Amar Praner Bangladesh

গাজীপুরে পথে পথে চাঁদাবাজির অভিযোগ

 

 

মকবুল হোসেন :

 

ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক, লেগুনা, পিকআপ ভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে গাজীপুর মহানগর ও জেলার অনেকস্থানে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। চালকরা নির্ধারিত হারে চাঁদা দিতে না চাইলে, যানবাহন থামিয়ে, মারধর করে, কেড়ে নেয়া হয় যানবাহনের চাবি। খুলে নেয়া হয় রিকশার সিট কিংবা ব্যাটারি। এছাড়া আটকে রাখা হয় যানবাহন। চালক ও হেলপারদের বকাঝকা ও মারধর করা হয়। ভয় দেখানো হয়।

সিটি করপোরেশন ও মালিক সমিতির নাম দিয়ে ওই চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। অনেকস্থানে চাঁদা আদায়ের কারণে সড়কে লেগে যায় যানজট। ওইসব চাঁদা তোলার জন্য শিফট অনুয়ায়ী দুই-তিনজন করে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে জড়িত রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র।

যাদের পকেটে যাচ্ছে প্রতিদিনের তোলা লাখ লাখ টাকা। নগরের কোথাও যানবাহন স্ট্যান্ড ইজারা দেয়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেই। এসব চাঁদার কারণে পণ্য ও যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। আর এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। তা বন্ধ করতে প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা আশা করছেন সবাই। যানবাহন চালকদের অভিযোগ, নগরের টঙ্গী-ঘোড়াশাল-সিলেট আঞ্চলিক সড়কের পূবাইল বাসস্ট্যান্ডে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে রশিদ দিয়ে। চাঁদা আদায়কারীদের সামনেই একজন চালক জানান, চাঁদা না দিলে গ্লাস ভেঙে দেয়া হয়। গাড়ি আটকে নানাভাবে অপদস্ত করা হয়, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় চালক ও হেলপারদের। শুধু এখানেই নয়, পথে পথে বিভিন্ন অংকের টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

টঙ্গী থেকে চাঁদা দিয়ে রওনা দিয়ে পূবাইলে, আবার পূবাইল থেকে কালীগঞ্জ- ঘোড়াশালে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিয়ে গাড়ি চালানো কারো ক্ষমতা নেই। স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতেও দিতে হচ্ছে মাসোহারা। চাঁদা না দিয়ে কোনোভাবেই সড়কে যানবাহন চালোনো সম্ভব নয়। পূবাইলে চাঁদা তোলার রশিদে নাম লেখা নিপু নামের একজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি জানান, ইজারা নিয়ে বৈধভাবেই তারা টাকা তুলছেন।

এ ব্যাপারে আরো কিছু জানার থাকলে ইজারা নেয়ার সময়কালীন ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণের কাছে বিস্তারিত জেনে নেয়ার কথা বলেন তিনি। এভাবেই একটি পয়েন্টে চাঁদা দিয়ে, চাঁদা তোলার অন্য পয়েন্টে গেলে সেখানে চাঁদা দিতে হচ্ছে। আবার সেখান থেকে অন্য পয়েন্টে গেলে সেখানেও নির্ধারিত চাঁদা দিতে হচ্ছে। একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক জানান, জয়দেবপুর রেলগেইটে সিটির নামে ১০ টাকা ও সমিতির নামে ১০ টাকা চাঁদা দেয়ার পর চান্দনা চৌরাস্তায় গেলে আবারো ১০ টাকা, এরপর ভোগড়া বাইপাস মোড়ে গেলে ২০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

তারা সমিতির সদস্য নন, কিংবা এই চাঁদা দিয়ে তাদের কোন উপকারেও আসে না। তবু পেটের তাগিদে সড়কে বের হলে পথে পথে নির্ধারিত চাঁদা দিতেই হয়। নইলে চাঁদা আদায়কারীদের সঙ্গে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের ঝগড়া, হাতাহাতি বা মারামারি, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রিকশার গদি খুলে নেয়, ব্যাটারি খুলে নেয়। ভোগান্তির শেষ হয় না। আদায়কারীরা বলছে, তারা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ইজারাদারদের বা মালিক সমিতির নেতাদের নিয়োগকৃত শ্রমিক হিসেবেই এ টাকা তুলছে। আর তা তুলে এলাকাভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজনের হাতে তুলে দিচ্ছে। আর আদায়কারীরা দৈনিক পারিশ্রমিক নিচ্ছে। শুধু পূবাইলেই নয়, নগর ভবনের সামনের রাজবাড়ী সড়ক, স্টেশন রোড, চান্দনা চৌরাস্তা, শিমুলতলী, ভোগড়া বাইপাস, মীরের বাজার, কোনবাড়ী, জিরানী বাজারসহ নগরের অনেক স্থানে, এমনকি নগরের বাইরে জেলার কালীগঞ্জ, ঘোড়াশালসহ অনেক স্থানে রশিদ দিয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রতিদিন। চাঁদা তোলা হয় চালকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন আর অটোরিকশা মালিক সমিতির নামে রসিদ দিয়েই উঠানো হচ্ছে এসব চাঁদা। অবশ্য অটোরিকশা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির গাজীপুরের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলছেন, সিটিতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা হাইকোর্টে অবৈধ ঘোষণা হওয়ার পর গত কয়েকমাস ধরেই তারা সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। তাই তাদের লোকজন বর্তমানে চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িত এমন দাবি অবান্তর। হয়ত এলাকার অর্থলোভি প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রছায়ায় কেউ কেউ তাদের নাম ভাঙিয়ে টাকা তুলে হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব দেখার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সহ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান মৃধা বলছেন, তারা ১৪২১ বাংলা সনে সিটি করপোরেশন এলাকার ১১টি স্ট্যান্ড ইজারা দিয়েছিলেন। টোল আদায় না করার বিষয়ে হাইকের্টের একটি নির্দেশের পর প্রায় তিনমাস আগে সবগুলো স্ট্যান্ডের ইজারাদারকে টোল আদায় না করতে সিটির পক্ষ থেকে লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনার পরও টোল তোলার অভিযোগ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান বলেছেন, সরকারি নিয়ম-নীতি ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রতি সিটি করপোরেশন সব সময়ই শ্রদ্ধাশীল। বর্তমানে সিটি করপোরেশেন ইজারার নামে টোল বা কোনো টাকা কেউ যাতে উঠাতে না পারে, সেজন্যে স্থানীয় প্রশাসনে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে এবং তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এটা বন্ধ করতে নানা পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। এরপরও কোথাও কেউ তুললে তার দায় সিটি করপোরেশনের নয়।