Amar Praner Bangladesh

দেশে চলছে ঋণ করে ঘি খাওয়ার উন্মাদনা

 

(বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কাছে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে ইদানীং ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় সক্ষমতা অর্জিত না হওয়ায় বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের ঋণ বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশের জনগণের মাঝেও বেড়েছে ঋণ প্রবণতা। মানুষের সার্বিক সমস্যাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রতারকরা ঋণ দেওয়ার নামে নিচ্ছে মোটা অংকের সুদ।)

 

শের ই গুল :

 

এতো টাকা আয় করেন, টাকা যায় কই? মনে তো কোন শান্তি নেই, টেনশন আর টেনশন। আমেরিকার মানুষ এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার লোনে ডুবে আছে। বাংলাদেশে যারা শহরে থাকেন, ও সারা বছরের আয় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা, তাদের প্রত্যেকের প্রায় ৩-৪ লক্ষ টাকার লোন রয়েছে। এই টাকা কিভাবে শোধ দিবেন, সেই চিন্তা প্রতিনিয়ত আমাদের অসুস্থ করে তুলছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশ যে ঋণ করেছে আগামী তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ দ্বিগুণ হবে।

ঋণ পরিশোধে কখনো ব্যর্থ হয়নি বাংলাদেশ। সামনেও বিপদের আশঙ্কা নেই। তবে মুদ্রা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এ যাবৎ বৈদেশিক ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪০২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রাচীন ভারতীয় চার্বাক দর্শনের এই কথাটি বেশ প্রচলিত যে ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ, যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ’। যার অর্থ, ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যত দিন বাঁচো সুখে বাঁচো। ট্যাঁকে টাকা নেই বলে বিলাস-ব্যসন বন্ধ থাকবে কেন? এই দর্শনে ধার করে ঘি খাওয়ায় উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চার্বাকবর্ণিত নীতি বেশ বিপজ্জনক। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে তো আরও বেশি। বিশ্বজুড়েই সামগ্রিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থায় ধার করে ঘি খেলে পরিণতি কী হতে পারে আমাদের চোখের সামনে শ্রীলঙ্কা তার দৃষ্টান্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে নেওয়া কঠিন শর্তের ঋণগুলোই বেশি ভোগাবে। এ তিন দেশের কাছ থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণচুক্তি হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সুদ, আসলসহ এ বিপুল অঙ্কের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। দায় বেড়ে যাওয়ায় আগামী তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। সাধারণত বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে ঋণ নিলে ৩০ থেকে ৪০ বছরে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু সুদের হার প্রায় কাছাকাছি হলেও চীন, রাশিয়া ও ভারত তিন দেশের ঋণ পরিশোধ করতে হবে এর অর্ধেক সময়ে। এ তিন দেশের ঋণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল, শাহজালাল সার কারখানা, দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

এসব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের আসল, সুদসহ ২০১ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছে ইআরডি। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সংকটে পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কঠিন শর্তের ঋণগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখনই বড় বিপদের শঙ্কা নেই। তবে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, কঠিন শর্তের এসব ঋণ নেওয়ায় কয়েক বছর পরই ঋণ পরিশোধে বাড়তি চাপ আসবে, এটা অবধারিত। চীন, রাশিয়া ও ভারতের ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে প্রতিবছর গড়ে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হবে। হঠাৎ করে যেন বাড়তি ঋণ পরিশোধের চাপ না আসে, সেই মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। বর্তমান বিদেশি মুদ্রার মজুত ব্যবস্থাপনাও ঠিক করতে হবে। বছরে গড়পড়তায় ঋণ পরিশোধের হিসাব থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি ঋণের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রীলঙ্কার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ২০২৬ সাল থেকে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধ শুরু- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৩ সালে শেষ হবে। এ প্রকল্পে খরচ হচ্ছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার বা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে।

২০১৬ সালের ২৬ জুলাই রাশিয়ার সঙ্গে এ ঋণচুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত হলো ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড। এর মানে, ২০২৬ সাল থেকে পরের ১০ বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। লন্ডন ইন্টারব্যাংক লেনদেন হার বা লাইবরের সঙ্গে পৌনে ২ শতাংশ সেবামাশুল দিতে হবে। লাইবর সাধারণত আড়াই থেকে ৩ শতাংশ হয়। গত মার্চ মাস পর্যন্ত ৪৫২ কোটি ডলার ছাড় করেছে রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে আপাতত এ ঋণের লেনদেন বন্ধ আছে। চার বছর পর থেকেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। দুই কিস্তিতে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। ২০৩৬ সালে এ ঋণ শেষ হবে। চীনের অর্থায়নে ১২ প্রকল্প- ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে ১২টি প্রকল্পের জন্য চীনের সঙ্গে ১ হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে সড়ক টানেল নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

এ প্রকল্পে সব মিলিয়ে ১৯৫ কোটি ডলার দিয়েছে চীন। প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি অর্থবছর ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বাকি প্রকল্পগুলোর অন্যতম হলো কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহু লেন সড়ক টানেল নির্মাণ, শাহজালাল সার কারখানা, দাশেরকান্দি পয়োবর্জ্য শোধনাগার, ইনফো সরকার-৩, মডার্নাইজেশন অব টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কানেকশন, বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও বিতরণ ও সম্প্রসারণ ইত্যাদি। ঋণের সিংহভাগ অর্থ ছাড় হয়ে গেছে। চীনের ঋণের একটি ছাড়া বাকি ১১টির সুদের হার সোয়া ২ শতাংশ এবং গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৫ বছর। ইতিমধ্যে শাহজালাল সার কারখানা, পদ্মার পানি শোধনাগার ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এ তিন প্রকল্পে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের মতো ঋণ পরিশোধ হয়েছে। বাকি প্রকল্পগুলোর চলতি বছর ও আগামী বছর থেকে শুরু হয়ে আগামী ১০ বছরে সব অর্থ পরিশোধ শুরু করতে হবে। ভারতের ঋণ ৭৩৬ কোটি ডলার- তিনটি লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায় গত এক যুগে ৭৩৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। ভারতের ঋণের পরিশোধের সময়সীমা গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর।

সুদের হার ১ শতাংশ। তবে শর্ত হলো ভারতীয় ঋণের প্রকল্পে অন্তত ৬৫ শতাংশ কেনাকাটা ভারত থেকে করতে হবে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টির বেশি প্রকল্প চলছে। এ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি ছাড় হয়েছে। ইতিমধ্যে ১০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ হয়েছে। আর কোনো ঋণ না নিলে ২০৩২ সালের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সব মিলিয়ে গত ১০ বছরে রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ৯৪ টাকা ৭০ পয়সা ধরে) টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৩ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। মোটাদাগে এসব প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হলে আগামী তিন-চার বছর পর থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। কোনো দেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি করার সময় অর্থ পরিশোধের একটি মেয়াদ নির্ধারণ করা দেওয়া হয়। এ মেয়াদের মধ্যে একটি গ্রেস পিরিয়ড থাকে। ওই গ্রেস পিরিয়ডে ঋণের কিস্তির সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হয় না। কঠিন শর্তের ঋণ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার মতো আমরা ভুল করব না।

অর্থনীতি পরিচালনায় আমরা তুলনামূলক কম ভুলভ্রান্তি করেছি। সম্প্রতি চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছ থেকে কঠিন শর্তে (ঋণ পরিশোধের সময় ২০ বছর) ঋণ নিলেও তা পরিশোধে তেমন সমস্যা হবে না। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত চাহিদা অনুযায়ী আছে। সার্বিকভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনীতির নিজস্ব শক্তিমত্তা ও স্থিতিশীলতা আছে।’ ২০২৯ সালে সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ- এদিকে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক প্রতিবেদনে নতুন ঋণচুক্তি না হলে, শুধু পাইপলাইনে থাকা প্রতিশ্রুতি থেকে ঋণ পেলে এবং আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হবে এবং ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ কত, তা দেখানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সব মিলিয়ে ২৭৮ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ৫১৫ কোটি ডলার খরচ হবে। এরপর ঋণ পরিশোধ কমতে থাকবে। বিদ্যমান ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী তিন বছর বাংলাদেশের ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্রমপুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৮ হাজার ৫২৪ কোটি ডলার। তবে ২০২৯-৩০ অর্থবছর নাগাদ তা কমে ৭ হাজার ২৯১ কোটি ডলার হবে।

এ হিসাব করতে সাম্প্রতিক ডলারের দামের ওঠানামা আমলে নেয়নি ইআরডি। এদিকে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের মতো পাইপলাইনে আছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ৪ লাখ ৪০ কোটি টাকা টাকার মতো। অন্যদিকে দেশের মানুষ জ্বালানি তেল সহ অন্যান্য দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে হয়ে পড়ছে দিশেহারা। আমাদের অনেকেই যখন ১৫ হাজার টাকা বেতন পেতাম, তখনকার অবস্থা আর আজ দেড় লক্ষ টাকা বেতন পেয়েও অবস্থা একই। কারন খরচটা বেড়ে গেছে। বেড়েছে পন্য আসক্তি ও পন্য দাসত্ব। আর বোকা এক শ্রেনীর মানুষ খুব সহজেই এতে পা দিচ্ছেন। যে টাকা আপনার না, ক্রেডিট কার্ডের নামে আপনি সেই টাকা খরচ করছেন। বিয়ে করবেন? কিস্তিতে মিলছে সব ফারনিচার, হানিমুনে যাবেন? বাকিতে বার্লি যান। টিকিট বাকিতে কেনেন। একটা ক্যামেরা নিবেন না? কিনেন বাকিতে? কিস্তি তো আছে। অল্প অল্প করে দেবেন। আমরা প্রথমে সেই ফাদে পা দেই। ধরেন, আপনি ৮০০০০ টাকা বেতন পান। ফুটানী মেরে বিয়ে করতে গিয়ে ধার করেছেন তিন লাখ।

এবার বার্লি যাচ্ছেন বাকিতে। মাসে কিস্তি ৭০০০ টাকা মাত্র। বাসায় পাতলা টিভি এনেছেন। ওখানে কিস্তি আর ৫০০০টাকা। বাসা ভাড়া দেন ৩০ হাজার। মাসে দুই চারবার বোগো খেয়ে পোস্ট দিয়ে ফুটানী মারেন। কিন্তু টাকা আর শোধ হয় না। কিভাবে টাকা শোধ দিবেন এই নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তা। মন ভালো থাকে না। মেন্টাল শান্তি নাই। সামনে গরম কাল, এসি লাগাতে হবে ঘরে। আপনার মাথায় ঢুকে গেছে এসিই আপনার চোখে ঘুম এনে দিবে। স্যার, বাকিতে এসি নেন। পরে আস্তে আস্তে শোধ করে দেবেন। বাকি বোঝা আরেকটু বাড়লো। এর মাঝে আপনার বউ প্রেগন্যান্ট। তাকে ডাক্তার দেখাতে হবে।

বেতনের টাকা ভাড়া আর কিস্তি দিতে দিতে শেষ। এবার নতুন পরিশরে, কিস্তি আর কার্ড দিয়ে আর কুলাচ্ছে না, এবার ধার করতে হবে। নিজের ইমেজের ১২টা বাজিয়ে নিলেন ধার। বললেন ২০ দিন পর শোধ দেবেন। কিন্তু ২০ দিনে আপনার আয় বাড়বে কি? নাকি আবার ধার করবেন। ২০ দিন পেরিয়ে ২২ দিন হতে গেল। এবার বন্ধু আপনাকে ফোন দিলো। আপনি ভাবলেন কি মিথ্যা অজুহাত দেয়া যায়। আচ্ছা দিলেন একটা কিছু। আপনার মিথ্যা বলার হাতে খড়ি। আপনি টয়লেটে গেলে বলেন মতিঝিল, আর মতিঝিল গেলে বলেন পীরের বাগ। ঠিক পলাতক আসামীর মতো। এদিকে আবার এনিভারসারি, ফুটানী মেরে একটা কিছু তো কিনতেই হবে। আগের বন্ধু আর না, এবার চাইবো কলিগের কাছে। ওমা, ওয়াইফের ডেলিভারী ডেট আসন্ন। পাচ তারকা মানের হাসপাতালে যেতে হবে। এবার আত্মীয়ের থেকে টাকা ধার করি। নাহ, এতো টেনশন আর নিতে পারছি না।

এবার আপনার বাবার অবসরে যাওয়ার পর যে কয়টা টাকা পেয়েছে তার দিকে নজর। তাই নিয়ে তুমুল ঝগড়া। বাবা শেষ মেশ কিছু টাকা দিলেন। কিন্তু হায়, আজ আবার পল্টুটার জন্মদিন। আবার ফুটানী মারার চেস্টা, যা নেই তা নিয়ে বড়াই করা ও শো অফের চেস্টা। যে টাকা আপনার না, যে টাকা আপনি কামাই করেন নাই, তাই খরচ করা আবার নতুন করে শুরু। কি যে ভয়ানক এই সাইকেল, তা কেবল মাত্র এই সাইকেলে যারা পড়েছেন, তারাই জানেন। অনেক বাবা মা সন্তানের জন্যে কিছু করার তালে ফ্ল্যাট কেনাকে জীবনের লক্ষ্য করে ফেলেন। বাবা মা হিসেবে সন্তানকে ভালো মানুষ করার লক্ষ্য দিতে হবে। আপনি নিজেই যদি তাকে ফ্লাট করে দেন, তাহলে সে আর করবেটা কি? আয় বুঝে খরচ করুন। অপচয় ও ফুটানী ধর্মীয় দিক বিবেচনায়ও নিষিদ্ধ।

আপনি কি মনে করেন, আপনার এই জীবন যাপন আজ থেকে ২০০ বছর পর আপনার পরের জেনারেশন মনে রাখবে? তারা কি আপনার মতো নিঃস্ব, কিস্তি জর্জরিত, ঋণগ্রস্থ মানুষকে মনে রাখবে? বড়শি দিয়ে মাছ যেমন ধরা হয়, নেড়ে চেড়ে আধার খেতে দেয়, গলায় বিধে নিলে আর নিস্তার নাই। মানুষের সার্বিক সমস্যাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রতারকরা ঋণ দেওয়ার নামে নিচ্ছে মোটা অংকের সুদ। অনেকে এমএলএম ব্যবসার ফাঁদ পেতে টাকা দ্বিগুণ করবে মিথ্যা বুঝিয়ে নিঃস্ব করছে জাতিকে। কিছু লোভী প্রকৃতির লোক এদের ডাকে সাড়া দিয়ে একসময় হায় হায় করে। খাচার পাখি ভালো খেতে পায়, কিন্তু জীবনটা থাকে বন্দী। তেমনি ঋণ যে করে তারও নিজের উপর আর নিজের কন্ট্রোল থাকে না। ভালো হয় নিত্য দিন দানের অভ্যাস করুন। যে দান করে তার হাত উপরে থাকে আর যে ঋন করে বা হাত পাতে তার হাত থাকে নিচে।