বসবাসের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে অপরাধে বিবর্ণ উত্তরা আবাসিক এলাকা

 

(ফ্রেন্ডস ক্লাবের দখলে রাজউকের মাঠ-প্রথম আলো। উত্তরা খেলার মাঠ দখল মুক্তির দাবী- দেশরূপান্তর, উত্তরায় দখলের মহোৎসব- ইনকিলাব। রাজউক, থানা পুলিশ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নামে প্রভাবশালীরা জড়িত রয়েছে : রাজউকের হাজার কোটি টাকার জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক কাঁচা বাজার)

 

শের ই গুল :

আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভাড়া চালিয়ে অধিক লাভের আশায় কিছু বাড়ীর মালিকরা বিভিন্ন অফিস ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যালয় ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন জঙ্গী সহ বিদেশী নাগরিক প্রবেশের সুবিধা দিয়ে এখানে বসবাসরত মানুষকে হুমকির মধ্যে পতিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে উত্তরার কল্যাণ সমিতির যতগুলো খেলার মাঠ আছে, পার্ক আছে, বেশির ভাগ সময় এই গুলো বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র কল্যাণ সমিতির সদস্যদের স্ত্রী, ছেলে মেয়েরা, হাঁটা চলা, ব্যায়াম ও খেলাধূলার কিছুটা সুযোগ পেলেও উত্তরা আবাসিক এলাকার কোন ভাড়াটিয়া এবং তাদের ছেলে মেয়েরা কিংবা গরীব কোন মানুষের সন্তানেরা এখানে খেলাধূলা তো দূরের কথা ভিতরে প্রবেশ করতেই পারে না।

একই দেশের নাগরিক হয়ে একই এলাকায় বসবাস করে এ কেমন বৈষম্য! মাননীয় মেয়রের কাছে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে দাবী উঠেছে খেলার মাঠ উন্মুক্ত করে দিলে ছেলে মেয়েরা মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় না দিয়ে কিংবা কোন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে খেলাধূলা করে সময়ের সদ্য ব্যবহার সহ শারিরীক গঠনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে করে মাদক আসক্ত অনেকেও হয়তো নতুন জীবন ফিরে পেতে পারে। রাজউক স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এলাকাটি ঢাকার অন্যান্য এলাকা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হবে। বসবাসের জন্য উত্তরা মডেল টাউন সবার আদর্শ হয়ে উঠবে।

এ কথা বিশ্বাস করেই নগরীর বড় বড় শিল্পপতি, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ অভিজাত শ্রেণির মানুষ সেখানে বসবাস শুরু করেন। গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডির বাণিজ্যিকীকরণের ছোবল থেকে বাঁচতে কেউ কেউ উত্তরায় প্লট কিংবা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। একটু নিরিবিলি পরিবেশে বসবাসের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয় উত্তরা মডেল টাউন।

পরিকল্পনার প্রধান শর্ত ছিল, সেখানে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। সরকারি এ উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকে সেখানে বসবাস শুরু করেন; কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এলাকাটি এখন নানামুখী অপরাধে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। উত্তরা মডেল টাউনের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন শের ই গুল অপরাধে বিবর্ণ উত্তরা মডেল টাউন রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা উত্তরা। রাজউকের ভাষায় মডেল টাউন। তাঁদের দেখাদেখি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেক অভিজাত মানুষ এখানে বসতি গড়ে তোলেন; কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি।

উত্তরা মডেল টাউন এখন নানামুখী অপরাধে বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি, দখল এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। ফ্ল্যাটে-ফ্ল্যাটে গড়ে উঠেছে রকমারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ সুযোগে কতিপয় ব্যবসায়ী গড়ে তুলেছেন স্পা, ম্যাসাজ পার্লার, সিসা বার, আবাসিক হোটেল, হাসপাতাল, বায়িং হাউস ও ক্লাব-সমিতি। ৯ নম্বর সেক্টরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক আগ্রাসনে সীমাবদ্ধ থাকলে হয়তো আমাদের মানসম্মান রক্ষা হতো; কিন্তু আবাসিক হোটেল, স্পা ও ম্যাসাজ পার্লারের অন্তরালে চলছে নানা অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদক ব্যবসা, যে কারণে পরিবার নিয়ে উত্তরায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উত্তরার বিভিন্ন স্থানে নানা নামে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্লাব।

কোনো কোনো ক্লাবের অন্তরালে মদ, জুয়া, অশ্লীল নাচ-গান থেকে শুরু করে ক্যাসিনো পরিচালনার মতো অভিযোগ উঠেছে। প্রাণের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে উত্তরার বিভিন্ন স্থানে নানা নামে বিভিন্ন ক্লাবের উৎপাত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ক্লাবের অন্তরালে মদ, জুয়া, অশ্লীল নাচ-গান থেকে শুরু করে ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। উত্তরা অফিসার্স ক্লাবসহ বৈধ অবৈধ ২৫-৩০টি ক্লাব গড়ে উঠেছে। এসব ক্লাব গড়ে তোলা হয়েছে ভাড়া বাড়িতে মূলত মদ, জুয়া কিংবা অসামাজিক কার্যকলাপ চালানোর জন্য।

স্থানীয় লোকজন জানায়, নগরীর বড় অপরাধীরা এসব ক্লাবে নিয়মিত আড্ডা দিলেও পুলিশ নির্বিকার। ইতিমধ্যে এসব ক্লাবের মধ্যে অনেক ক্লাব বন্ধ হয়ে গেছে আবার অপরাধের মুখোশ উন্মোচিত সংবাদে মুখ থুবরে পড়েছে এসব ক্লাবের অসামাজিক ব্যবসা। কিন্তু নাম পরিবর্তন করে এসব ব্যবসায়ীরা বা তাদের দোষরা উত্তরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন আলিশান ফ্ল্যাটে লোক চক্ষুর আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছে জুয়া খেলা সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিরাপত্তার কারণে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশান, বনানী, বারিধারা কিংবা ধানমণ্ডিতে প্রকাশ্যে কোনো বার, ক্লাব, স্পা, ক্যাসিনো চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। যার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উত্তরা মডেল টাউনে স্থানান্তর হয়েছে, বিশেষ করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের সহযোগিতায় সেটা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান ওসি তপন চন্দ্র সাহা এসব ক্লাব, বার, স্পা কিংবা ম্যাসাজ পার্লার ও টু নাইনটি হাউজ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা পান বলে ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিমধ্যে অফিসার ইনচার্জ তপন চন্দ্র সাহার তত্ত্বাবধানে একজন আসামীর মৃত্যু হয়েছে এবং তাকে ইয়াবা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার মর্মে চাঁদা দাবী করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে মামলা হয়েছে এবং বিষয়টির উপর একজন সাহসী প্রতিবেদক ইতিমধ্যে মাছরাঙ্গা টেলিভিশনে তাদের অপরাধ তুলে ধরে প্রচার করেছেন।

এছাড়াও অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন পুলিশের অপরাধের ইতিবৃত্ত। তারপরেও এসব অফিসার ইনচার্জ সহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তারা বহল তবিয়তে বসে আছে একেকটি থানায় বছরের পর বছর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের আদেশ পালনে এরা অভ্যস্ত নয়, অথবা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা কোন আদেশ দিতে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে। এমনটাই মন্তব্য করছেন সুশীল সমাজের অনেকেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, কিছু ক্লাব শুধু পারমিটধারী নির্দিষ্ট সদস্যদের মধ্যে দেশে তৈরি কেরু কোম্পানির বিলাতি মদ বিক্রি করতে পারবে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি ক্লাবের কর্মকর্তা প্রতিবেদককে জানান, ক্লাবে কী বিক্রি হবে, কে পারমিটধারী, কে পারমিটধারী নয় সেটি আপনাকে বলা হবে না। ক্লাবটি কিভাবে চলছে তার জবাব মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় থানা পুলিশ থেকে জেনে নেবেন। তা ছাড়া ওই ক্লাবের পার্টনার একজন নামকরা সাংবাদিক।

বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করলে বিপদে পড়বেন। উত্তরা সার্কেলের মাদক পরিদর্শক দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘উত্তরা মডেল টাউনে অনেক অবৈধ ক্লাব ও বার গজিয়ে উঠেছিল। ক্যাসিনো অভিযানের সাথে সাথে এগুলো অনেক বন্ধ হলেও লোকচক্ষুর আড়ালে আবাসিক বাড়ীর মধ্যে এখনো চলছে গোপনে এসব অবৈধ কারবার। খবর পেলেই সেখানে অভিযান চালাই। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগের কোনো শেষ নেই।

রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে চলছে ব্যবসা- সরেজমিনে গিয়ে উত্তরার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে বিভিন্ন দোকানপাট, টংঘর ও ভ্যানগাড়ি বসানোর দৃশ্য দেখা গেছে। এর মধ্যে আবদুল্লাহপুর, হাউজবিল্ডিং, আজমপুর, রাজলক্ষ্মী, ১১-১২ নম্বর সেক্টর ও ১০ নং সেক্টর চৌরাস্তা সহ বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে এক হাজার অবৈধ দোকানপাট থেকে লাইনম্যান নামধারী কিছু চাঁদাবাজ দৈনিক টাকা তুলছে বলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব চাঁদাবাজদের দলীয় নেতা সহ তাদের লোকাল থানার কোনো কোনো দারোগা শেল্টার দিচ্ছেন। তাকে ধরা হলেই উত্তরার ফুটপাত চাঁদাবাজি মুক্ত হয়ে যাবে। আজমপুর ফুটপাতের একজন কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, ‘পুলিশের এমন কোনো শাখা নেই, যাদের নামে চাঁদা ওঠানো হয় না। এমনকি রাজনৈতিক নেতা, ভুয়া সাংবাদিক, পুলিশের সোর্সরা সবাই ফুটপাত থেকে ভাগ পেয়ে থাকে। উত্তরা মডেল টাউনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে পুলিশের ডিসি নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, ‘ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রধান সড়কের ফুটপাত থেকে হকার ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে। আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বেশ কয়েকটি হোটেল ও ডিস্কো ক্লাব সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য ক্লাব, বার, স্পাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘উত্তরা মডেল টাউনের এসব অপরাধ, মাদক ব্যবসা ও দখলের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক পেশিশক্তি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, কিছু পুলিশ সদস্য ও কিছু নামধারী সাংবাদিক জড়িত। ব্যবস্থা নিতে গেলেই ওদের স্বার্থে আঘাত লাগে। তাই এসব সমস্যা সমাধানে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পুলিশের একার পক্ষে সেটি সম্ভব নয়।