Amar Praner Bangladesh

বাউনিয়া আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারী ও প্রতিষ্ঠাতার দুর্নীতি-জালিয়াতি

 

 

এন এ হাসান :

রাজধানীর তুরাগের ‘বাউনিয়া আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সামাদ ও অফিস সহকারী মো. নুরুল ইসলাম এবং বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা মো. খোরশেদ আলম মাদবরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়টির সকল শিক্ষকদের নামে ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য জনতা ব্যাংকের উত্তরার কর্পোরেট শাখায় প্রভিডেন্ট ফান্ডের (পিএফ) জন্য পৃথক সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। পিএফ’র টাকা প্রধান শিক্ষক আব্দুস সামাদ ও অফিস সহকারী নুরুল ইসলামের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দেয়া হয়।

কিন্তু তারা যৌথভাবে ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত শিক্ষকদের ৫৪ মাসের প্রায় ১৫ লাখ টাকা ফান্ডে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। যার মধ্যে সিনিয়র শিক্ষক আলমাছ উদ্দিনের ৪৩,২০০টাকা, শামসুল হকের ৫৯,৪০০ টাকা, সিনিয়র শিক্ষিকা তাসলিমা আখতারের ৫৯,৪০০ টাকা, জিয়াসমিন ফারজানার ৪৩,২০০টাকা, সহকারী শিক্ষক ফারুক হোসেনের ৩৪,৫৬০টাকা, আতিকুর রহমানের ৪৩,২০০টাকা টাকা আত্মসাৎ করার ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। অপরদিকে ২০২০ সালে ১২০০ শিক্ষার্থীর কাছ পরিচয়পত্রের নামে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু কোন পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি।

এছাড়াও বাউনিয়া আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামাদ ও অফিস সহকারী নুরুল যোগসাজশ করে করোনার অযুহাত দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সকল শিক্ষক ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের এক বছরের বেতনের ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার পায়তারা করছেন। কিন্তু করোনাকালে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন ঠিকই আদায় করা হয়েছে।

অপরদিকে ছয় জন শিক্ষকের বকেয়া বেতনের একটি তালিকা আজকের পত্রিকার হাতে এসেছে। সেখানে সিনিয়র শিক্ষক আলমাছ উদ্দিনের তিন বছরে ২ লাখ ১২ হাজার, শামসুল হকের দুই বছরে ১,৩৮,৬০০টাকা, তাসলিমা আখতারের দুই বছরে ১,৩৮,৬০০টাকা, জিয়াসমিন ফারজানার দুই বছরে ১,২৭,২০০টাকা, সহকারী শিক্ষক ফারুক হোসেনের দুই বছরে ৯৩,১২০টাকা এবং আতিকুর রহমানের দুই বছরে ১,০৬,২০০টাকা বকেয়ার দাবি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্যাংক স্টেটমেন্ট তুলে প্রভিডেন্ট ফান্ডের আত্মসাৎতের তথ্য জানতে পারেন। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে আটজন শিক্ষক-শিক্ষিকা অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় সাংসদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা প্রশাসক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের উপ-পরিচালক এবং জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর প্রতিকার চেয়ে গত ২২ মার্চ আবেদন করেন।

কিন্তু তবুও কোন সুরাহা না পেয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিক্ষক আলমাছ উদ্দিন চীফ মেট্রোপলিটন আদালতে একটি মামলা (সিআর মামলা নং-১০৬/২২) করেন। বাদী ওই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৩২ বছরে ধরে শিক্ষকতা করে আসছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এবং তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তাছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা খোরশেদ আলম মাদবরের বিরুদ্ধে অন্যের জমি জালিয়াতি করে বিক্রি, মিথ্যা মামলায় হয়রানি, মার্কেটের দোকান দখল, মসজিদের জমি দখল- বাউন্ডারি ভাংচুর, হামলা, আপন বোনকে এলাকা ছাড়া, পৈত্রিক সম্পত্তি ভাই-বোনদের বঞ্চিত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দানসহ বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, খোরশেদ আলম তারই আপন ভাই আব্দুল আজিজ জজের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বসতবাড়ির চার কাঠা জমি ফকির মো. আবুল হাশেম ও মো. জালাল উদ্দিনের কাছে ১৯৮০ সালে বিক্রি করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ২০২১ সালে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২০২১ সালে দুটি মামলা (সিআর মামলা নং-৮৫৯/২০২১ এবং ৮৬২/২০২১) করেন। মামলার তদন্তে সিআইডি জানায়- ‘কথিত জাল দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির সময় আব্দুল আজিজ নাবালক ছিলেন। তার দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি কোন আইনগত ক্ষমতা ছিল না। আব্দুল আজিজের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণের সহযোগিতায় বাদীর দস্তখত ও টিপ জাল করে দলিলটি করা হয়েছে।’

ওই দুই মামলায় সিআইডির পরিদর্শক মো. আব্দুল বাতেন ২০২২ সালের ১৬ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেন। পরে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় চলতি বছরের ৮ জুন বাউনিয়া থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন খোরশেদ আলম মাদবর।

রাতের আধারে বাউনিয়া মাদবর বাড়ির বাইতুর রশিদ জামে মসজিদের বাউন্ডারি এবং অযুখানা ও বাথরুমের ভেঙ্গে ফেলার অভিযোগে খোরশেদের বিরুদ্ধে ঢাকার প্রথম সহকারী জজ আদালতে মামলা (সিআর মামলা নং-১০১/২০২০) ও একই অভিযোগে তুরাগ থানায় তিনটি জিডি রয়েছে। বাউনিয়ার ডায়না সুপার মার্কেটে অন্যের দোকান দখল করার অভিযোগে একটি জিডি রয়েছে।

এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ১৯৭৯ সালে আব্দুল জলিল মাদবর একটি জমি ক্রয় করেন। এর কয়েক মাস পরেই তিনি আট ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করেন। তখন একমাত্র সাবালক খোরশেদ আলম ভাই-বোনদের বঞ্চিত করে একাই ‘আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়’ এর কাছে ওই জমি দান করে প্রতিষ্ঠা হন। এ নিয়ে আব্দুল আজিজ জজ ও সাইদুল আলম ২০২০ সালে ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেন (সিআর মামলা নং-৭৬৫/২০২০)।

শুধু তাই নয়, খোরশেদ মাদবরের এক ভাই ক্যান্স্যার রোগী, অন্য দুই ভাই পঙ্গু এবং পঙ্গুর মধ্যে একজন পাগল প্রায়। তবুও সম্পত্তির লোভে পঙ্গু ও অসুস্থ ভাইদের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি মামলা (নং- ৯১/২০) করেন খোরশেদ। পরে মামলাটি তদন্ত শেষে সিআইডি ফাইনাল রিপোর্ট দিলে আদালত তা খারিজ করে দেন। এছাড়াও সিটি জরিপ চলাকালে খোরশেদ আলম তার পঙ্গু ও অসুস্থ তিন ভাইকে ঠকিয়ে পৈত্রিক সম্পত্তির আড়াইশত অযুতাংশের বেশি তার নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। এ ঘটনায় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা (সিআর মামলা নং-৮৬/২০১৯) বিচারাধীন রয়েছে।

টাকা আত্মসাৎ এর ঘটনায় করা মামলার বাদী আলমাছ উদ্দিন বলেন, ‘২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সামাদ বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর থেকে এই পর্যন্ত আমাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমরা আগে জানি নাই বুঝি নাই, শুধু জমার শিটে স্বাক্ষর করেছিলাম। পরে একেক করে সবাই ব্যাংক স্টেটমেন্ট তোলার পর জানছি। এ ঘটনায় সব জায়গায় অভিযোগ করেও কোন সুরহা না পেয়ে আদালতে গিয়ে মামলা করছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ করায় গত ২৬ মার্চ স্কুলের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে অফিসে ডেকে নিয়ে সবার সামনেই আমাকে বলছে- আগামীকাল থেকে আপনি আর স্কুলে আসবেন না। আসলে ফুটবলের মত লাথি দিয়ে বের করমু। তাই তাদের ভয়ে কেউ সহজে মুখ খুলে প্রতিবাদ করতে চায় না। প্রতিবাদ করায় আমাকে মৌখিক কয়েকবার সাসপেন্ড করছে, আবার জয়েন্ট করছে।’

মামলার বাদী অভিযোগ করে বলেন, ‘টাকা আত্মসাৎ করার ব্যাংক স্টেটমেন্ট থাকার পরও পিবিআই অফিসার চার্জশিট নিয়ে পায়তারা করছে। দেয় দিচ্ছে, এমন করছে। আবার চার্জশিটে টাকা আত্মসাৎতের বিষয় দিতে পারবে না তা বলছে।’

অন্যান্য শিক্ষকদের অভিযোগ- কেউ মুখ খুললেই চাকরী থাকে না। খন্ডকালীন শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয়। এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের ক্লাস নেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সব কিছুই চলে মৌখিক আর প্রভাবের বলে। এভাবেই তারা আমাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী আব্দুল আজিজ জজ বলেন, ‘আমাদেরকে খোরশেদ আলম মাদবর মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। আমার স্বাক্ষর জাল করে সম্পতি দখল করেছে। ছোট বোন রোকেয়া বেগম ময়নাকে অত্যাচার করে নামে মাত্র দাম দিয়ে ক্রয় করে তাকে এলাকা ছাড়া করেছে। সেই শোকে মারা গেছে ময়না। আবার পারিবারিক উপার্জন টাকা দিয়ে একার নামে কোটি কোটি টাকার জমি কিনেছে।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে হাজী মো. খোরশেদ আলম মাদবর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আপনি এসব তথ্য কোথায় পাইছেন, কে দিয়েছে? আপনি রিপোর্ট করলে কি হবে? আপনি আমার সামনে আসেন, আইস্যা তারপর কথা বলেন।”

টাকা আত্মসাৎ প্রসঙ্গে বাউনিয়া আব্দুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সামাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ তিনি বলেন- ‘আমি গাড়ীতে আছি। পরে কথা বলি।’ পরবর্তীতে আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি। তারপর তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে তিনি বলেন, ‘আমি গাজীপুর। মা অসুস্হ। পরে বলি।’ পরে আবার ক্ষুদে বার্তায় তিনি বলেন, ‘মামলা তদন্তাধীন। এ বিষয়ে কোন মন্তব‍্য করা ঠিক নয়।’

অপরদিকে অফিস সহকারী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিহিংসার কারণে মামলা করা হয়েছে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কেউ আত্মসাৎ করেনি, বকেয়া রয়েছে। আস্তে আস্তে দিয়ে দেয়া হবে।’

প্রতিষ্ঠানটি এডহক কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মাহবুবুল ইসলাম ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। পরে তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন জবাব দেননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই (অর্গানাইজড ক্রাইম) এর এসআই নুরুজ্জামান বলেন, ‘মামলার তদন্তে আমরা মৌখিকভাবে চাকরিচ্যুত এবং ভয়-ভীতির হুমকি ধমকির বিষয়টি পেয়েছি। কিন্তু প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আত্মসাৎতের বিষয়টি অডিট রিপোর্ট ছাড়া বলতে পারছি না। অডিট রিপোর্টে তারা দেখায়নি। অডিট রিপোর্ট হয়তো টাকা পয়সা খাওয়াইয়া ই করে দিছে।’ এক বছরের পাওনা বেতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্কুলের ফান্ডে যদি টাকা আসে, আর যদি শিক্ষকদের বেতন না দেয়া হয় তাহলে দুর্নীতির বিষয়টি বলা যাবে।’

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল মজিদ প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার নলেজে আসেনি। মামলা হলে তো প্রতিকার হবেই। আর টাকা যদি প্রতিষ্ঠানে থাকে, তাহলে আগে যে হারে বেতন পাইতেন সেই হারেই দিয়ে দেয়া উচিত বলে মনে করি।’