Amar Praner Bangladesh

দেশজুড়ে সাংবাদিকরা আছে চরম বিষন্নতায়

 

(একটা সময় ছিল যখন সাংবাদিকদের বিয়ে করাটাই কঠিন কাজ ছিল। পাত্রীপক্ষ বলতো- ‘ছেলে সাংবাদিকতা করে বুঝলাম। কিন্তু আর কি চাকরি করে?’ মাঝখানের বছরগুলোতে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। আবার সেই অবস্থা ফিরে আসে কি না, কে জানে! বটতলার সাংবাদিক, হাতুড়ে সাংবাদিক, সাংঘাতিকরা সুমহান সাংবাদিকতা পেশার ওপর কালিমা লেপন করে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষন্নতা।)

 

শের ই গুল :

 

সমাজের দর্পন, জাতির বিবেক, দেশের চতুর্থ স্তম্ভ হলো সাংবাদিক। যা আজ বর্তমানে চরম বিষন্নতায় ভুগছে। সেই সাথে আরো বেশি হতাশা ও বিষন্নতায় ভুগছে মফস্বলে কর্মরত বিভিন্ন গনমাধ্যমের এর সাংবাদিকরা। গবেষণায় উঠে আসে, সাংবাদিকতায় নানামুখী চাপ, একের পর এক সাংবাদিক নির্যাতন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পেশাগত মান মর্যাদা এর অন্যতম কারন।

অশিক্ষিত এবং অনভিজ্ঞদের সাংবাদিক পেশায় প্রবেশের কারণে মূলধারার সাংবাদিকতা দেশে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সাংবাদিকতায় হতাশা ও বিষন্নতার কারণে মফস্বলে অনেক মেধাবী সাংবাদিক এবং শহরের কিছু সাংবাদিকরা কিছুদিন সাংবাদিকতা করার পর পেশা পরিবর্তন করছে এই প্রক্রিয়া প্রতিদিন বাড়ছে। বাংলাদেশের ৪২.৯% সাংবাদিক তাদের পেশা নিয়ে বিষণ্ণতায় ভুগছেন। এ ছাড়া ৭১.৭% সাংবাদিক তাদের পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।

সম্প্রতি শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা আইজিআই গ্লোবালের “হ্যান্ডবুক অব রিসার্চ ইন ডিসক্রিমিনেশন, জেন্ডার ডিসপ্যারিটি অ্যান্ড সেইফটি রিস্ক ইন জার্নালিজম” শীর্ষক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৪২.৯% সাংবাদিক তাদের পেশা নিয়ে বিষণ্ণতায় ভুগছেন। বিষণ্ণতায় ভোগা ৪২.৯% সাংবাদিকের মধ্যে ৪৮.৪৮% পুরুষ এবং ৪১.৭৭% নারী। আর পেশাগত হতাশার কারণেই সাংবাদিকতা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে চান ৭১.৭% সাংবাদিক। গবেষণায় আরো বলা হয়, পেশাগত অনিশ্চয়তাই সাংবাদিকতা বিমূখতার প্রধান কারণ। কেননা, প্রায় ৮৫% সাংবাদিকই চাকরির অনিশ্চয়তায় ভোগেন। হতাশার আরও কারণের মধ্যে রয়েছে, সময়মতো গনমাধ্যমে পদোন্নতি না পাওয়া, কম বেতন পাওয়া, সাংবাদিক নির্যাতন এবং অতিরিক্ত কাজের চাপ।

এদিকে, সাব-এডিটর বা কপি এডিটরদের তুলনায় বেশি বিষণ্ণতায় ভুগছেন রিপোর্টাররা। বিষণ্ণতার হার রিপোর্টার ৪৪.৩২%, কপি এডিটরের ৩৪% এবং নিউজ এডিটরের বিষণ্ণতার হার ২৮.৫৭%। গবেষণায় আরও উঠে আসে, নানামুখী সাংবাদিক নির্যাতন, সাংবাদিক সংগঠনের অসহযোগিতা,পেশাগত বিভিন্ন চাপ ও হতাশার কারণে অনেক মেধাবী সাংবাদিক কিছুদিন সাংবাদিকতা করার পর পেশা পরিবর্তন করেন। সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এ নিয়ে দেশে সচেতনতার মাত্রা খুবই কম। সাংবাদিকতা পেশা ও সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়ন প্রশ্নে কর্মক্ষেত্রে তাদের মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি অবশ্যই গণমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিৎ। আমার ২ যুগেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় পরিবর্তনটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে যা শিখিয়েছে- বাংলাদেশের খুব কম গণমাধ্যমই নির্ভেজাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি হয়েছে।

এ কারণেই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই কোন বিজনেস মডেল নেই। তাই শুরুটা যত রমরমা হয়, কয়েক বছরের মধ্যে ঠিক ততটাই ঝিমিয়ে পড়ে। কারণ, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে মালিকরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়। মালিকদের সুদৃষ্টি বা নিজেরা চলতে পারার মতো উপার্জন না করতে পারায়, পেশাজীবি হিসেবে সাংবাদিকের নিয়মিত বেতন পাওয়া যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি পদোন্নতি বা পেশাগত উন্নয়ন হোঁচট খায়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশায় এটা এখন চরম বাস্তবতা। উপরের দুটি কারণে আর্থিক স্বচ্ছলতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে সাংবাদিকরা। এদিকটাতে সরকারি চাকরিজীবিরা যতটা এগিয়েছে, বেসরকারি চাকরিজীবিরা ততটাই পিছিয়েছে। এটা প্রতিযোগিতার কোন বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজারে গেলে সামর্থ্যের একটা প্রতিযোগিতা করেই ফিরে আসতে হয়। খুব সচেতনভাবে হোক বা না হোক, সাংবাদিকতা একটা গ্ল্যামারস পেশা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

বাংলাদেশে এর উত্থানের সময়টাতে, অনেক তরুন-তরুনী এই পেশায় ঢুকে পড়েছে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতার ডিগ্রী নিয়ে যত মানুষ এই পেশায় প্রবেশ করছে বা প্রবেশ করার অপেক্ষায় আছে, তত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এ কারণেই যারাই সাংবাদিকতায় আসছে, তারাই ২-৩ বছরের মধ্যে একটা জায়গায় স্থবির হয়ে যাচ্ছে। এই স্থবিরতা হতাশা এবং বিষন্নতার জন্ম দিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েরা সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করেছে এবং তারা দুর্দান্ত সব কাজও করছে। কিন্তু সে অনুযায়ী নিজের কোন ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারেনি অনেকেই। কারণ, সে যে মাধ্যমে কাজ করে বা তার কোন প্রতিবেদন যখন নির্দিষ্ট মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত হচ্ছে, দর্শক হয়তো তখন অন্য কোন চ্যানেল দেখছে। সাংবাদিকতার হতাশায় অনেক বড় অবদান রেখেছে ফেসবুক, ইউটিউব বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। একজন সাংবাদিক অনেক খেটে যে প্রতিবেদনটি তৈরি করে- বাস্তবে দেখা যায় তার প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার আগেই স্যোশাল মিডিয়ায় সবকিছু প্রকাশিত হয়ে যায়। তখন ঐ সাংবাদিকের কাজ দর্শক বা পাঠকের কাছে নতুন কিছু হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে না। গাড়ি, বাড়ির টার্গেটও হতাশার একটি বড় কারণ।

এই পেশায় যাদেরকে আইকন মনে করে তরুনরা সাংবাদিকতায় আসে, ঠিক তাদের মতো না হতে পারা বা তাদের মতো হতে পারার অনিশ্চয়তা বা কেউ কেউ যে ভিন্নপথে গেছে, সেই পথে না যেতে পারাটাও প্রতিমুহুর্তে একজন সাংবাদিককে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে পারে। বনসাই ইফেক্ট: যে কিশোর বা কিশোরী টেলিভিশনে কোন সাংবাদিককে দেখে অথবা পত্রিকায় কোন সাংবাদিকের দুর্দান্ত প্রতিবেদন পড়ে, খুব ভালো সাংবাদিক হওয়ার অনুপ্রেরণা নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে এই পেশায় প্রবেশে করেছে, তার জন্য প্রথম অর্জনের বিষয় হলো- সে হয়তো তখন ঐ সাংবাদিক যার কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে, তারই সহকর্মী হয়।

বিষয়টা প্রথমে খুব মজার মনে হলেও, ১-২ বছরের মধ্যেই সে টের পায়, তার ঐ আইকন ব্যক্তির মাথা ছাদে ঠেকে গেছে। উপরের গাছ ছাদে ঠেকে গেলে, নিচের গাছ তো বেশি বাড়ার কথা না। আর যদি বাড়তে না পারে তবে সে হয় কোন রকমে মানিয়ে নিয়ে চাকরি করে যাবে নয়তো প্রতিমুহুর্তে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকবে। এমন আশঙ্কা যেখানে থাকে, সেখানে বেতন অনিয়মিত হলেও, হতাশা আর বিষন্নতা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

এমন আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। সবশেষে একটা বাস্তব গল্প বলি- একটা প্রতিষ্ঠানে মাঝে মাঝেই দুই-আড়াই মাস করে বেতন বকেয়া পড়ে। এতে মোটা বেতন পাওয়া লোকদের তেমন কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু যাদের প্রতি মাসের বেতন দিয়ে সংসারের বাজার করতে হয়, বাড়িভাড়া দিতে হয়, বাচ্চাদের স্কুলের খরচ দিতে হয় তারা ভয়ানক যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। তো যে কথা বলছিলাম- ঐ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ব্যক্তি পাড়ার দোকান থেকে বাকি বাজার করতে শুরু করলেন।

দোকানদারও জানেন, মাসের শেষে বেতন পেলেই টাকাটা তিনি পরিশোধ করে দেবেন। প্রথম মাস গেলো বেতন হলো না, দ্বিতীয় মাস গেলো বেতন হলো না। দোকানদারের সম্মান প্রদর্শনটাও কমে আসতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত সে বলেই বসলো- ‘কি রে ভাই, আপনার কি চাকরি নাই?’ এই কথা শুনে লজ্জায় তিনি পাড়ার অন্য দোকান থেকে বাকি নিতে শুরু করলেন। অফিসে সেই ব্যক্তির কাজের গুণগত মান কেমন হবে, একবার চিন্তা করুন। একটা সময় ছিল যখন সাংবাদিকদের বিয়ে করাটাই কঠিন কাজ ছিল। পাত্রীপক্ষ বলতো- ‘ছেলে সাংবাদিকতা করে বুঝলাম। কিন্তু আর কি চাকরি করে?’ মাঝখানের বছরগুলোতে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। আবার সেই অবস্থা ফিরে আসে কি না, কে জানে !

রাজধানীর আব্দুল্লাহ্পুরে ফার্মেসীর একটি দোকানে গিয়েছিলাম, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। পেশাগত পরিচয় ও দু-একটি কথাবার্তার পর দোকানি ভদ্রলোক আমার কাছে একটি আবদার করে বসলেন, ‘ভাই, আমাকে একটি কার্ড করে দেওয়া যায়?’ ভদ্রলোকের এ কথায় খুব একটা অবাক হইনি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পরিচিত, অল্প পরিচিতের মধ্যে অনেকেই কার্ড চেয়েছেন। ফার্মেসী দোকানের ওই ভদ্রলোককে বললাম, ‘ভাই, আপনি একজন ব্যবসায়ী। সাংবাদিকতার কার্ড দিয়ে আপনি কী করবেন?’ আপনি তো সাংবাদিকতা, রিপোর্টিং বা লেখালেখি করবেন না। তিনি বললেন, ‘থাকলে একটু সুবিধা হয়। কেউ ডিস্টার্ব করে না।’ কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল, সাংবাদিকতার কার্ড বা পরিচয়পত্র জোগাড় করতে তিনি মরিয়া। এভাবেই সারা দেশে বাড়ছে ‘সাংবাদিক’-এর সংখ্যা। ঢাকা শহরে সাংবাদিক কতজন, কত হাজার তার কোনো হিসাব বোধ করি কারও কাছে নেই। সারা দেশে সাংবাদিক কত হাজার, তারও হিসাব নেই।

অসংখ্য সাংবাদিক আছেন, যাঁদের কোনো কাজ নেই। তাঁরা এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান, বসে থাকেন। তাঁদের ‘বেকার’ বলব না, কিন্তু কাজ করার আগ্রহ তাঁদের মধ্যে খুব কম। সাংবাদিকতার কার্ডটিই তাঁদের একমাত্র সম্বল। এই কার্ড ব্যবহার করেই তাঁরা খেয়ে-পরে বেঁচে আছেন। সব অনুষ্ঠানে তাঁদের অনাবশ্যক উপস্থিতি আয়োজকদের পীড়িত করে। সার্বিকভাবে এতে ক্ষুণ্ন হয় সাংবাদিকতা পেশার মানমর্যাদা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পেশাদারি।

আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় ঢোকা কঠিন নয়। ইচ্ছে হলেই সাংবাদিক হওয়া যায়। সাংবাদিকতার কার্ড পাওয়া যায়। বলা ভালো, কার্ড কিনতে পাওয়া যায়। কারণ, খবরের কাগজের তো আর অভাব নেই। নামসর্বস্ব দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক কত শত ছাপা পত্রিকা। কয়েক লক্ষ অনলাইন পত্রিকা। এতগুলো রেডিও-টিভি চ্যানেল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কোনো প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন নেই। লেখালেখির অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার সব গুরুত্বপূর্ণ পেশাতেই আগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাগে। আর সাংবাদিকতায় অনেকেই আগে ‘সাংবাদিক’ হন, তারপর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এর কারণ হচ্ছে, কে সাংবাদিক হতে পারবেন, আর কে পারবেন না, সে বিষয়ে নীতিমালা নেই।

সাংবাদিকতা একটি মহান, শ্রেষ্ঠ পেশা। বাংলাদেশের মতো একটি নড়বড়ে গণতন্ত্রের দেশে সাংবাদিকতা তথা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এ দেশের আমলাতন্ত্র দুর্নীতিপরায়ণ। রাজনীতিবিদেরা গড়পড়তায় অসাধু-ঠকবাজ। কিন্তু জনগণের বড় অংশটির মধ্যে সততার ঘাটতি নেই। তার পরও স্বাধীনতার ৫ দশক পেরিয়েও এই দেশটি আর্থসামাজিকভাবে ততটা এগোতে পারেনি, যতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল। জনগণের ক্ষমতায়নে সাংবাদিকদের ভূমিকা রয়েছে। দেশের বড় বড় দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, অপরাধ ঢেকে রাখার অপচেষ্টা সাংবাদিকেরাই ফাঁস করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে। কিন্তু দক্ষতার অভাবে, পেশাদারির সংকটে সেই প্রত্যাশা অনেকাংশেই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এই তথাকথিত কার্ডসর্বস্ব সাংবাদিকেরা, আমজনতার কাছে যাঁরা ‘বটতলার সাংবাদিক’, ‘হাতুড়ে সাংবাদিক’, ‘সাংঘাতিক’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত, সুমহান সাংবাদিকতা পেশার ওপর কালিমা লেপন করছেন।

সৎ-সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতা পেশার ওপর একটা বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই বিষফোড়াটা অবিলম্বে অপসারণ করা দরকার। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, সাংবাদিকতা পেশাটাকে এত সহজভাবে না দেখা। প্রত্যেক সাংবাদিকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। অন্তত নতুন যাঁরা এই পেশায় আসতে চান, তাঁদের এটা থাকতেই হবে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ার ব্যবস্থা আছে।

গত এক-দেড় দশকে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়া যাচ্ছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ম্যাস কমিউনিকেশন বা নিমকো, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ বা পিআইবিতে সাংবাদিকতার ওপর ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন কোর্স চালু আছে। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকতার ওপর বুনিয়াদি কোর্স করাচ্ছে। এসব কোর্সের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার ওপর একটা মৌলিক ধারণা এবং পেশাগত দায়িত্ববোধের চেতনা তো কিছুটা হলেও তৈরি হয়। একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার চেয়ে মোটের ওপর কিছুটা থাকা তো ভালো।

যাঁরা অন্য বিষয়ে বিস্তর লেখাপড়া করেছেন, কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় আসতে চান, তাঁদেরও যেকোনো একটি কোর্স করে এলে মন্দ কী? আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, তা হলো, সনদ ছাড়া কেউ সাংবাদিকতা পেশায় আসতে পারবেন না। সাংবাদিকতায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কি সরকারি, কি বেসরকারি, এমনকি প্রচারসংখ্যায় পিছিয়ে থাকা খবরের কাগজও সনদ ছাড়া নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেবে না। এতে যে সুবিধাটা হবে, তা হলো, হুটহাট কেউ এই পেশায় প্রবেশ করতে পারবেন না।

সাংবাদিকতায় শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত লোকদের আসার সুযোগ তৈরি হবে। সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা বা উন্নতি করার জন্য আরেকটি কাজ করা যায়, তা হলো, বর্তমানে যাঁরা কর্মরত আছেন, যাঁদের সাংবাদিকতায় কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নেই, তাঁদের পর্যায়ক্রমে কোর্স করানো। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পিআইবি যদি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তা হলে সবচেয়ে ভালো হয়। আরেকটা প্রস্তাব আছে, তা হলো, সনদধারী ও কর্মরত প্রত্যেক সাংবাদিকের নাম-পরিচয় পিআইডির (প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট) তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা।

বর্তমানে পিআইডির কাছে কিছু সাংবাদিকের নাম, পদবি ও মুঠোফোন নম্বর সংরক্ষিত আছে। এই গাইড বছরে একবার প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই গাইডের বাইরে রয়েছেন আরও হাজারো সাংবাদিক। কোর্স শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণদের নামের তালিকা পিআইডিতে পাঠাবে। পিআইডি কর্তৃপক্ষ সেই তালিকা ডিজিটালি সংরক্ষণ করবে। প্রত্যেকের একটা পরিচিতি নম্বর থাকবে। এই নাম ও পরিচিতি নম্বর পিআইডির ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকবে। এতে যে সুবিধাটা হবে, তা হলো, সনদ নেই এমন কারও নাম নতুন করে এই তথ্যভান্ডারে যুক্ত হবে না। টঙ্গী পূর্ব থানার সামনে পরিচয় হয় এক সাংবাদিকের সাথে।

তিনি পেশায় সাংবাদিক, ক্রাইম রিপোর্টার। তিনি জানালেন‘আমার কাজ হলো সারা ঢাকা শহর ঘুইরা ঘুইরা রিপোর্ট করা।’ বলার সময় চাবিটা আঙুলে পেঁচিয়ে হাত ঘুরিয়ে তাঁর কাজের ব্যাপ্তিটা দেখালেন। তাঁর সঙ্গে আমার আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু তিনি যে পত্রিকার নাম বলেছেন, সেই পত্রিকার চেহারাও কোনো দিন দেখিনি। পড়া হয়নি তাঁর কোনো প্রতিবেদনও।

তাঁকে ভুয়া সাংবাদিক বলব না, কিন্তু প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে পেশাগত উন্নতির কোনো চেষ্টা তাঁর মধ্যে নেই, এটা স্পষ্ট। দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী গণমাধ্যম খুব প্রয়োজনীয়। আর শক্তিশালী গণমাধ্যমের জন্য দরকার প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী। শিক্ষিত, সচেতন সাংবাদিকেরা পারবেন গুণমান আর পেশাদারি বজায় রাখতে, এই মুহূর্তে যেটার ঘাটতি খুব বেশি। অশিক্ষিত, অনভিজ্ঞ, চাঁদাবাজ সাংবাদিকদের হাত থেকে এই পেশাকে রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

সবকিছু মিলে দেশের সাংবাদিকরা ভুগছে বিষন্নতায়। এর মূল কারণ সাংবাদিকদের জন্য নিদিষ্ট নীতিমালা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আর কোন দিন হবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ সাংবাদিকতা এখন রাজনীতির সাথে জড়িয়ে এক প্রকারের গোলামীতে পরিণত হয়েছে। এ সবকিছু নিয়ে দেশজুড়ে মূল ধারার সাংবাদিকরা ভুগছে বিষন্নতায়।