Amar Praner Bangladesh

দেশব্যাপী হঠাৎ বেড়ে গেছে ধর্ষণের ঘটনা

 

মোঃ লোকমান হোসেন :

বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, মাদকের বিস্তার, বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। দেশব্যাপী হঠাৎ বেড়ে গেছে ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষকের লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশু ও বৃদ্ধরাও। এমনকি রেহাই পাচ্ছেন না বাকপ্রতিবন্ধী বা ভবঘুরে পাগলও। ইতিমধ্যে অনেক ধর্ষণ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। গা শিউরে ওঠার মতো এমন ধর্ষণের খবর প্রতিনিয়তই গণমাধ্যমে উঠে আসছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পত্রিকার খবরের বাইরেও প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটছে।

শিশুর সংখ্যাই বেশি- প্রতিদিনই খবরের কাগজ উল্টালেই ধর্ষণের একাধিক খবর। গত চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯টি শিশু। জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রায় ১ হাজার সংবাদ বিশ্নেষণ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এ তথ্য তুলে ধরেছে। অন্যদিকে একই সময়ে সারা দেশে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ)। ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সম্প্রতি ‘শিশু অধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক এ উপাত্ত প্রকাশ করে সংস্থাটি। ২০২২ এর শুরু থেকে যেভাবে ধর্ষণের সংবাদ পত্রিকায় পাওয়া যাচ্ছে তাতে করে বিগত দিনের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

গাজীপুর মহানগরীতে ধর্ষণ ও অপহরণের ঘটনা বেড়েই চলছে। গত বছর জুলাই থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মহানগরীর আটটি থানায় এ দুটি অপরাধের মামলার হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। উল্লিখিত সময়ে নগরীর থানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বাসন থানায় আর অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটেছে সদর থানায়। টঙ্গী পূর্ব থানা এবং পশ্চিম থানায় রয়েছে বিভিন্ন ধর্ষণের নজিরবিহীন ঘটনা। তবে এ দুটি অপরাধে যত মামলা নথিভুক্ত হয়েছে প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে অনেক বেশি। কারণ অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনায় অভিযোগ করতে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানি করে পুলিশ।

ফলে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার পুলিশি হয়রানি ও সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে থানায় মামলা করতে না গিয়ে ঘটনা চেপে যান। গাজীপুর মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে গত এক বছরে ১৩৩টি ধর্ষণ ও ৪৫টি অপহরণের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি ২০টি মামলা হয়েছে বাসন থানায়। এছাড়া সদর থানায় ১৯, কোনাবাড়ী থানায় ৭, কাশিমপুর থানায় ৪, টঙ্গী পশ্চিম থানায় ১২, টঙ্গী পূর্ব থানায় ৫ ও গাছা থানায় ১৬টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অন্যদিকে অপহরণের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি সাতটি মামলা হয়েছে সদর থানায়।

এছাড়া বাসন থানায় চার, টঙ্গী পশ্চিম থানায় এক, টঙ্গী পূর্ব থানায় চার ও গাছা থানায় একটি মামলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরীর বাসন থানা এলাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বেড়েছে ধর্ষণ ও মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের মতো ভয়ংকর অপরাধ। অভিযোগ রয়েছে এসব ঘটনায় অভিযোগ করতে থানায় গেলে মামলা না নিয়ে উল্টো হয়রানি করে পুলিশ। অনেকে পুলিশের হয়রানির ভয়ে থানায় মামলা করতেও যান না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে বাসন থানার কাছাকাছি এলাকায় বাসে হাত-পা বেঁধে এক নারীকে ধর্ষণ করে ওই বাসের চালক, সুপারভাইজার, হেলপারসহ চারজন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২২ ইং গাছা থানায় ১৩ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করছে স্কুলের শিক্ষক। অসহায় পরিবার ভ্যান চালক তার মেয়ের বিচার চেয়ে বিভিন্ন দৌঁড়াদৌঁড়ির পাশপাশি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দিয়েও পাচ্ছেনা বিচার। নগরীর বাসন থানার রওশন সড়ক এলাকায় একটি এনজিও অফিসে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে এনজিওর মালিক ইমরান হোসেন ওরফে আনোয়ার (৪৫) এক নারীকে ধর্ষণ করেন।

এ ঘটনায় নির্যাতিতা নারী মামলা করতে গেলে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রেখে টালবাহানা করে পুলিশ। পরদিন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশ হলে তড়িঘড়ি মামলা নেয়। কিন্তু মামলা তুলে নিতে প্রভাবশালীরা চাপ দিতে থাকে। নির্যাতিতা থানায় জিডি করতে গেলেও গ্রহণ করা হয়নি। একপর্যায়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও ধর্ষকের হয়ে নারীকে মামলা তুলে মীমাংসার প্রস্তাব দেন। ঢাকার শেওড়াপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম (৩০) গত ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা সোয়া ৩টার দিকে মিরপুর থেকে বাসে এসে গাজীপুর ভোগড়া বাইপাস মোড়ে নামার পর একদল অপহরণকারী তাকে মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে ওই ব্যবসায়ীর মোবাইল থেকে ফোন করে পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। ব্যবসায়ীর ভাই বাসন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে গ্রহণ করে। পুলিশ ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টা চালায়নি। বাধ্য হয়ে অপহৃতের ভাই ঘটনাটি র‌্যাবকে জানায়। র‌্যাব-১ ওইদিন রাতে আলম সরকারি কলেজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে শফিকুল ইসলামকে উদ্ধার ও চার অপহরণকারীকে আটক করে।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদের (৩৯) বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। গত বছর ২৩ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে তার পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনায় পরিবারের লোকজন থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ অভিযোগটি জিডি হিসেবে গ্রহণ করে। টাকা না পেলে তারা অপহৃতকে হত্যার হুমকি দিলে ওই কর্মকর্তার স্ত্রী অপহরণকারীদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে ২৫ হাজার টাকা দেন এবং র‌্যাব-১-কে জানান। র‌্যাব পরদিন অপহৃতকে উদ্ধার এবং পাঁচ অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে। ধর্ষণ ও অপরাধের মতো অপরাধ বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বাসন থানার ওসি কাওসার চৌধুরী প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মহানগরীর শ্রমিক অধ্যুষিত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বাসন। এখানে ধর্ষণ, ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনায় পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছি। এসব ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে এলাকাবাসীর ভাষ্য, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো ঘটনা পুলিশকে জানালে তারা প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে চান না। তারা নানা অজুহাতে মামলা নিতে টালবাহানা করতে থাকে।

এ অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ক্রাইম) মোহাম্মদ শরিফুর রহমান প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশ বিশেষ নজরদারি করছে। ইতিমধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। কয়েকদিন পরপর গাজীপুর টঙ্গীতে ধর্ষণের সংবাদ শোনা যায়। সম্প্রতি টঙ্গী আবাসিক হোটেলে চাকরির কথা বলে এক তরুণীকে ধর্ষণ করেছে মিথ্যা চেয়ারম্যান পরিচয়দানকারী লম্পট। সারাদেশে বেড়েছে ধর্ষণ। শিক্ষক, উকিল, বাড়ীওয়ালা সহ সমাজের যেকোন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে বর্তমান সময়ে শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউ নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা তুলে ধরা হল।

জুলাই মাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনাটি হল রাজধানীর ওয়ারিতে সাত বছরের শিশু সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার বিষয়টি। এ ঘটনায় ৭ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে অভিযুক্ত হারুনকে গ্রেফতার করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার সদস্যরা। আসামির জবানবন্দিতে জানা গেছে, ৫ জুলাই বিকালের দিকে ছাদ দেখানোর কথা বলে সায়মাকে ছাদে নিয়ে যায় হারুন। এরপর সে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করলে সায়মা চিৎকার দেয়। এ সময় সে সায়মার মুখ চেপে ধরে এবং ধর্ষণ করে। পরে সায়মাকে হত্যা করে ফ্ল্যাটের একটি ঘরে লাশ রেখে পালিয়ে যায় হারুন। আর গত মাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে ৬ মে। সেদিন রাতে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে ঢাকার কল্যাণপুরে অবস্থিত ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টাফ নার্স শাহিনূর আক্তার তানিয়া। পরে মেয়েটিকে একা বাসে পেয়ে বাসের চালক নূরুজ্জামান, হেলপার লালনসহ আরও একজন বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় গজারিয়া নামক স্থানে চলন্ত বাসে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে ড্রাইভার, হেলপারসহ অন্যরা তাকে গলায় ওড়না প্যাঁচিয়ে হত্যা করে।

সংশ্লিষ্টদের বিচারিক কার্যক্রম চলছে। ওইদিনই সাভারের আশুলিয়ায় একই পরিবারের মা, মেয়েসহ ৩ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ভণ্ড পিরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চলতি সপ্তাহে মাদারীপুরে দিপ্তী আক্তার নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার পর মুখ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নিখোঁজের দু’দিন পর শনিবার শহরের পাকদী এলাকার একটি পুকুর থেকে ওই ছাত্রীর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। খবর পেয়ে ১৪ জুলাই সকালে নিহতের স্বজনরা মাদারীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করে। একই দিন বরিশালে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে দুই বন্ধুকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ১২ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার ১২ ছাত্রীকে নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেফতার মাদ্রাসা অধ্যক্ষ আল আমিন দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পৃথক দুটি মামলায় উল্লেখ আছে- মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে একাধিক ছাত্রীকে মূলত পানিপানের প্রলোভনে ঘরে ডেকে নিতেন আল আমিন। এছাড়া বইপত্র গোছানোসহ নানা ইস্যুতে ছাত্রীদের নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করতেন। এসব ঘটনার সময় আল আমিনের স্ত্রী বাসায় থাকতেন না। মূলত তার অবর্তমানেই এসব অনৈতিক কাজ হতো। মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন ছাত্রীর ছবি তুলে সেই ছবির মাথা কেটে অন্য দেহে পর্নোগ্রাফি ছবির সঙ্গে যুক্ত করতেন আল আমিন। আর এসব ছবি দেখিয়ে ওই ছাত্রীদের ব্ল্যাকমেইলিং করা হতো।

১০ জুলাই কুমিল্লার র‌্যাব ১১, সিপিসি-২ এর একটি দল ডাক্তার নামধারী সিরিয়াল ধর্ষক মীর হোসেনকে গ্রেফতার করেছে। জানা গেছে, ধর্ষণে তার কৌশল ছিল ভিন্ন। বছরের পর বছর নিজের মালিকানাধীন ডিজিটাল হেলথ কেয়ারের প্যাথলজি ল্যাবে কর্মরত নারীকর্মীদের ধর্ষণ করে আসছিলেন তিনি। কখনও প্রলোভনে, কখনও চাকরি হারানোর হুমকি দিয়ে কিংবা কাউকে চেতনানাশক ইনজেকশন পুশ করে ধর্ষণ করে আসছিলেন তিনি। চলতি মাসের আরেকটি আলোচিত ঘটনা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের অক্সফোর্ড হাই স্কুলের ২০ জনেরও বেশি ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফুল ইসলাম ওরফে আশরাফ। আদালতে দেয়া তার জবানবন্দিতে জানা গেছে, কান্দাপাড়া এলাকার অক্সফোর্ড হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফুল আপত্তিকর ছবি তুলে ও গোপন ভিডিও ধারণ করে ২০ জনের বেশি ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে প্রত্যেককে একাধিকবার ধর্ষণ করে। আদালতে একাধিক শিক্ষার্থীকে ফাঁদে ফেলে, পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে, কাউকে বেশি নম্বর দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে, আবার ফেল করা শিক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে এনে অন্যের খাতা দেখে লেখার সুযোগ দিয়ে ধর্ষণ করে বলে স্বীকার করেছেন ওই শিক্ষক। সাজা পায় না ধর্ষক- ধর্ষণের বিরুদ্ধে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। তারপরও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারীরা। একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি ট্রাইব্যুনালে ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৮৬৪টি।

এ সময় মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি। সাজা হয়েছিল ১১০টি মামলায়। অর্থাৎ বিচার হয়েছিল ৩ শতাংশের কম। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস পেয়ে গেছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে আসামিরা বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। আর ৫৫ শতাংশ মামলায় সাক্ষ্য শুনানির শেষে আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়েছে। কিছু মামলা নিষ্পত্তির কারণ নিবন্ধন খাতায় লেখা নেই, কয়েকটির নিষ্পত্তি হয়েছে আসামির মৃত্যুতে। এভাবে ৯৭ শতাংশ মামলার আসামির বিরুদ্ধেই এসব গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আরেক হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঁচ হাজার তিনটি ধর্ষণের মামলা হয়।

এর মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ ভাগ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ ভাগ। নারীপক্ষের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র চারজনের সাজা হয়েছে। নারীপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭২টি। এর মধ্যে সাজা হয়েছে ৫টি, অব্যাহতি হয়েছে ৯৮৯টি, খালাস হয়েছে ২৮৯টি এবং বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৮৯টি। ধর্ষণের চেষ্টার মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৮৬টি, অব্যাহতি পেয়েছে ৩২৭টি, খালাস হয়েছে ৯৮টি, বিচারাধীন রয়েছে ৭৬১টি মামলা।

পোশাক নয় মানসিকতাই দায়ী- অনেক সময়ই যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর ‘নারীর পোশাক’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতটা সরব আলোচনা হয় ধর্ষকের বিচারের দাবিতে ততটা অবস্থান লক্ষ্য করা যায় না। কেন নারীর পোশাক নিয়ে এতটা আলোচনা? এ ধরনের ঘটনায় পোশাকের দায় কতটা? এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, পোশাকের সঙ্গে ধর্ষণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সম্ভ্রম বিষয়টি পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।

এখন একজন মানুষ কী ধরনের পোশাক পরবে তা তার নিজস্ব ব্যাপার। আমরা দেখেছি, বোরকা পরা নারীও ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণ এখন আর কোনো শ্রেণীর মধ্যে নেই, উচ্চবিত্ত-নিুবিত্ত সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এবং এখন আর কোনো বয়সের মধ্যেও সিমাবদ্ধ নেই। কারণ এখন দেখতে পাচ্ছি ৩ বছরের শিশু থেকে ৫৫ বছরের নারীরাও বাদ যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নারীরা এখন ঘরেও নিরাপদ নেই। এমনকি বাবাও! এসবের জন্য আসলে বিচার না হওয়াটা দায়ী। তনু হত্যার বিচার এখনও হয়নি, এমন আরও বহু উদাহরণ আছে। এখন মিডিয়ার খবরও এ ধরনের ঘটনা বাড়াচ্ছে। কারণ সহিংসতা সহিংসতাকে উসকে দেয়।

ভারতে একটি ঘটনা ঘটছে ঠিক তার কিছুদিন পরই বাংলাদেশে ঘটছে। আমরা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তা অ্যাপ্লাই করতে শুরু করি। রুচিবোধের জায়গায় যেন নিজস্বতা বলতে আর কিছু নেই। সিনেমায় ধর্ষণ দেখানোও এ ধরনের ঘটনার উসকানি দিচ্ছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য নারীর পোশাক নয় বরং বিকৃত মানসিকতা দায়ী। নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ হল নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতা। এমন মানসিকতাই নারীর প্রতি সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নারী শিক্ষার্থীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গ শিরোনামের একটি গবেষণা চালিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদের জেন্ডার ও উন্নয়ন গবেষক দল। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ঢাবি প্রাঙ্গণে নারী শিক্ষার্থীরা একা চলাফেরা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে ইভটিজিংসহ নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হন।

সাধারণত ক্ষমতাশীল ছাত্রসমাজ ও নিচু শ্রেণীর লোকজনের (ভিক্ষুক, পাগল, মাদকসেবী) দ্বারা ছাত্রীরা এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শিকার হন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৩০ জন ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউই ইভটিজিং ও যৌন নিপীড়নের কারণ হিসেবে ‘পোশাক দায়ী’ তা মনে করেন না। পরিসংখ্যানে যা পাওয়া যাচ্ছে- গত পাঁচ বছর সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৯ হাজার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিশুরাই বেশি ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। আরেক হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১৫০ জন নারী ও শিশু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এর তথ্য মতে, চলতি বছরের শুধু মে মাসে দেশে ১৬১টি ধর্ষণ, ১৩টি গণধর্ষণ এবং ৮টি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এ মাসে ৪০৫ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ‘আমরাই পারি’র চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, দেশে ৪৪২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭৭ জন। হত্যা করা হয়েছে ১০৭ জনকে। আত্মহত্যা করেছে ২৩ জন, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ২৯ জন, বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ২৬ জন, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪ জন, শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪ জন, এসিড সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬টি, অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৬টি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে ৫৬টি।

এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনাই ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ ৬৮টি। এছাড়া সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৪টি। ঢাকা বিভাগে নির্যাতনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তিন মাসে ঢাকায় ২০৯টি, চট্টগ্রামে ৫৩টি, বরিশালে ৪৯টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনাতে ৩৩টি, রংপুরে ২৪টি, ময়মনসিংহে ২০টি এবং সিলেটে ১৮টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।