Amar Praner Bangladesh

বাঁধ ভাঙ্গন আর পানির চাপে তলিয়ে যাচ্ছে খুলনার নিম্নাঞ্চল

বি এম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো:

আমাবশ্যার জোয়ারে খুলনা ও রূপসার বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে লোকালয়ে। গত সোমবার রাত ও মঙ্গলবার সকালের জোয়ারে পানিতে তলিয়ে গেছে রূপসা উপজেলার প্রীফলতলা, আইচগাতি, সেনেরবাজারসহ বেশকিছু গ্রাম। এছাড়া গত ৩-৪ ধরে প্রতিদিন দুই বেলা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে মহানগরীর ভেতরের নিম্নাঞ্চলের সড়ক। এদিকে হঠাৎ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেল চুকনগর শহর। গত বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ভদ্রা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি শহরে আসতে থাকে। এ সময় শহরের যতিন কাশেম রোড, মাছের চাঁদনী, ব্রিজ রোড, কাউন্সিল রোড ও কাপড়পট্টির রোড তলিয়ে যায়। জোয়ারের পানিতে এ সকল রোডের দোকানগুলোতে পানি উঠে যায়।
শহরের ব্যবসায়ীরা জানায়, ভদ্রা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীর সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় প্রায় প্রতিদিনই পানি উঠে শহরের রাস্তা-ঘাট ও দোকানপাট তলিয়ে যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
এছাড়া গত মঙ্গলবার জোয়ারের সময় জেলখানা ঘাটের ওপারে গিয়ে দেখা গেছে, জোয়ারে পানির উচ্চতা বেড়ে নদী ও সড়ক একাকার হয়ে যাচ্ছে। পানির উচ্চতা এতোই বেড়েছে যে, জোয়ারের সময় দেখে বোঝার উপায় থাকে না, কোথায় নদী, কোথায় সড়ক। নিকট অতীতে নদীর এমন আগ্রাসী রূপ দেখেনি খুলনার মানুষ।
অপরদিকে, মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ভাঙন দেখা দিলে পরানপুর গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে এসব মানুষের। গত মঙ্গলবার রাত থেকে এ ভাঙন দেখা দেওয়ায় নদীতে বিলীন হয়ে যায় গাছপালা, রাস্তা ও বাড়িঘর। অনেকের নিকটতম আত্মীয় স্বজনরা খবর পেয়ে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। আপ্রয় নিয়েছে আত্মীয়ের বাড়ি।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাগেরহাট জেলার চিতলমারীর বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের পরানপুর গ্রামে গত দু’দিন ধরে মধুমতি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এলাকার লোকজন রাত জেগে তাদের মালামাল রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তরপরও সকাল পর্যন্ত গাছপালা ও ঘরের মালামালসহ অন্যান্য জিনিসপত্র ভাঙনে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। দিন দিন নদীর পানি আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এসব মানুষেরা। সামান্য আয়ের এ মানুষগুলোর বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেলে রাস্তায় নেমে আসা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
স্থানীয় মোহাম্মাদুল্লাহ (৪০) জানান, মুরব্বিদের মুখে শুনেছি গত ৪০ বছর ধরে মধুমতি নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পরানপুরের ওপার থেকে ভাংতে ভাংতে এখন এপারে চলে এসেছে। শত শত বিঘা ফসলি জমি, গাছপালা, বসতবাড়ি ও পৈত্রিক ভিটা নদীতে চলে গেছে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেকে পরণের যা ছিল তা নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আমাদেরও চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ভাঙন পরিদর্শনও করেছেন। তবে এখনও পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আমরা এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করে বেঁচে আছি।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নানা কারণে রূপসা নদীর তলদেশ দিন দিন ভরাট হচ্ছে। অন্যদিকে ষাটের দশকে তৈরি শহর রক্ষা বাঁধ হয়ে গেছে অনেক নিচু। এজন্য বর্ষা মৌসুমের পানির চাপ বেড়ে গেলে বাঁধ উপচে পানি শহরের ভেতরে চলে আসছে। ঠিক একইভাবে নদীর ওপারের আইচগাচী, সেনেরবাজারসহ বিভিণœ গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে শহরক্ষা বাঁধ পুনর্র্নিমাণের প্রকল্প হাতে নিচ্ছে কেসিসি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, রূপসা নদীতে পানির স্বাভাবিক উচ্চতা ২ দশমিক ৫০ মিটার। সমুদ্রের ঢেউয়ের গড় উচ্চতাকে শূন্য ধরে নদীর পানি পরিমাপ করে পাউবো। তারা জানান, গত শনিবার রূপসা নদীতে পানির উচ্চতা ছিলো ৩ দশমিক ২৩ মিটার। রোববার যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৪১ মিটার। সোমবার ও মঙ্গলবার তা’ সাড়ে ৩ মিটার ছাড়িয়ে যায়। সাধারণত ২ দশমিক ৫৯ মিটারকে বিপদসীমা ধরা হয়ে থাকে।
পাউবো থেকে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে রূপসা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এটা হয়ে থাকে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে পানির উচ্চতা বিগত বছরগুলোর চাইতে বেশি। এ কারণেই জোয়ারের সময় তলিয়ে যাচ্ছে নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া, চাঁনমারী, লবণচরা, শিপইয়ার্ড, রূপসা স্ট্র্যান্ড রোড, জিন্নাহপাড়া, রূপসা ট্রাফিক মোড়, আলুতলা বাঁধ, গ্লাক্সো মোড়সহ নদীর আশপাশের এলাকা।