Amar Praner Bangladesh

বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া মোকাবেলা করে সবজি চাষে বদলাচ্ছে কৃষকদের ভাগ্য

খুলনা: বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের কৃষক বিবর্তিত জলবায়ূর সাথে সংগ্রাম করে কৃষি বিপ্লবে এখন মাঠে ময়দানে। বৈরী আবহাওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাতে এখন কঠোর সংগ্রামরত। এ যুদ্ধ গ্রামে গ্রামে মাঠে মাঠে বাড়ির আঙ্গিনায় আঙ্গিনায়। এ সংগ্রাম যেন সর্বত্র। প্রতিকূল পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার দেশ বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণঝড়, জলোচ্ছ্বাস এ দেশের মানুষের নিত্য সঙ্গী। আরো আছে তীব্র তাপদাহ, ঘনকুয়াশা, প্রচন্ড ঠান্ডা। এসব প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করেই জীবন চলে এদেশের মানুষের। এই ছোট্ট দেশে উত্তরের জনপদে তীব্র খরা আবার দক্ষিণের জনপদে ভারী বর্ষন। বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছে আর থামছে না। আর তাই খুলনার কৃষক প্রতিকূল পরিবেশের সাথে মানান সই বিকল্প পথ খুজছে। আর মাটির মাঝে তুলে আনছে ফসলের খাটি সোনা।
গত ২ যুগ আগের কৃষি কাজের সাথে বিস্তার ফারাক এখনকার প্রযুক্তি। যেখানে একদা সব্জি চাষ ছিল আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র সেখানে সব্জি চাষ এখন আর্শীবাদ। বৈরী আবহাওয়া ও প্রতিবেশকে হাতের মুঠোয় কব্জা করে মাঠের সেই কৃষক এখন সোনা ফলাচ্ছে। সব্জির মূল্যও এখন কম নয়। সারা বছর গড়ে কোন সব্জির দামই ৪০ টাকার নিচে নয়। কৃষক তাই কোমর বেধে কৃষিযজ্ঞে আমুল পরিবর্তন আনছে। তাই উচ্চফলনশীল সবজি চাষ খুলনাঞ্চলের কৃষকদের দুর্দিনকে হত্যা করে জন্ম দিয়েছে যেন এক নতুন সূর্য্যদয়ের। এ যেন দিন বদলের সনদ। কৃষকের ভাগ্য ক্রমেই বদলে দিয়েছে এই সব্জি চাষ বিপ্লব। লবনাক্ত এলাকা খুলনার গ্রামে গ্রামে চাষ হচ্ছে এ সবজি। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা এখন উচ্চফলনশীল জাতের শাক-সবজির চাষ করছেন। উপকূলীয়াঞ্চলে এটা একটা আশারবানী। কৃষি ক্ষেত্রে এ এক নতুন অগ্রযাত্রা। লোনাঞ্চল বলে খ্যাত উপকুলের এই বিশাল বাদামী বেষ্টনী এখন সবুজ বেষ্টনীতে রূপ নিয়েছে। যে ফসল আশপাশের জেলা থেকে আমদানী করা হত তা এখন এখান থেকেই রপ্তানী করা হয়। সব্জি কৃষকদের মাঝে এটি যেন এক দিন বদলের মাইল ফলক। বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা মুলত চিংড়ি চাষ প্রবন এলাকা। এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাকড়া চাষও হয়ে থাকে। ১৯৯৫ সাল থেকে এ অঞ্চলে চিংড়ি চাষে ব্যাপক সফলতা আসে। একশ্রেনীর চিংড়ি চাষীরা ঘুরে দাড়ায়। আর কৃষকরা নানা মারপ্যাচে সর্বশান্ত হয়ে পড়ে। এরপর গত ৬-৭ বছর বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের চিংড়ি চাষীরা সর্বনাশা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। সমন্বিত চিংড়ি চাষ প্রকল্পও চালু হয়। কিন্তু ভাইরাসের করাল থাবা থেকে রেহাই হয়নি এখনও। প্রাকৃতিক এই অনাকাঙ্খিত দুর্যোগের কারণে প্রান্তিক চাষীরা লোকসানে পড়ে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এ চাষে আর সুবিধা করতে পারছেনা। প্রতিষ্ঠিত চিংড়ি চাষীরা ব্যাংক ঋন সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ ও চিংড়ির পোনা উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যাক মাঠ পর্যায়ের চাষীরা এ পেশা বদল করে এখন ঝুকেছে সব্জি চাষে।
আর এই সব্জি চাষই এখন এ অঞ্চলের চাষীদের অন্যতম জীবীকার উৎস। চাষীরা দেশীয় বীজ বাদে হাইব্রীড চাষ করে অধিকফলন ফলাচ্ছে। আর তাতেই এনেছে তাদের জীবনে সচ্ছ্বলতা।
কৃষি বিভাগের পরামর্শে বৃহত্তর খুলনাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে মৎস্য চাষের পাশাপাশি ভেড়ীতে সব্জি চাষ এখন নজর কাড়ার মত। যেখানে কোনদিন সব্জি চাষের অস্তিত্বই ছিল না সেখানে এখন সবুজের সমরাহ।  ফকিরহাট উপজেলার রাখালগাছি গ্রামের কৃষক আবুল কালাম জানান, ৮-৯ বছর ধরে তিনি কৃষি কাজের সাথে আছেন। এটি তার প্রধান পেশা।  কৃষির সাথে মাছ চাষও করেন। চলতি বছর ৫ বিঘা জমিতে লাউ চাষ করে প্রায় ৫ লাখ টাকার বেচা কেনা করেছেন। প্রতিদিন ৩শ’ থেকে ৪শ’ লাউ বাজারজাত করেন। সাথে শসা ও করলা চাষ চলছে।
চুকনগর গ্রামের আমিত মন্ডল (৫৫) ছোট বেলা থেকেই কৃষি কাজ করে সংসার চালান। এ বছর ২ একর জমিতে প্রায় ৫শ’টি ঝারে লাউ ও বরবটি লাগিয়েছেন। প্রতিদিন ২-৩শ’ লাউয়ের পাশাপাশি ২-৩মণ বরবটি তুলছেন। এতে তার খরচ হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যেই তিনি ৮০ হাজার টাকার লাউ ও বরবটি বিক্রি করেছেন।
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা গ্রামের কৃষক সাদেক আলী জানান, তার জমিতে লাউ, বরবটি, মূলা ও ডাটা শাক রোপন করে তার খরচের টাকা উঠে এখন লাভের মুখ দেখেছে। গত বছর ৩শ’ ঝাড়ে আলাভী গ্রীণ জাতের শসা, টিয়া জাতের করলা এবং মার্টিনা জাতের লাউ বীজ রোপণ করেছিলেন। এবার লাউ শাক বিক্রি করে বেশ টাকা এসেছে। তিনি এক সময় চিংড়ি চাষের সাথে ছিলেন। এখন সেই পেশায় আর নেই।
এ ব্যাপারে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, রামপালে ২শ হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষক উচ্চফলনশীলসবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ এলাকা লবণাক্ত এবং মৎস্য ঘেরে পূর্ণ। ঘেরের পাশেই সবজি চাষ হয়।
উচ্চফলনশীলসবজি চাষে অল্প খরচে দ্বিগুণ লাভ সম্পর্কে লাল তীর সীড লিমিটেডের খুলনা এরিয়া ম্যানেজার মাহবুব-উল-হক বলেন, আলাভী গ্রীণ আমাদের নতুন জাতের বীজ। উন্নত মানের এ জাতের জীব চাষিদের মাঝে ব্যপক সাড়া ফেলেছে।
অপরদিকে লোনা অঞ্চল বলে খ্যাত সাতক্ষীরার তালা, পাটকেলঘাটা, কলারোয়া, আশাশুনি এলাকায় হাইব্রীড সব্জি চাষ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আঠারোমাইল তালা, পাটকেলঘাটা এলাকায় চাষীরা নতুন নতুন জাতের হাইব্রীড সব্জি চাষ করে এ অঞ্চলে বাজারজাত করছে। তাছাড়া ঢাকার ফড়িয়ারা ট্রাকে করে এ অঞ্চল থেকে সব্জি নিয়ে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, খুলনাঞ্চলের মাঠে মাঠে সময় অসময় সব্জি ফলানোর যে প্রচেষ্টা এখন সফলতার স্বাক্ষর বহন করছে সেই কৃষকরা রয়েছে বিভিন্ন এনজিও’র উচ্চহারের সুদের বেড়াজালে। এই কৃষকদের মুলধনের অভাব থাকায় তারা চাষের সময় উচ্চসুদে মহাজন এবং বিভিন্ন এনজিও ও সমিতি থেকে টাকা নিয়ে পরবর্তীতে লভাংশের সিংহভাগ তুলে দিতে হয় তাদের হাতে। আর প্রান্তিক চাষীরাতো দুষ্ট চক্রের কসাঘাতে ফড়িয়া ও পাইকারদের যাতাকলে পিষ্ট। তাই মাঠ চাষীরা ব্যাংকের সহজ ঋনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।