শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৩, ০৮:০৩ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সৌদিতে পাচারকালে ৩০ লক্ষ ইয়াবা ট্যাবলেট আটক, গ্রেফতার ২ রাজশাহীর বানেশ্বর-পাবনার ঈশ্বরদী সড়কের নির্মাণ কাজে গতি নেই নীলফামারী ডোমারে ওয়াজ মাহফিল থেকে ফেরার পথে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ, ধর্ষক গ্রেফতার অভাবে বিক্রি করে দেওয়া নবজাতক শিশুকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলেন টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ টঙ্গীতে জাতীয় পর্যায়ে শিশু কিশোর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শেরপুরে ৬ কেজি গাঁজাসহ ২ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার কুমিল্লা আইএইচটি এন্ড ম্যাটস-এ স্বরস্বতী পূজা উদযাপন রাজধানী শ্যামলী আদাবর থানার অন্তর্গত হোটেল বৈশাখীতে চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ চার পুলিশ কর্মকর্তার অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি গাজীপুর জেলা কৃষকলীগের সহ সভাপতি মোঃ আজহার আলী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক

দেশে ব্যাংক ঋণ লুটপাট বিত্তবান হওয়ার লোভনীয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ২৯ Time View

 

(বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন কোনো ক্ষেত্র আজ নেই যেখানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়নি। এটা ঘটেছে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এই দুর্নীতির অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এটা শুধু শীর্ষ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, মহামারীর মতো।)

 

শের ই গুল :

 

প্রতি বছর ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। লুট হওয়া অর্থের সিংহভাগই পাচার হচ্ছে বিদেশে। বিভিন্ন চ্যানেলে টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সব মিলে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। ব্যাংক লুটের বড় একটি অংশ মানি লন্ডারিং প্রক্রিয়ায় দেশের অর্থনীতিতে ফিরে আসছে।

এসব কারণে দেশের আয় ও ধন বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলেও এদেশের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের মতামত এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেমিনারের মূল প্রবন্ধকার অধ্যাপক মইনুল ইসলামের প্রবন্ধ থেকে এখানে কিছুটা উদ্ধৃত করতে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘কয়েক হাজার ধনাঢ্য রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে ব্যাংকিং খাত পুঁজি লুটপাটের আকর্ষণীয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়া। রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে অধিকাংশই ঋণ ফেরত দিচ্ছে না।

ঋণ ফেরত না দেয়ার বিষয়টি এখন ক্রমশ দুরারোগ্য ক্যান্সারে পরিণত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তির প্রবৃদ্ধি হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। ২০১২-১৭ সাল পর্যন্ত এদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের সম্পদের বড় একটি অংশ তাদের হাতে চলে যাওয়ায় ধন বৈষম্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ২০২০-২১ ও ২০২২ সালে। ধনাঢ্য ব্যক্তি সাজতে গিয়ে অনেকেই দুর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছেন। অনেক সরকারি-আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা অর্থ দুর্নীতিবাজদের পরিবারের সদস্যদের অতি দ্রুত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেশ থেকে পুঁজি পাচারকারী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের অধিকাংশই গার্মেন্টস মালিক। কিন্তু এ খাতের ৪৫ লাখ শ্রমিক আগের মতোই দরিদ্র রয়ে গেছেন।

এছাড়া মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের মালিক ও টরেন্টোর বেগমপাড়ার বাড়ির মালিকদের মধ্যেও দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল আমলা ও রাজনীতিবিদ আছেন। দেশের অর্থনীতির শীর্ষদেশ যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের দ্বারা দেশের অর্থনীতি কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার একটি স্পষ্ট ধারণা উপরে উদ্ধৃত বক্তব্যের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। এদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তির প্রবৃদ্ধি বিশ্বের মধ্যে সব থেকে বেশি হওয়ার প্রধান কারণ এখানে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা এখন ব্যবসায়ীদের হাতে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের বিপুল অধিকাংশই এখন ব্যবসায়ী, যা দুনিয়ার অন্য কোনো দেশে নেই।

রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে এই ব্যবসায়ীরা এখন দেশে বেপরোয়া লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কেউ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন কোনো ক্ষেত্র আজ নেই যেখানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়নি। এটা ঘটেছে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এই দুর্নীতির অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এটা শুধু শীর্ষ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, মহামারীর মতো। এর ফলে অর্থনীতির একেবারে নিচের স্তর পর্যন্ত দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়েছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় এ ধরনের অপরাধের রিপোর্ট ভূরি ভূরি পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডক্টর ফরাস উদ্দিন বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি, দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকানো না গেলে আয় বৈষম্য কমবে না। সুযোগ থাকার কারণেই দেশে আয় ও ধন বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে আমানত নেয়া হয় ৩ মাসের জন্য। কিন্তু ঋণ দেয়া হয় দীর্ঘদিনের জন্য। বিদেশি একটি দাতা সংস্থার পরামর্শে ব্যাংকিং খাতে এ পদ্ধতি চালু হয়। যে কারণে আজ এ খাত ধ্বংসের মধ্যে পড়েছে। এই বিদেশি দাতা সংস্থাটি হচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এর থেকে বোঝার উপায় নেই কিভাবে সাম্রাজ্যবাদী শোষণকাণ্ড আমাদের অর্থনীতির ওপর তার থাবা বিস্তার করে রেখেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী লোকদের শতকরা হিসাবে সংখ্যা কমে এলেও মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার লাঘব হয় না। বাংলাদেশই তার প্রমাণ।

এর অন্যদিক প্রসঙ্গে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল বারাকাত বলেন, ‘জিডিপির প্রবৃদ্ধি হার ডাবল হলেও লাভ হবে না, যদি এর সুফল নিচের দিকে না যায়। বৈষম্য নিরসন করতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার। রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকার দরকার। বৈষম্য নিরসনে সামাজিক সেবা খাতগুলোকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে না।’ আবুল বারাকাত এখানে এটা যাবে না বললেও ঠিক এর উল্টো কাজটিই এখন হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রের শক্তি যাই হোক, শোষণ এবং আয় বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো শক্তিশালী ভূমিকা তো দূরের কথা, কোনো ভূমিকাই এখানে নেই। উপরন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করেই এখানে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দেশে এক ব্যাপক ও বেপরোয়া লুটতরাজের রাজত্ব কায়েম করেছে।

দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তার সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এ উপলব্ধির কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন বা রাষ্ট্রের ভূমিকার পরিবর্তন ছাড়া সংকট উত্তরণের পথ নেই। কিন্তু সঠিক পথ কী এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা না থাকায় তাদের কথাবার্তার মধ্যে হতাশার ভাব সহজেই লক্ষণীয়। দুর্নীতি সংক্রামক ব্যাধির মতো। এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে শক্তিশালী হলে অর্থনীতি ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রই নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো ক্ষেত্রই এর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায় না। এর সর্বশেষ উদাহরণ হল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বর্তমান সময়ের রিপোর্ট। এতে বলা হয়েছে, ‘ঢাকার আশপাশের থানাগুলোতে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলির ক্ষেত্রে ঘুষের অঙ্ক ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ভূমির দলিল নিবন্ধনে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থ (ঘুষ) লেনদেন করতে হয়। ভূমি অফিসে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রাপ্তিতে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। নকলনবিস থেকে মোহরার পদে যোগদানে ৮ লাখ, মোহরার থেকে সহকারী পদে যেতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়।

বাংলাদেশে ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপের কথা দুদকের থেকে এই প্রথম বলা হচ্ছে না, বহুবার এ ধরনের কথা তারা বলেছেন। কিন্তু তাদের দ্বারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কিছুই করা সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ সব দুর্নীতিই হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা অথবা তাদের পৃষ্টপোষকতায়। দুর্নীতি দমনে যাদের নিয়ামক ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, তারাই যখন দুর্নীতির মধ্যে ডুবে আছে এবং দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করছে প্রত্যেক ক্ষেত্রে ও ব্যাপকভাবে, তখন দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের করার যে কিছুই থাকে না এটা বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না। যারা এভাবে চুরি, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে চালান করছে, তাদের মধ্যে বিপদের মুখে দেশছাড়ার পরিকল্পনাও আছে।

তাছাড়া এই দুর্নীতিবাজরা জানে যে, আগের মতো সুইস ব্যাংকে টাকা জমা করলেই কাজ হয় না। কাজেই এখন তারা তাদের দুর্নীতিলব্ধ টাকা দিয়ে বিদেশে জমি-জায়গা-সম্পত্তি কিনছে, বাড়িঘর তৈরি করছে। মালয়েশিয়ায় তারা বড় আকারে বাড়িঘর বানিয়ে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেছে। কানাডার টরেন্টোয় তারা বেগমপাড়া নামে একটি এলাকায় একইভাবে বাড়িঘর করেছে। এছাড়া আমেরিকাসহ অন্য অনেক দেশেও অনেকে বাড়িঘর বানিয়ে রেখেছে।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category