Amar Praner Bangladesh

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের

 

 

(নিম্ন আয়ের মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাজার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নয়, ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে বেকায়দায় রয়েছে সরকার। খোদ ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর ধারণা করছে, অবৈধ মজুতের পরিমাণ অন্তত ৪০ হাজার টন।)

 

শের ই গুল :

 

সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও তার প্রতিফলন তেমন নেই। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বারবার সিন্ডিকেটের কথা বলা হলেও এর নেপথ্যে যারা তাদের নাম উঠে আসে না। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। ছোট ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করেই ছেড়ে দেওয়া হয়। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কিছুটা হলেও ম্লান হচ্ছে। সাধারণ মানুষও এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

৮ দিনে প্রায় তিন লাখ লিটার তেলের অবৈধ মজুত জব্দ। গত কয়েক মাসে দফায় দফায় বেড়েছে ভোজ্যতেলসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম। গত দুবছর ধরে চলা করোনার অভিঘাত, ইউক্রেনযুদ্ধসহ নানা কারণে বৈশ্বিক পর্যায়ে পণ্যমূল্য বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। ভোজ্যতেলের ‘সিন্ডিকেট’ ব্যাপকহারে অবৈধ মজুত গড়ে তুলেছে। পেঁয়াজের দামও বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি চাল, ডাল, চিনিসহ প্রায় সব ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বারবার ব্যবসায়ীদের প্রতি আহবান জানাচ্ছে, কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে। কিন্তু তা সামান্যই কাজে আসছে। বাণিজ্যমন্ত্রী দফায় দফায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কিন্তু বাজারে তার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। চলতি মাসেই দেশজুড়ে প্রশাসনের অভিযানে কয়েক লাখ লিটার ভোজ্যতেলের মজুতের সন্ধান মিলেছে। খোদ ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর ধারণা করছে, অবৈধ মজুতের পরিমাণ অন্তত ৪০ হাজার টন।

এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের প্রতি গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। নিম্ন আয়ের মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাজার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নয়, ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে বেকায়দায় রয়েছে সরকার। ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিসিবির পণ্য সরবরাহ বাড়লেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। ‘সিন্ডিকেট’ ভেঙে দিয়ে মজুতদারদের আইনের আওতায় আনার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

বিশ্ববাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বেশ কয়েকবার মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্ত হয়েছিলেন ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিল মালিকরা। তবে নতুন করে তা বাড়াতে রাজি হয়নি সরকার। উল্টো তেলের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে দাম কিছুটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। পাশাপাশি রোজা চলাকালীন সময়ে দাম না বাড়ালেও ঈদের পর বাজার পর্যালোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে, এই মাসের শুরুতে ঈদের আগে খুচরা বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় সয়াবিন তেল। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সায় নিয়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪০ টাকা বাড়িয়ে ২০০ টাকার কাছাকাছি নির্ধারণ করেন মিল মালিকরা। গত দুই বছরে করোনায় অভিঘাতে দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ সে ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি। সরকার বিপুল প্রণোদনার মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

এরমধ্যেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। সিন্ডিকেট করে তারা প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। দেশজুড়ে প্রশাসনের অভিযানে প্রতিদিনই হাজার হাজার লিটার অবৈধ মজুতের সন্ধান মিলছে। গতকাল রাজশাহীর পুঠিয়ায় চার গুদাম থেকে মোট ৯২ হাজার লিটার তেল জব্ধ করেছে প্রশাসন। গত শুক্রবার খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় এক ব্যবসায়ীর গুদামে মজুত অবস্থায় ৫৭ হাজার লিটার সয়াবিন তেল পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সয়াবিন তেলের অবৈধ মজুদ এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে তিন প্রতিষ্ঠানকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযানে তিন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে মজুদ করে রাখা ৭৫ ব্যারেল বা ১১ হাজার ৯২৫ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বাজারের সিরাজ স্টোরের তিনটি গোডাউন থেকে ১৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। গত ২ মে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে অভিযান চালিয়ে দুই হাজার লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এভাবে প্রতিদিনই হাজার হাজার লিটার তেল জব্দ করা হচ্ছে। এসব অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও থেমে নেই মজুতদারি। তেল মজুত করে দেশে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি : ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশে যথেষ্ট সয়াবিন তেল থাকা সত্ত্বেও ঈদের আগে-পরে তা দোকানে আসেনি বলে জানিয়েছে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত ১০ দিনে ৪০ হাজার টনের মতো সয়াবিন তেল মজুত হয়েছে বলে ধারণা করছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, একদিকে মিল থেকে তেলের সরবরাহ ও অন্যদিকে ভোক্তারা তেলের নাগাল না পাওয়া সাপ্লাই চেইনের অন্তত ১০ দিনের তেল মজুত হয়েছে। দৈনিক ৫ হাজার টন চাহিদা বিবেচনায় প্রায় ৪০ হাজার টন তেল মজুত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করা ভুল ছিল : বাণিজ্যমন্ত্রী : গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে তেল সংকট প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ঈদের কয়দিন আগে থেকে অনেকে তেল ধরে রাখল। কারচুপিটা এখানে হয়েছে। অনেকে সুযোগ নিয়েছে, কারণ তারা জানে ঈদের পর দাম বাড়বে। সেজন্য তারা মজুদ করে রেখেছিল। রিটেইলার, ডিলাররা সুযোগটা নিয়েছে। তিনি বলেন, রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছিলাম দাম সহনীয় পর্যায় রাখতে। কিন্তু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা আমার অনুরোধ রাখেননি। তাদের অনুরোধ করা আমার বড় ভুল হয়েছে। দায় নিচ্ছেন না ব্যবসায়ী নেতারা বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি ব্যবসায়ীদের দিকে আঙুল তুললেও দায় নিচ্ছেন না তারা। সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, শুক্রবার থেকে তেল নেই, সেটার জন্য তো মিল মালিক দায়ী না। আমরা সার্বিকভাবে আমাদের টিমকে ট্রান্সপোর্ট, সাপ্লাই, ডেলিভারির জন্য ইন্সট্রাকশন দিয়েছি। দাম বাড়ছে পেঁয়াজের : এদিকে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আমদানির জন্য দেওয়া পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আসছে না।

হিলি স্থলবন্দর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্দর দিয়ে সর্বশেষ ৩০ এপ্রিল ৬৮টি ট্রাকে এক হাজার ৯০২ টন পেঁয়াজ এসেছে। এরপর ঈদের ছুটি শেষে ৭ মে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি শুরু হলেও এখন পর্যন্ত নতুন করে পেঁয়াজ আসেনি। বন্দরে আসা পাইকাররা জানান, ঈদের আগে তারা পেঁয়াজ কিনেছেন ১৪ থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে। কিন্তু ঈদের পর দাম চাইছে ২০ থেকে ২২ টাকা কেজি দরে। দাম বাড়ার কারণে পেঁয়াজ কেনা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যেখানে ২০ টাকা কেজি খুচরা বিক্রি করেছি, সেখানে আমাদেরই এখন ২০-২২ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। দেশীয় কৃষকের লোকসানের ঝুঁকি এড়াতে ভারত থেকে পণ্যটির আমদানি বন্ধ রেখেছে সরকার। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হলেও দাম বেড়ে যাচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, আমদানি বন্ধের সুযোগে দেশে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে পেঁয়াজ সিন্ডিকেট। পণ্যটি ব্যাপকহারে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

গত বছর হঠাৎ করেই আমদানি বন্ধ করে দয়ে ভারত সরকার। এতে বাংলাদেশে পণ্যটির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পেঁয়াজের কেজি ২৫০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয়েছে। এ বছরও যাতে কোনো উছিলায় পণ্যটির দাম না বাড়ে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে সরকার। কিন্তু ভারত থেকে আমদানি বন্ধ ও দাম বাড়তে থাকায় অশনি সংকেত দেখছে ভোক্তা সাধারণ। এর আগে হাওরে বন্যার অজুহাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল চালের বাজারও। সরকার তড়িঘড়ি করে পেঁয়াজ ও চাল আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। সেখানেও বেরিয়ে আসে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের তথ্য।

এভাবে বারবার বাজার অস্থির করে তুলছে একাধিক সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খোলা কাগজকে বলেন, আমরা যেখানে যেখানে অভিযোগ পাচ্ছি সেখানে অভিযান চালাচ্ছি। কৃষকের দাম পাওয়ার স্বার্থে সাময়িকভাবে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করা হচ্ছে। তবে গণমাধ্যমে নিউজ করার কারণে অনেক সময় ভোক্তারা অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করে। ফলে দাম বেড়ে যায়।

সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কোন নীতি নৈতিকতা নেই। এজন্য তারা দাম বাড়াচ্ছে। তবে আমাদের তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সিন্ডিকেট যাতে মাথাচাড়া না দিতে পারে সেজন্য ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে।