদিনে পাঁচটি কবিতা লেখার ফরমায়েশ। পুরো বাংলাদেশ জুড়ে এ সৃজনশীলতার কারিশমা কখনও কখনও ভাবায় এমন উৎসব এখন কেন!

ষাড়ঋতু বিবেচনায় ঋতুবৈচিত্রকে মাথায় রেখেও এ উৎসব হর হামেশা চলতে পারে।কিন্তু করোনা”মহামারীতে যাদের স্বজন প্রিয়জন হারাতে হলো তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা না জানিয়ে এমন উৎসব কেমন জানি ভীষন স্বার্থপরতা বলে মনে হচ্ছে।আবার ভাবছি থাক, যে যার মতো এ ঘোর অমানিশাকে কাটিয়ে উঠুক।হয়তো মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করবার এটাও একটা উপায়।

সবকিছু মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত আমরা একটা নিরাপদ পারিপার্শ্বিককেই সাথে নিয়ে এমন ভয়াবহ দুঃসময় টাকে উৎরে যেতে চাই।
সময় স্বল্পতায় আর নিজস্ব কিছু সৃজনশীল কাজের আসক্তির কারণে শত ইচ্ছা থাকার পরও ভালো ভালো কিছু আড্ডা,কিছু লাইভ অনুষ্ঠান ও কিছু আকর্ষণীয় পেইজে যাওয়া হয়ে ওঠেনা।

আপনি বা আপনারা আমায় পছন্দ করেন, ভালবাসেন, সঙ্গে রাখতে চান এটা আমার জন্য বিশাল পাওয়া।

সবার কাছে বিনম্র বিনয় ও কৃতজ্ঞতা।
আমার অপারগতাকে ঔদ্ধত্য বা অবহেলা ভেবে আমার প্রতি অবিচার করবেন না।
চলুক না এভাবেই কয়েকটা মাস বেঁচে থাকার সুতীব্র বাসনায় গৃহবন্দী সুন্দর মানুষের মান সম্মত সকল কার্যক্রম। চুরি,ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট,ঘুষ দুর্নীতি তো কেউ করছিনা।
একদিন আমরা ঠিকই সুন্দরের সান্নিধ্যে পৌঁছাবো- আসুন সবাই মিলে সুস্থ মন, করোনাহীন পরিবেশে, বিপদমুক্ত থাকার সচেতনতা নিয়ে, গৃহবন্দী দুঃসময়টা উৎরে যাই।