Amar Praner Bangladesh

চিকিৎসা সেবার নামে চলছে বাণিজ্য রোগীরা হচ্ছে পাঁঠার বলি

(ডাক্তারকে ‘রিপোর্ট’ দেখাতেও ফি এক গরু যেন দুবার জবাই। সময়ের যথেষ্ট দাম আছে যুক্তি ডাক্তারের। দেশজুড়ে সরকারী হাসপাতাল স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা চিকিৎসক সিন্ডিকেটের ‘টেস্ট’ বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। ফলে উচ্চমূল্যে টেস্ট করাতে গিয়ে ওষুধ কেনার টাকা থাকছে না অনেক রোগীর। এই প্রক্রিয়ায় অনেক অসাধু চিকিৎসকও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।)

 

 

শের ই গুল :

 

দেশের সর্ববৃহৎ সেবার স্থান স্বাস্থ্যসেবা এখন সেবাহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে শুধুমাত্র মানুষের জীবনকে পুঁজি করে অর্থ আদায়ের বিশাল এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সরকারী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুলোতে রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম প্রায় সময়ই থাকে বিকল নাকি ইচ্ছে করেই বিকল করে রাখে বুঝা বড় কঠিন। সরকারী হাসপাতাল গুলোতে চলছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নায়ক রঞ্জিত মল্লিকের অভিনীত সিনেমা জীবন নিয়ে খেলার দৃশ্যের মতো একের পর এক বাস্তবচিত্র। এছাড়া সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোতে ২০ ভাগ পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থাই নেই।

এই সুযোগে হাসপাতালের ভেতরেই গড়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের একটি শক্তিশালী চক্র। তাদের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে হাসপাতালের রোগীর নমুনা সংগ্রহ করছেন। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের রিসিটের মাধ্যমে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। এ প্রক্রিয়ায় অনেক অসাধু চিকিৎসকও জড়িত। তাদের কারসাজিতে এখানে ভর্তি রোগীর নমুনা চলে যাচ্ছে পাশেই গড়ে তোলা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। দেশজুড়ে সরকারী হাসপাতাল স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা চিকিৎসক সিন্ডিকেটের এই ‘টেস্ট’ বাণিজ্য এখন ‘ওপেন সিক্রেট’।

ফলে উচ্চমূল্যে টেস্ট করাতে গিয়ে ওষুধ কেনার টাকা থাকছে না অনেক রোগীর। দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য। অনেক ডাক্তারের ফি ১-২ হাজার টাকা, আবার টেস্ট করেও রিপোর্ট দেখালে দিতে হয় টাকা। যেখানে টেস্ট করা হয় সেখান থেকে পায় কমিশন, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভরা দিচ্ছে ডাক্তারদেরকে গিফটের উপর গিফট। এতো পেয়েও এতো খেয়েও ভরছেনা ডাক্তারদের পেট। সরকারী কোন নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ সহ অন্যান্য বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিস্টেম না থাকায় অনেক ডাক্তাররাই অতিরিক্ত টাকা আয়ের নেশায় হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। সবক্ষেত্রেই রোগীরা হচ্ছে পাঁঠার বলি।

বলতেও পারেনা, সইতেও পারেনা, না পারে বুঝাতে, ডাক্তারদের কথা শুনে নিজের মাথাটি নিজ থেকেই সমরপৃত করে বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার সামনে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হকের সঙ্গে প্রাণের বাংলাদেশের কথা হয়। তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সেবার পরিবর্তে বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। এটা আমাদের ন্যায় নীতি বিসর্জনের মতো। এই লজ্জা সম্পূর্ণ জাতির। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে প্রাইভেট ক্লিনিকের লোকদের নমুনা সংগ্রহের বিষয়টি আইনসিদ্ধ নয়। একটি চক্র গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল রোগীদের বিভ্রান্ত করে এ কাজ করছে। অনেক সময় চক্রের সদস্যরা হাসপাতালের স্টাফ পরিচয়ে রোগীদের ফাঁদে ফেলছে। ক্যাশ টাকার লেনদেন হওয়ায় আমাদের কিছু লোকজনও এ কাজে জড়িয়ে পড়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শতকরা ৮০ ভাগ পরীক্ষা আমাদের এখানেই হয়। ২০ ভাগের সুযোগ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এজেন্টরা ঢুকে পড়ছে। ইদানীং এ কাজে চিকিৎসকদের একটি গ্রুপ সক্রিয় বলে শুনেছি। এটা তাদের নৈতিকতার পরাজয়। এসব বন্ধে আমরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। ইলেকট্রনিক মেডিকেল রিপোর্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা চালু করা গেলে বাইরের কোনো প্যাথলজি রিপোর্ট যখন আমাদের সফটওয়্যারে আপলোড হবে না তখন এমনিতেই এই চক্রটির তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে। আপাতত আমরা এন্ট্রি পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করছি।

এছাড়া কিছুদিন পরপরই র‌্যাব দেশব্যাপী বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। তারা দালালচক্র ও অবৈধ কাজে জড়িতদের ধরে নিয়ে যায়। জেল-জরিমানা করে। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্সদের সামনেই বেসরকারী বিভিন্ন ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের দালালরা সরকারী হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের রোগীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সদের মতোই পালাক্রমে ডিউটি করেন। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে রোগীর ব্যক্তিগত ফাইল ঘেঁটে চিকিৎসকদের চিকিৎসাপত্র দেখেন। তাতে টেস্ট করানোর নির্দেশনা থাকলেই স্বজনদের ফুসলিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে যান। ওয়ার্ডের এক কোণেই রাখেন তাদের নমুনা সংগ্রহের সরঞ্জাম। যেন সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি ক্লিনিকের সাব অফিস-এমন মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। আবার অনেক চিকিৎসক কোথা থেকে টেস্ট করাতে হবে তা সরাসরি রোগীর স্বজনদের বলেই দেন।

এ কাজে দেশব্যাপী সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র ঘিরে অসাধু চিকিৎসকদের একটি সিন্ডিকেটও গড়ে উঠছে। এই সিন্ডিকেটের হোতারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পছন্দের চিকিৎসকদের এনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ দিচ্ছেন। এই পদের একজন চিকিৎসকের অধীনে দুটি ওয়ার্ড পরিচালিত হয়। তারাই মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন নিজ নিজ ওয়ার্ডের টেস্ট বাণিজ্য। চিকিৎসকরা জড়িত থাকায় এই চক্রের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে হাসপাতালের অন্য স্টাফরাও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে এসব চিকিৎসক পপুলার, ল্যাবএইডে রোগী পাঠাতেন। এখন তারা নিজেরাই ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে বসেছেন।

২০০ পার্সেন্ট লাভের ব্যাবসায় নেমে অনেক চিকিৎসক নিজেদের পরিচয় ভুলে গিয়ে ব্যবসায়ীদের মতো মুনাফার লোভে যা খুশি তাই করছেন। এদের কারসাজিতেই হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে সব সময় সংকট লেগেই থাকে। টেস্ট বাণিজ্যে চিকিৎসকদের জড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি, স্বাচিপের সাবেক নেতা ও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটুর সঙ্গে কথা হয় প্রাণের বাংলাদেশের। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাকটিস চালু করা গেলে এ সমস্যা বহুলাংশে লাঘব করা সম্ভব ।

এতে সরকারি হাসপাতালের রোগী বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর বন্ধ হবে। অফিস সময়ের পর রোগীরা সরকারি হাসপাতালেই আউটডোর ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা পাবেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকের লোকজনদের নমুনা সংগ্রহের বিষয়টি দৃষ্টিকটু। আইনসিদ্ধও নয়। তারপরও সিস্টেমের কারণে এটা চলছে। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতার অভাব ও কর্মী সংকটের কারণে এই প্রবণতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, আড়ালে থেকে দেশব্যাপী সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রিক চক্রের মদদ দেন সরকারি দলের কিছু চিকিৎসক নেতারা। এলাকার সংসদ সদস্যদের সাথে থাকে তাদের আতাত। প্রসঙ্গত, সরকারি হাসপাতালের ২০০ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করা যাবে না-এমন একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই উদ্যোগ এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা সরেজমিন দেখা গেছে, ডিএমসিএইচের ২০০ গজের কম দূরত্বে গড়ে উঠেছে অথেনটিক ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন লি., হেলথ এইড ডায়াগনিস্টিক সেন্টার, পিওর সায়েন্টিফিক ডায়াগনস্টিক সার্ভিসেস, ঢাকা ডায়াগনস্টিকসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। ঠিক একই ভাবে দেশের সর্বত্র সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাছে গড়ে উঠেছে বেসরকারী ডায়াগনোস্টিক সহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

এদের এজেন্ট, দালালরা সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ভর্তি রোগীদের টেস্ট বাণিজ্য এবং রোগী ভাগানোর কাজ করে। রয়েছে তাদের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, এই অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ও দালাল সরকারী হাসপাতাল থেকে রোগী নির্দিষ্ট বেসরকারী হাসপাতালে এনে খায় কমিশন। কে মরল কে বাঁচলো দেখার বিষয় না! এসব মানুষ খেকো জানোয়ারদের পকেট ভারী করতে যেকোন পদক্ষেপ নিতে তারা কুন্ঠাবোধ করেনা। সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে তাদের তৎপরতা দেখা যায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. মো. ফরিদ হোসেন মিঞা প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি হাসপাতালের ২০০ গজের ভেতর কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক করা যাবে না মর্মে একটি প্রস্তাব অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা অবৈধ। কেউ যদি আমাদের কাছে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অবশ্যই তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।