Amar Praner Bangladesh

প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির আবর্তে বাংলাদেশ

 

(বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ব্যাপকভাবে বিরাজমান এবং অনেক ক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে আমাদের দেশে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাজনৈতিক ঐক্য অনুপস্থিত।)

 

শের ই গুল :

 

আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। সামনের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, নির্বাচনটি ‘অংশগ্রহণমূলক’ হবে কি না, তার কোনো নিশ্চিত জবাব এখনই দেয়া সম্ভব নয় কারন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলছে বিবিধ মেরুকরণ। ফলে রাজনীতির গতিপথ দেশের এই অসময়ে একটি নির্দিষ্ট ছকে আঁকা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির অঙ্গণ বেশ সরব।

চলছে ক্ষমতাসীন ও অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে শব্দযুদ্ধ, এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর একে অন্যের প্রতি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণের নেশা। রাজনীতিতে অনৈক্য, বিরোধ ও দ্বন্দ্ব থাকবেই। এমনকি রাজনীতির গতি-প্রকৃতি যেখানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয় এবং মৌলিক বিষয়গুলাতে ঐকমত্য বিরাজ করে, সেখানেও দ্বন্দ্ব-বিরোধ থাকাই স্বাভাবিক। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সহিংসতায় রূপ নেয়, যা নাগরিকদের জন্য চরম অকল্যাণ বয়ে আনে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ব্যাপকভাবে বিরাজমান এবং অনেক ক্ষেত্রে এ দ্বন্দ্ব সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলে আমাদের দেশে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাজনৈতিক ঐক্য অনুপস্থিত। কিন্তু পাশ্চাত্যের গনতান্ত্রিক দেশগুলোর জাতীয়তাবাদ দল, সংগঠন তথা ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে। আমরা দেখেছি ইতিহাসের খলনায়ক হিটলারও কতোটা আপোসহীন ছিল জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ।

বর্তমানে বহুল সমালোচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও দেশের স্বার্থে আমেরিকা ফার্স্ট নীতি তুলে ধরেছে বহির্বিশ্বে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল কিংবা দলের কর্মীদের এরকম দেশ “উন্নয়ন ভিত্তিক” দেশের “স্বার্থ ভিত্তিক” চিন্তা-ভাবনা আদৌ আছে কি নিজের দলের বিপরীতে গিয়ে? এর কারন কি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিহিংসা নাকি কেবলই ব্যক্তিস্বার্থ ও নিজ দল কেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চা!! আমাদের দেশের “রাজনৈতিক সংস্কৃতি” উল্টো দিকে হাঁটছে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে উপাদানগুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটে তা হলো,রাজনৈতিক বিশ্বাস, চেতানা,মূল্যবোধ ও পারস্পরিক বিশ্বাস,সহনশীলতা ও একে অন্যের প্রতি সৌজন্যতাবোধ। যেগুলো বর্তমানে রাজনীতির এই সংকট সময়ে অনুপস্থিত। এখন একটা দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভাবধারা অনুপস্থিত থাকে তাহলে সেখানে যেমন গনতন্ত্রের প্রকাশ ঘটে না তেমনি অবরুদ্ধ হয় রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা।

বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে যে রাজনৈতিক সংকট পড়েছে তা সম্প্রতি এখনকার আবিষ্কার নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই এমন রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে আমাদের।আমাদের রাজনীতিতে যে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতি তাতে গনতন্ত্র বিপথগামী হয়ে হাঁটছে। আমরা কি দেখি নি অতীত সময় থেকে এই অবধি! বিরোধী দলের ক্রমাগত সংসদ বর্জন, সর্বক্ষেত্রে সরকারি দলের প্রভাব বিস্তার, জ্বালাও- পোড়াও, আন্দোলন, হরতাল, সংসদ ও তার বাইরে একদল আরেক দলকে হেয়মূলক কথাবার্তা বলে রেষারেষি এ সবকিছুই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘটেছে আমাদের দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার রাজনীতির শুভ সূচনা ঘটে বাংলাদেশে। সেই একই পরিস্থতির শিকার হয়েছিল জিয়াউর রহমানও। তারপর নানান পরিক্রমায় স্বৈরাচার হটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেও ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি আরও নানানভাবে উন্মোচিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব ইতিমধ্যেই সমাজের প্রতিটি সেক্টরে পড়তে শুরু করেছে।

রাজনীতিতে সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও সৌজন্যতাবোধের সংস্কৃতি বজায় না থাকায় বর্তমান রাজনীতি ও গনতন্ত্র সংকটাপন্ন ও হুমকির মুখে। যে দলই ক্ষমতায় আসে সে দলই সভা সমাবেশে, মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলে বেড়ায় যে, আমাদের গনতন্ত্র সুরক্ষিত আছে এবং তা নিজস্ব পথেই চলছে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে এখন অবধি গনতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে পুরোপুরি দখল নিতে পারেনি।

রাজনীতিতে ভিন্নমত, পথ ও আদর্শকে সহ্য করার মানসিকতা একদিকে যেমন এদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অপরদিকে ভিন্নমত দমনে রাজনৈতিক অপকৌশল দেশের সংকটকে আরও তরান্বিত করছে সাথে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। বাংলাদেশে যে দল ক্ষমতায় আসীন হয় সে দল ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে যে জনগনবান্ধব নীতি ও গনতন্ত্রের আদর্শের কথা বলে সে নীতি ও আদর্শের কথা নিমিষেই ভুলে যায় এবং বিরোধী দলের প্রতি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কোনোরকম “গনতান্ত্রিক স্পেস” এবং বিরুদ্ধ মতের স্বাধীনতা দিতে চায় না যেটা গনতন্ত্র বহিঃর্ভূত কাজ। বিরুদ্ধমত গনতন্ত্রের ” সেফটি ভালভ”। গনতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতির মধ্যে একটি যেটার বিপক্ষে অবস্থান মানে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান, গনতন্ত্রকে অবিশ্বাস করা মানে স্বাধীনতাকে অবিশ্বাস করা, গনতন্ত্রকে লাঞ্চিত করা মানে দেশের জাতীয়তাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

বাংলাদেশের জনগনের স্বপ্ন কিন্তু স্বার্থক গনতন্ত্র। শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নয়, স্থানীয় পর্যায়েও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সরকার গড়ে ওঠুক। জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত নীতি স্বচ্ছ হউক।নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শাসকদের জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত হউক। এসবই কামনা করেন দেশের জনগন। পাশ্চাত্যের গনতন্ত্রে জাতীয় নেতৃত্ব যেমন একদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু,ত্রুটিহীন, বিশ্বাসযোগ্য করে অন্যদিকে সরকারি কর্তৃত্বকে সীমিত করে ব্যক্তির প্রাধান্যের পরিবর্তে আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা, শাসন ব্যবস্থায় ভারসাম্য ও জনগনের অধিকার সংরক্ষণের চেষ্টা করে। এর নেপথ্যের কারন হচ্ছে পাশ্চাত্যের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের মন মানসিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত। পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সৌজন্যতাবোধ প্রদর্শন এবং গনতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে ও দেশের স্বার্থে যেকোনো সময় রাজনৈতিক এক্যে সামিল হতে তারাঁ প্রস্তুত।

২০০৪ সালে ২১ শে আগস্ট ক্ষমতা থাকা কালে বিএনপির গুটিকয় নেতৃবৃন্দ জঙ্গি গোষ্টীর সহায়তায় তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিানাকে উৎখাত তথা আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস চালাতে গিয়ে গ্রেনেড হামলা চালায় বলে কিছুদিন আগে রায় এসেছে। কিন্তু একটি দল রাজনৈতিক ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য অন্য আরেকটি দলকে এরকম অগনাতন্ত্রিক অপকৌশলে গায়েল করার অপপ্রয়াশ চালাতে পারে না। এটা গনতন্ত্রের ভাষা নয়, এটা গনতন্ত্রের গতিপথ নয়। এটা নিতান্তই প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ! নষ্ট রাজনীতির অপকৌশল! এবং অগনতান্ত্রিক আচরণও বটে!! বেশ কিছুদিন আগে ভোলার এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন বিএনপি ক্ষমতায় আসলে প্রথম দিনেই আওয়ামী সমর্থিত লক্ষ মানুষকে হত্যা করবে। এ আগাম বার্তা হয়তোবা এখন আওয়ামীলীগ এর পক্ষ থেকে আসছে কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে সময়ের ব্যবধানে বিএনপির কাছ থেকেও আসতে পারে এবং সেটা এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ক্ষমতার পালাক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অন্যের প্রতি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ নেবার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে থাকে। এর মাঝে শোচনীয় অবস্থার স্বীকার হয়,দেশের জনগন এমনকি প্রশ্নবিদ্ধ হয় দেশের গনতন্ত্র!! এদেশে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দেশ ও দেশের শিক্ষা,অর্থনীতি,যোগাযোগব্যবস্থা,শিল্প ও বানিজ্য, সংস্কৃতি, উন্নয়ন,সংকট, চ্যালেঞ্জ এসকল বিষয়কে উপক্ষা করে ওনারা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে যেই বিরোধী দলে থাকে ক্ষমতাসীনরা তাদের শ্লেষাত্মক শব্দ ব্যবহারে গায়েল করার চেষ্টা করে। একেকজন মনে হয় দেশ বিশেষজ্ঞ না হয়ে বিরোধী দল বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে! রাজনীতিতে সুস্থ ধারা বিনির্মানে এই অপসংস্কৃতি থেকে তাদের বাহির হওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের পর পরাজিত পক্ষের ওপর প্রতিহিংসামূলক আচরণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট করছে। কারন এখনও গনতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে পুরোপুরি দখল নিতে পারেনি।

ফলে গনতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশে আবশ্যক রাজনৈতিক দল এমনকি ব্যক্তি লেভেল এ মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা করা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল এর প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা এবং জনগনের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখাতে হবে। কিন্তু অযথাই বঙ্গদেশে রামের গীত কে শোনে,আমরা যেখানে সবাই ব্যস্ত রহিম গীতে!! কারন ধ্বংসাত্মক ও আত্মকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়েই যে আমরা ব্যস্ত!! কাজেই বর্তমান রাজনীতির চলমান সংকট নিরসনে,দোদুল্যমান অবস্থা থেকে রেহাই পেতে হলে, রাজনীতিতে গনতন্ত্রের জাগরণের জন্য, সুস্থ ধারার রাজনীতি আনয়নে, জনগনকে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে রক্ষার জন্য,ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি ব্যতিরেকে রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের প্রতি সৌজন্যতাবোধ ও সহনশীল মনোভাব আবশ্যক।