Amar Praner Bangladesh

গৌরব আর ঐতিহ্যের ৭৫ বছর, চট্টগ্রাম পি এইচ আমীন একাডেমীর ঐতিহাসিক মিলনমেলা

আব্দুল্লাহ আল-মামুনঃ
(পি এইচ আমীন একাডেমীর প্রাক্তন ছাত্র)

ছোটবেলা থেকেই বাবু শ্রী যোগেন্দ্র লাল দাশের ছিল লেখাপড়ার প্রতি গভীর প্রেম, জ্ঞান অর্জন, কোন কিছু জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। দেশের প্রতি ছিল তার ভালবাসা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন প্রাণের প্রিয় চট্টগ্রামে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে একটি শক্তিশালী শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলবেন।
তাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ বি এল ডিগ্রি নিয়ে ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামে নিজ বাসভূমী হালিশহরের দক্ষিণ কাট্টলী ফিরলেন বাবু শ্রী যোগেন্দ্র লাল দাশ। তিনি লক্ষ করলেন তাঁর এলাকার আশেপাশে একটি বিশাল এলাকায় কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও নেই কোনো উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল।
বাবা তৎকালীন জমিদার প্রাণহরি দাশের কাছে আবেদন করলেন এলাকায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। বড় ছেলের ইচ্ছাকে সমর্থন করে দক্ষিণ কাট্টলী ফইল্যাতলী বাজার সংলগ্ন এলাকায় ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রাণহরি একাডেমী। ১ জানুয়ারি মাত্র ৯ শিক্ষার্থী আর তিনজন শিক্ষক নিয়ে মাটির ঘরে শুরু হয় স্কুলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। এই স্কুলকে কেন্দ্র করেই বর্তমানের ১১, ১২, ২৫ এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের বিশাল এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেই স্কুলটি আজ ৭৫ বছরে পা দিয়েছে।
১৯৬০ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ১০ ফুট জলোচ্ছ্বাসে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী স্কুলের মাটির ঘর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সে সময় স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার প্রাণহরি দাশের নাতি আদিত্য নারায়ণ দাশ এবং অ্যাডভোকেট মনির আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. ফজলুল আমীনের (সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এবং বর্তমান সংসদ সদস্য ডা. আফসারুল আমীনের বাবা) শরণাপন্ন হন। সবার অনুরোধে স্কুলটিকে আবার নতুন করে গড়ার কাজে হাত দেন তিনি। নিজের এবং অন্যান্যদের সহযোগিতা নিয়ে চারতলা ভবন করে স্কুলটিকে পুনর্জন্ম দেন।
যতদিন বেঁচেছিলেন নিজের মেধা, শ্রম আর অর্থ দিয়ে স্কুলের কল্যাণেই কাজ করে গেছেন। তাঁর সেই অবদানকে স্মরণ রাখতে এলাকার মানুষের প্রস্তাবে ১৯৬৯ সালে স্কুলের নতুন নামকরণ করা হয় পি এইচ আমীন একাডেমী যার পুরো অর্থ প্রাণহরি আমীন একাডেমী। ৯ জন দিয়ে যাত্রা শুরু স্কুলটিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ হাজার ৯৮৪ জন। যদিও ২০০৫, ২০০৬ সালের দিকে এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিল সাড়ে ৪ হাজারের মতো। কিন্তু সরকারি নিয়মনীতির কারণে তা কমিয়ে দুই হাজারের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে।
স্কুলটিরই ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্যে আজ ২৩ ও আগামী ২৪ ডিসেম্বর। সেখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বিশেষ অতিথি থাকবেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার প্রমুখ।
দ্বিতীয় দিন সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ডা. প্রাণগোপাল। বিশেষ অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এবং বিজিএমই এর ১ম সহ-সভাপতি মাঈনুদ্দিন আহমেদ মিন্টু। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এবং বর্তমান সংসদ সদস্য ও ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের প্রধান উপদেষ্টা ডা. আফসারুল আমীন। অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পর্কে ৭৫ বছর পূর্তি কমিটির আহ্বায়ক এস এম জাহিদ চৌধুরী দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন আমরা গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকে স্কুলের প্লাটিনাম জুবিলি অনুষ্ঠান বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছি। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য দুই হাজার ৮৯০ জন সাবেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন। সাথে প্রাক্তন শিক্ষার্থী স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান থাকবে আরও ৭ শতাধিক। সবমিলিয়ে বিশাল একটি কর্মযজ্ঞের অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করছি আমরা। প্রথম দিন দুপুরেই সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মিলিয়ে ৫ হাজার ৭০০ এবং দ্বিতীয় দিন সাড়ে ৪ হাজার অতিথির খাবারের আয়োজন থাকবে। এছাড়া দুদিনই বিকেলে সাড়ে ৪ হাজার করে প্যাকেট নাস্তা বিতরণ করা হবে নিবন্ধিত অতিথিদের মাঝে।
জাহিদ চৌধুরী বলেন, এই অনুষ্ঠান আয়োজন করতে গিয়ে অনেক পুরনো ইতিহাস জানতে পেরেছি। স্কুলে মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য অবস্থান করছে এই অজুহাতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে স্থানীয় বিহারিরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় স্কুলে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। স্কুলের যাবতীয় ডকুমেন্ট জ্বালিয়ে দেয়। যে কারণে পুরনো তথ্য-উপাত্ত লিপিবদ্ধ নেই। কিন্তু অনুষ্ঠানের কাজ নিয়ে ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে জানলাম স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, বাবু বাবু শ্রী যোগেন্দ্র লাল দাশের অবদান। এই স্কুলেই যে একজন ভাষা সৈনিক ছিলেন তাও ইতিহাস হাতড়ে জানতে পারলাম। স্কুলের ১৯৫৪ ব্যাচের বাবু সমীরণ চৌধুরী নবম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
কোটি টাকা বাজেটের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্য ছাড়া থাকবে সাবেক শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও ১ম দিন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ এবং মিলা। আর দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে আরেক জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস ছাড়াও থাকবে দেশসেরা ব্যান্ডতারকা জেমস। কমিটির সদস্য সচিব এরশাদুল আমীন বলেন, এই স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীরা বর্তমানে সরকারি এবং সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছে, এই স্কুলের ছাত্রই আব্দুল্লাহ আল-মামুন দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশের প্রকাশক ও সম্পাদক। এছাড়া দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এ স্কুলের কৃতী শিক্ষার্থীরা। অত্র এলাকার প্রথম এই হাই স্কুলটি পুরো এলাকার শিক্ষা বিস্তারে আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেছে। স্কুলের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রামে জড়ো হতে শুরু করেছেন। ব্যাচ ভিত্তিক গ্রুপগুলো তাদের নিজস্ব আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। র‌্যালি এবং অনুষ্ঠানকে কতটা রঙিন করা যায় তা নিয়ে চলছে জোর প্রস্তুতি। স্কুল অনুষ্ঠানে এসে পুরনো স্মৃতি, ফেলে আসা বন্ধুদের আবার দেখতে পাবে বলে সুদূর নিউ ইয়র্ক থেকে স্বামী সন্তান নিয়ে ১০ বছর পর চট্টগ্রামে এসেছেন এসএসসি ১৯৯৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী তানজিয়া তাসমিন পলি। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশেকে বলেন, সাত বছর পরে বাংলাদেশে এলাম। স্কুলের অনুষ্ঠানে থাকার লোভ সামলাতে না পেরে সেই অনুষ্ঠানের সাথে সময় মিলিয়ে দেশে চলে আসছি। এমন অনেক বন্ধুর সাথে দেখা হবে যাদের সাথে গত ২১ বছর কোনো যোগাযোগই ছিল না। এই স্কুলেই পড়েছি আমরা ৪ বোন ও ৩ ভাই। তাই আমাদের উচ্ছ্বাস ভিন্নমাত্রার। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে রয়েছে সচিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহ আরো উচ্চ পদস্থ সহ অনেকে, বিভিন্ন পদে কর্মরত থেকে ও এই স্কুল থেকে যে আদর্শ গ্রহন করেছিল তাদের ব্যবহারে তা প্রষ্ফুটিত হয়। এতদিন পড়েও ৭৫ বছর বর্ষ পুর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুষ্ঠানের সহযোগীতায় তাদের আন্তরিকতার কোন অভাব ছিল না।