Amar Praner Bangladesh

দেশে বড়লোক চোরদের সিন্ডিকেটে গরীব মরছে ধুকে ধুকে : মধ্যবিত্তরা অসহায়

 

(সিন্ডিকেটের থাবা চালের বাজারে। বড় বড় মিলাররাই এলসি দিয়ে কম দামে চাল আমদানি করে আবার নিজেদের ব্র্যান্ডেই বেশি দামে বিক্রি করে। ফলে আমদানিতেও লাভ তাদেরই থাকে। যেভাবে চালের বাজার বড় কোম্পানিগুলোর দখলে যাচ্ছে তাতে চালের দাম আর কমবে বলে মনে হচ্ছে না।)

 

শের ই গুল :

 

জানা গেছে, বাজারে বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের ব্র্যান্ড চাষী, এসিআই গ্রুপের পিওর, টিকে গ্রুপের পুষ্টি, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ, ইস্পাহানি গ্রুপের পার্বণ, বাংলাশে এডিবল অয়েল গ্রুপের রূপচাঁদা, আকিজ গ্রুপের অ্যাসেন্সিয়াল, সিটি গ্রুপের তীর, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ, র‌্যাংগস গ্রুপের নবান্ন চাল বিপণন করছে। ধান থেকে চাল রূপান্তর ও বিপণন খাতে দেশের এসব বড় শিল্প গ্রুপ বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে চালের বাজারে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে।

এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছে দেশের কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ। তারা উত্তরবঙ্গভিত্তিক চালের চাতাল ও মিল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে চালের দামও নির্ধারণ করছে। আর এ কারণে ছোট মিলাররাও ব্র্যান্ডের চালের দামের অনুপাতে তাদের চালও বাড়তি দামে বাজারে ছাড়ছে। এভাবেই চালের দাম বাড়ছে। চালের দাম বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে সোসাইটি অব জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন চৌধুরীর সাথে কথা হলে তিনি জানান, রক্তচোষা বড়লোকদের সিন্ডিকেটের কারণে দেশের গরীব মরছে ধুকে ধুকে, মধ্যবিত্তরা অসহায় হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে যারা দিন আনে দিন খায়, তাদেরকে প্রতিনিয়ত সংসার চালাতে গিয়ে মানসিক হতাশা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। কারণ তার আগের আয়ের সাথে বর্তমান আয়, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, ব্যয় বহুল জীবনযাত্রা তার জীবনে নতুন ভাবে সংগ্রাম এনে দিয়েছে। যা সম্পূর্ণ করতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপণ্য চাল নিয়ে চালবাজি চলছে বহুদিন ধরেই। বর্তমানে অসহনীয় পর্যায়ে বেড়েছে মোটা-সরু সবরকমের চালের দাম। চালের বাজার অস্থির হওয়ার পেছনে সাধারণ ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিল মালিক ও করপোরেট সিন্ডিকেটকে। দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট কোম্পানিগুলোর অতি মুনাফা লাভের প্রবণতা এ খাতকে অস্থির করে তুলছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বলে জানা গেছে। আধুনিক বিপণন পদ্ধতিতে এসব প্রতিষ্ঠান আকর্ষণীয় মোড়কে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা করপোরেটরদের ব্র্যান্ড ভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে বেশি দামে চাল বিক্রি করছে। এর ফলে লাভবান হচ্ছে করপোরেট কোম্পানি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। বিপাকে পড়ছে সাধারণ ভোক্তা। এদিকে, অভিযোগ রয়েছে বড় বড় কোম্পানিগুলো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে ধানের মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে মজুত করছে। আবার বাজারে ধানের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চালের দামও বাড়াচ্ছে তারাই।

সরকারের নিয়মিত মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবেই মূলত বেপরোয়া হয়ে উঠছেন করপোরেট ব্যবসায়ী ও মিলমালিকরা। ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশ চাহিদার তুলনায় কম চাল উৎপাদন করে। এ অবস্থায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ধানের মজুদ করে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে চালের বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্রামগঞ্জে মিল ও চাতাল মালিকদের ধান সংগ্রহকালে অর্থাৎ মৌসুমের শুরুতে চালের দাম বেড়ে যায়। বড় কোম্পানিগুলো ধান সংগ্রহ কার্যক্রম বাড়ালে সরকারই চাহিদা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ করতে পারবে না। ফলে দেশের বাজারে চালের দাম আরও অনেক বেশি বাড়বে। এসব সংকট মোকাবিলায় বড় কোম্পানিগুলোর চাল বিপণন কার্যক্রমের জন্য সরকারি নীতিমালা চাইছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। সরেজমিন বিভিন্ন মার্কেট ও সুপারশপ ঘুরে জানা গেছে, দেশের বড় বড় কোম্পানি বহু আগে থেকেই সুদৃশ্য মোড়কে সুগন্ধী চাল বাজারজাত করছে। বর্তমানে পলিপ্যাকে পাঁচ ও দশ কেজির সরু চাল বিক্রি করছে তারা। এছাড়া পাটের বস্তায় ২০ কেজি, ২৫ কেজি ও ৫০ কেজির চাল বিপণন করছে।

মিনিকেট, নাজিরশাইল বা কাটারিভোগ যেটাই ভোক্তার প্রয়োজন, তারা সেটাই দিচ্ছেন ক্রেতার হাতের নাগালে। সুপারশপ ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, ব্রান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো চালকে তাদের অন্যান্য কনজিউমার পণ্যের মতোই বিবেচনা করে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করছে। পাইকারি বাজারগুলোয় কাজ করছে চৌকস ও দক্ষ বিপণন কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশাল টিম। যারা ছোট-বড় দোকান ঘুরে ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন এবং নিজেদের ব্র্যান্ডের চাল নিজ দায়িত্বে পৌঁছে দিচ্ছেন। ফলে চাল কিনতে এখন আর মোকাম, আড়ত কিংবা পাইকারি বাজারে যেতে হচ্ছে না খুচরা ব্যবসায়ীদের। পাইকারি বাজারে যাওয়ার ঝক্কি এড়াতে খুচরা বিক্রেতারা বড় কোম্পানির ব্র্যান্ডেড চাল বিক্রিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এদিকে পাইকারি বাজারগুলোয় দেখা গেছে, আকিজ, এসিআই, প্রাণ, রশিদ, মজুমদার, এরফান, দেশ অ্যাগ্রো, তীর, সিরাজ, নজরুল, মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের চালের সরবরাহ বেশি।

বর্তমানে পাইকারিতে ব্র্যান্ড ভেদে মিনিকেট চাল ৫৯ থেকে ৭০ টাকা, নাজিরশাইল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, বাসমতি ৭০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত কেজি বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে মোটা চালের দাম পাইকারিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে পাইকারি থেকে কেজি প্রতি ৬ থেকে ৮ টাকা বেশি ধরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণ গ্রুপের ঊর্ধ্বতন এক সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার জানান, প্রাণ প্রথম মোড়কজাত সুগন্ধী চাল বাজারে আনে ১৯৯৭ সালের দিকে। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সুগন্ধী চাল মোড়কজাত করে বিপণন করছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো সুগন্ধী চালের পাশাপাশি এখন প্রতিদিনের ভাতের জন্য বিভিন্ন গ্রেডের স্বর্ণা, আটাশ, জিরা মিনিকেট, নাজিরশাইল, বাসমতি, মিনিকেটসহ বিভিন্ন নামে চাল মোড়কজাত করে বিক্রি করছে। মোড়কজাত এসব চালের দাম কিছুটা বেশি হলেও নিজস্ব বিপণন কৌশলের কারণে ভোক্তারাও আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্র্যান্ডের চাল কিনতে। সিটি গ্রুপের ব্র্যান্ড তীর চালের বিপণন কর্মকর্তা রানা জানান, তাদের কোম্পানি মোটা, সরু, নাজির, পাইজাম, সুগন্ধীসহ বিভিন্ন চাল সরবরাহ করে। এসব চালের চাহিদা বেশি থাকায় দামও একটু বেশি থাকে বলেও জানান তিনি। আসন্ন ঈদে তাদের প্রচুর চালের মজুদ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

রাজধানীর বাবুবাজার ও যাত্রাবাড়ি-টঙ্গী চালের আড়ত মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের পাইকারি বাজারে চাল বিপণন পদ্ধতি হচ্ছে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন মিল ও চাতালের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিনের নির্ধারিত বাজারমূল্যে চাল কিনে নেয়া। বাকি বা নগদ দামে কিনে নেওয়া এসব চাল আড়তে এনে বাজারমূল্য অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে বিক্রি করা হয় ক্ষুদ্র পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে। এ পদ্ধতিতে চালের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল থাকে।

সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আর সরবরাহ কমতে শুরু করলে দামও বেড়ে যায়। বর্তমানে চালের আমন মৌসুমেও বাজারে চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তারা করপোরেটরদের দায়ী করে জানান, এ সময়টাতে চালের দাম কমার কথা। অথচ মিল গেটে দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বড় শিল্প গ্রুপগুলো চাল বিপণনে আসার পর তাদের বাকিতে চাল কেনার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। ফলে সংকটকালে দেশের সরবরাহ চেইনকে স্থিতিশীল রাখা যাবে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া ধানের উত্তোলন মৌসুমে দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসার জন্য আলাদা করে চাল সংগ্রহ শুরু করলে চালের সংকট তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গত ১০/১২ বছরে দেশের বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো চালের দাম নিয়ে কারসাজি করছে বলেও অভিযোগ করেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তারা এসব কোম্পানির এ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে সরকারের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। এ বিষয়ে পাইকারি চাল সরবরাহকারী রমজান মিয়া বলেন, ‘করপোরেট কোম্পানিগুলোর চাল বিপণন কার্যক্রমের কারণে চালের বাজার অস্থির হয়ে আছে। তাদের অতি মজুদদারি নীতির কারণে বাজারে ধানের কৃত্তিম সংকট লেগেই রয়েছে। এ জন্য ছোট মিলাররা বাকিতে ধান কিনতে না পারায় চালের সরবরাহ এসব কোম্পানির হাতেই চলে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করপোরেটরদের মতো সামনের সারির কয়েকজন মিল মালিকও আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে যে পরিমাণ চালের মজুদ করেছে তা দিয়ে দুই মাস সারাদেশের মানুষের চালের চাহিদা পূরণ হতে পারে।’

যাত্রাবাড়ীর ভাই ভাই চালের আড়ত মালিক মিলন বলেন, ‘চালের মজুদ ও সরবরাহ প্রচুর থাকার পরও অজানা কারণে প্রতিদিনই চালের দাম বাড়ছে। চালের ভরা মৌসুমেও মিল গেটে চালের দাম বেশি থাকায় আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাজারে বড় বড় কোম্পানিগুলোর চালের সরবরাহ বেশি। তাদের চালের মানও ভালো। তাই একচেটিয়া ব্যবসা করছে করপোরেট কোম্পানিগুলো। যেভাবে চালের বাজার বড় কোম্পানিগুলোর দখলে যাচ্ছে তাতে চালের দাম আর কমবে বলে মনে হচ্ছে না। চাল আমদানির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘চালের দাম কমানোর জন্য চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রতি বছরই। এ নিয়েও রয়েছে নানা ফাঁকিবাজি। বড় বড় মিলাররাই এলসি দিয়ে কম দামে চাল আমদানি করে আবার নিজেদের ব্র্যান্ডেই বেশি দামে বিক্রি করে। ফলে আমদানিতেও লাভ তাদেরই থাকে।