Amar Praner Bangladesh

গাজীপুর টঙ্গী যেন ধর্ষণের অভয়ারণ্য

 

 

আওলাদ হোসেন :

 

গাজীপুর মহানগরীতে ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা বেড়েই চলছে। গত বছর জুলাই থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মহানগরীর আটটি থানায় এ দুটি অপরাধের মামলার হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। উল্লিখিত সময়ে নগরীর থানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বাসন থানায় আর অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটেছে সদর থানায়।

টঙ্গী পূর্ব থানা এবং পশ্চিম থানায় রয়েছে বিভিন্ন ধর্ষণের নজিরবিহীন ঘটনা। তবে এ দুটি অপরাধে যত মামলা নথিভুক্ত হয়েছে প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় অভিযোগ করতে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানি করে পুলিশ। ফলে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার পুলিশি হয়রানি ও সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে থানায় মামলা করতে না গিয়ে ঘটনা চেপে যান।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে গত এক বছরে ১৩৩টি ধর্ষণ ও ৪৫টি অপহরণের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি ২০টি মামলা হয়েছে বাসন থানায়। এছাড়া সদর থানায় ১৯, কোনাবাড়ী থানায় ৭, কাশিমপুর থানায় ৪, টঙ্গী পশ্চিম থানায় ১২, টঙ্গী পূর্ব থানায় ৫ ও গাছা থানায় ১৬টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অন্যদিকে অপহরণের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি সাতটি মামলা হয়েছে সদর থানায়। এছাড়া বাসন থানায় চার, টঙ্গী পশ্চিম থানায় এক, টঙ্গী পূর্ব থানায় চার ও গাছা থানায় একটি মামলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর বাসন থানা এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বেড়েছে ধর্ষণ ও মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের মতো ভয়ংকর অপরাধ।

অভিযোগ রয়েছে এসব ঘটনায় অভিযোগ করতে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানি করে পুলিশ। অনেকে পুলিশের হয়রানির ভয়ে থানায় মামলা করতেও যান না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে বাসন থানার কাছাকাছি এলাকায় বাসে হাত-পা বেঁধে এক নারীকে ধর্ষণ করে ওই বাসের চালক, সুপারভাইজার, হেলপারসহ চারজন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২ ইং গাছা থানায় ১৩ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করছে স্কুলের শিক্ষক। অসহায় পরিবার ভ্যান চালক তার মেয়ের বিচার চেয়ে বিভিন্ন দৌঁড়াদৌঁড়ির পাশপাশি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিয়েও পাচ্ছেনা বিচার।

নগরীর বাসন থানার রওশন সড়ক এলাকায় একটি এনজিও অফিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে এনজিওর মালিক ইমরান হোসেন ওরফে আনোয়ার (৪৫) এক নারীকে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় নির্যাতিতা নারী মামলা করতে গেলে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রেখে টালবাহানা করে পুলিশ। পরদিন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশ হলে তড়িঘড়ি মামলা নেয়। কিন্তু মামলা তুলে নিতে প্রভাবশালীরা চাপ দিতে থাকে। নির্যাতিতা থানায় জিডি করতে গেলেও গ্রহণ করা হয়নি। একপর্যায়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও ধর্ষকের হয়ে নারীকে মামলা তুলে মীমাংসার প্রস্তাব দেন।

ঢাকার শেওড়াপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম (৩০) গত ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ৩টার দিকে মিরপুর থেকে বাসে এসে গাজীপুর ভোগড়া বাইপাস মোড়ে নামার পর একদল অপহরণকারী তাকে মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে ওই ব্যবসায়ীর মোবাইল থেকে ফোন করে পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ব্যবসায়ীর ভাই বাসন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে গ্রহণ করে। পুলিশ ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টা চালায়নি। বাধ্য হয়ে অপহৃতের ভাই ঘটনাটি র‌্যাবকে জানায়। র‌্যাব-১ ওইদিন রাতে আলম সরকারি কলেজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে শফিকুল ইসলামকে উদ্ধার ও চার অপহরণকারীকে আটক করে। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদের (৩৯) বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। গত বছর ২৩ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে তার পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

এ ঘটনায় পরিবারের লোকজন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ অভিযোগটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করে। টাকা না পেলে তারা অপহৃতকে হত্যার হুমকি দিলে ওই কর্মকর্তার স্ত্রী অপহরণকারীদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে ২৫ হাজার টাকা দেন এবং র‌্যাব-১-কে জানান। র‌্যাব পরদিন অপহৃতকে উদ্ধার এবং পাঁচ অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে। ধর্ষণ ও অপরাধের মতো অপরাধ বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বাসন থানার ওসি কাওসার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহানগরীর শ্রমিক অধ্যুষিত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বাসন। এখানে ধর্ষণ, ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনায় পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছি। এসব ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে এলাকাবাসীর ভাষ্য, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো ঘটনা পুলিশকে জানালে তারা প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে চান না।

তারা নানা অজুহাতে মামলা নিতে টালবাহানা করতে থাকে। এ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ক্রাইম) মোহাম্মদ শরিফুর রহমান প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশ বিশেষ নজরদারি করছে। ইতিমধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। কয়েকদিন পরপর গাজীপুর টঙ্গীতে ধর্ষণের সংবাদ শোনা যায়। সম্প্রতি টঙ্গী আবাসিক হোটেলে চাকরির কথা বলে এক তরুণীকে ধর্ষণ করেছে মিথ্যা চেয়ারম্যান পরিচয়দানকারী লম্পট।