Amar Praner Bangladesh

নিজেই চলবার পাই না! সংসার চালামু ক্যামনে?

 

 

গিয়াস উদ্দিন রাসেল, শেরপুর :

বিদ্যুতের লাইনম্যানের দিন হাজিরা কাজ করেন বাবুল মিয়া। গত ২ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাস্তার পাশে মই দিয়ে ওঠে বিদ্যুতের খুঁটিতে কাজ করছিলেন তিনি। হঠাৎ একটি অটোরিক্সা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তার মইয়কে ধাক্কা দেয়। এতে খুটির ওপর থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে বাবুল মিয়া। ভেঙে যায় মেরুদন্ডের হাড়সহ শরীরের কয়েকটি হাড়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় স্বজনরা তাকে প্রথমে শ্রীবরদী তারপর শেরপুর এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা। ফিরে আসেন হাসপাতাল থেকে। এখন পড়ে আছেন বিছানায়। পঙ্গুত্ব বরণ করা বাবুল মিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, “যেই দিন আমি কাম করবার পাই না, সেই দিন আমার হাড়ী চুলায় উঠেনা। নিজেই চলবার পাই না! সংসার চালামু ক্যামনে? চিকিৎসা ছাড়াই মরণ লাগবো এহন।”

অভিযুক্ত অটোরিকশা চালক ইব্রাহিম এর বড়ভাই অটোরিক্সা মালিক ই¯্রাফিল ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগীর পরিবার। ফলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। শুক্রবার সরেজমিন গেলে আহত বাবুল, তার স্ত্রী আর মেয়ে তুলে ধরেন পরিবারের কষ্টের কথা। এক দিকে টাকার অভাবে পারছেন চিকিৎসা করাতে। অন্যদিকে সংসারের উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় দিন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে।

জানা গেছে, পৌর শহরের সাতানী মথুরাদি এলাকার মসজিদ সংলগ্ন রাস্তায় বিপুল নামের একজনের বাসার নষ্ট হওয়া বিদ্যুতের লাইনের সারাতে রাস্তার পাশের বিদ্যুতের খুঁটিতে মই লাগিয়ে উপরে উঠে লাইনের কাজ করতে থাকে বাবুল মিয়া। কিছু বুঝে ওটার আগেই মাঝ রাস্তা থেকে নিয়ন্ত্রণ হাঁরিয়ে একটি অটোরিক্সা বাবুল মিয়ার মইটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে উপর থেকে ছিটকে পাকা রাস্তায় পড়ে যায় সে। তাতে তার মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে যায়।

এসময় খুটির নিচে থাকা বাসার মালিক বিপুল আহত হয়। পরে তাদের উদ্ধার করে প্রথমে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লে­ক্সে নেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য দু’জনকেই শেরপুর জেলা হাসপাতালে নেয়া হয়। এখানে দুই দিনের চিকিৎসায় বিপুল সুস্থ হলেও বাবুল মিয়ার অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স অ্যান্ড ট্রমাটোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়। তবে অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ করে ফিরিয়ে আনা হয় বাড়িতে। বর্তমানে চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন বাবুল মিয়া।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় সুস্থ্য সবল লোকটি এখন পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যা হলেই পাওয়া যেত তাকে। সহজে ঠিক করে দিতো সে। এখন কেউ তাকে দেখতে গেলে জড়িয়ে ধরেন কাঁদে। তাদের কান্নাকাটিতে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস । জীবনের প্রায় সব সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন। এখন প্রতিদিন ৪’শ হতে ৫’শ টাকার ওষুধ সেবন করতে হয় তাকে। কিন্তু টাকার অভাবে ওষুধ কেনাও সম্ভব হচ্ছে না।

বাবুলের স্ত্রী রুপালি বেগম বলেন, ৩০ বছরের সংসার জীবনে কোন সঞ্চয় নেই। যা ছিল চিকিৎসা করতে গিয়ে সব বিক্রি করে দিয়েছি। এক মেয়ে নিয়ে তিন জনের সংসার। টাকার অভাবে মেয়েটার পড়ালেখা বন্ধ। এখন অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছি। সরকার বা কোনো দানশীল ব্যাক্তি যদি চিকিৎসার সহায়তায় এগিয়ে আসে তাহলে হয়তো সুস্থ্য হবে তার স্বামী। আবারো ফিরবে কাজে। সংসারে আসবে সচ্ছলতা।

আহত বাবুল মিয়ার ছোট ভাই লাভলু মিয়া বলেন, ভাইয়ের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অটোরিকশা মালিকের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি করা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণ না দিয়ে টালবাহানা করছে অটোরিকশা মালিক।

এ বিষয়ে শ্রীবরদী পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শাহজাহান কবির জানান, গতকালকে অটোরিক্সা মালিকের সাথে কথা বলে বাবুলকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ এম. আর করিম কে পার্শবর্তী জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের একটি ক্লিনিকে দেখিয়েছি। তিনি পরামর্শ ও ঔষধ দিয়েছেন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাবুল মিয়াকে ঢাকায় পাঠানোর জন্য অটোরিক্সা মালিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।

আহত বাবুল মিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে অটোরিক্সা মালিক ইমস্রাফিল জানান, আমি আমার সামর্থ অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে বাবুল মিয়ার চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও নিয়ে গেলে আমার পক্ষে চিকিৎসা চালানো সম্ভব নয়।

নিটোরের চিকিৎসক ডাঃ এম. আর করিম টেলিফোনে জানান, গতকাল আমি রোগীকে দেখেছি। খুটির উপর থেকে পড়ে বাবুল মিয়ার মেরুদন্ডের একটি হাড় ভেঙ্গে গেছে। এসব রোগী যদি পায়ে শক্তি না পায় তবে, অপারেশন জরুরী হয়ে পড়ে। কিন্তু বাবুল মিয়ার পায়ে শক্তি পাচ্ছে। অপারেশন না করে তিন থেকে চার সপ্তাহ পূর্ণ বিশ্রামে থাকলে তিনি সুস্থ্য হবেন। তবে অপারেশন করলে দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন।