Amar Praner Bangladesh

রাজধানীতে গরু-খাসির নামে খাওয়ানো হচ্ছে কুকুরের মাংস

 

(কিছু অসাধু লোক কুকুর ধরে মাংস করে হোটেলে বিক্রি করছে। প্রতিটি কুকুরের মাংস বিক্রি হয় নগদ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। রাতে তিন-চারটি কুকুর ধরে মাংস বানিয়ে বিক্রি করলেই পকেটে আসে ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু, আমরা হোটেলে কী খাচ্ছি। কখনোও কি ভেবেছি বা চিন্তা করি? মানুষ টাকার জন্য সব করতে পারে। মানুষের মনুষত্ব, সততা আজ বিলীন। বিলীন রুচিবোধ। আমাদের সচেতন হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই)।

 

শের ই গুল :

 

খোদ রাজধানীর হোটেল-রেস্টুরেন্টে বিক্রি হচ্ছে কুকুরের মাংসের কাচ্চি বিরিয়ানি। গেল কয়েকদিন ধরেই ফেসবুকে ওয়ালে ওয়ালে ঘুরে-ফিরছে এমন একটি স্ট্যাটাস! তাতে কুকুর জবাই করে মাংস বানানোর ছবিও যুক্ত আছে।

এ নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। কুকুর বা শুকরের মাংস গরু-খাসি বলে বিক্রির ঘটনা নতুন নয়। কুকুর জবাই করে মাংস তৈরির কয়েকটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তা দেখে ভোজনরসিকরা রীতিমত তাজ্জব বনে গেছেন! এতদিন তারা কি তাহলে খাসির কাচ্চির নামে গিলেছেন কুকুরের মাংস দিয়ে তৈরি ‘স্পেশাল কাচ্চি’! রাজধানী ঢাকার রাস্তায় মোড়ে মোড়ে এখন বিরিয়ানির দোকান। তুলনায় কম দামে পেট ভরে খেতে এসব দোকানে যান ভোজনরসিকরা। সাধ্যের মধ্যে গরু-খাসির বিরিয়ানির দাম ৯০ থেকে ১২০ টাকা। আবার ডেকারেশন ভালো এমন দোকানে একই বিরিয়ানী বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৮০ টাকা। এই বিরিয়ানি নগরবাসীর প্রথম পছন্দের খাবার। তাই বিরিয়ানির ব্যবসাও রমরমা। কিন্তু, গরু-খাসির এই বিরিয়ানি এত কম দামে বিক্রি হয় কীভাবে! আসল ঘটনা জানলে আঁতকে উঠবেন। গরু-খাসির বিরিয়ানি বলে যা বিক্রি হচ্ছে, তা রান্না হয় কুকুরের মাংস দিয়ে।

সম্প্রতি অনুপ রনি নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী কুকুর জবাই করে মাংস বানানোর ছবি সংযুক্ত করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ২৮ মার্চ দেয়া স্ট্যাটাসটি হাজার হাজার শেয়ার হয়েছে। তিনি লেখেন, ‘গরু-খাসির মাংসের বিরিয়ানি আজ থেকে হোটেলে খাওয়া বর্জন করুন। মাংস দিয়ে খেলে মুরগির মাংস খাবেন। আর সবচেয়ে ভালো, মাংস বাদ দিয়ে মাছ সবজি দিয়ে খাওয়া। কিছু অসাধু লোক কুকুর ধরে মাংস করে হোটেলে বিক্রি করছে। প্রতিটি কুকুরের মাংস বিক্রি হয় নগদ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।

রাতে তিন-চারটি কুকুর ধরে মাংস বানিয়ে বিক্রি করলেই পকেটে আসে ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু, আমরা হোটেলে কী খাচ্ছি। কখনোও কি ভেবেছি বা চিন্তা করি? মানুষ টাকার জন্য সব করতে পারে। দেখুন রাতে কুকুরের মাংস করার দৃশ্য ধরা পড়েছে মোবাইল ক্যামেরায়। মানুষের মনুষত্ব, সততা আজ বিলীন। বিলীন রুচিবোধ। আমাদের সচেতন হওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি বাকরুদ্ধ। বাঙালি খাচ্ছে কি? নিচে দেয়া ছবি আপনার পরিবারকে দেখান। আর পরবর্তীতে এই বিরিয়ানি আর খাবেন কিনা ভাবুন!’ ভাইরাল হওয়া কুকুরের মাংসের স্ট্যাটাসের মন্তব্যে প্রায় সবাই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। গেল রমজানে রাজধানীর গুলশানের অলিভ গার্ডেন রেস্টুরেন্টে ইফতার সামগ্রীর সঙ্গে পাওয়া যায় শুকরের মাংস।

মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযানে ধরা পড়ে এ মাংস। এই চায়নিজ রেস্টুরেন্টে রমজান মাসে বিক্রির আয়োজন করা হয়েছিলো বাহারি ইফতারি। কিন্তু, বিএসটিআই-এর ওই অভিযানে বেরিয়ে আসে ভয়ঙ্কর তথ্য। ইফতারিতে শুকরের মাংস বিক্রির অভিযোগে ভোক্তা অধিকার আইনে রেস্টুরেন্টটিকে তখন দুই লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বছর ১৫ আগে আরিচা ঘাটের হোটেলেও বিক্রি হতো কুকুরের মাংস। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা যাত্রীদের কাছে এ মাংস বিক্রি করা হতো। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তোলপাড় ওঠে।

অবশেষে পুলিশ আরিচা ঘাটের আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে জবাই করা কুকুর এবং কুকুরের মাংসসহ কয়েকজনকে আটক করে। পুলিশ আদালতের মাধ্যমে তাদের জেলে পাঠালেও পরে তারা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে। সাভারের আশুলিয়ায় কুকুরের মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে বিক্রির অভিযোগে রাজীব (২২) নামের এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বিল্লাল (২৫) নামে আরও এক সহযোগী পলাতক রয়েছেন। আশুলিয়ার নারসিংহপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আল্লাহর দান- ৫ নামক দোকান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় সোমবার দুপুরে ওই ব্যবসায়ীকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত রাজীব বরিশাল জেলার মুলাদি থানার নুনচর গ্রামের চুন্নু হাওলাদারের ছেলে। আশুলিয়ার বিভিন্ন বাজারে তাদের আল্লাহর দান- নামে ৭টি বিরিয়ানির দোকান রয়েছে। এ ছাড়া পলাতক বিল্লাল হোসেন একই এলাকার আবুল কালাম হাওলাদারের ছেলে। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ভুক্তভোগী এক ক্রেতার অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার সন্ধ্যায় কয়েকজন সাংবাদিক ওই দোকানে যান। সেখানে কুকুরের মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয় কি না জানতে চান তারা। এ সময় আটক রাজীবের চাচাতো ভাই বিল্লাল মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলে কৌশলে সটকে পড়েন বিল্লাল। পরবর্তীতে রাত ১২টার দিকে ওই দোকানের মালিক রাজীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, আল্লাহর দান নামক ওই দোকানের বিরিয়ানি খেয়ে আলমগীর হোসেন নামের এক ক্রেতার সন্দেহ করেন।

এ সময় কিসের মাংস দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়েছে তা জানতে চাইলে ব্যবসায়ী রাজীব ও দোকানের কর্মচারীরা ওই ক্রেতাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। ভুক্তভোগী আলমগীর হোসেন বলেন, বিরিয়ানি খাওয়ার শুরুতেই আমার সন্দেহ হয়। পরে তাদের কিসের মাংস জিজ্ঞেস করলে গরু বলে জানিয়ে রাগারাগি করেন। তাদের মনোভাব দেখে বিরিয়ানি না খেয়ে ১৮০ টাকা দিয়ে চলে যাই। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ী সায়েদ হোসেন বিল্লাল বলেন, কিছু মানুষ চক্রান্ত করে আমাদের ফাঁসিয়েছে। আমাদের আশুলিয়ায় ৭টি শাখা। শাখা-৫ দোকানটি এক বছর হলো। এখানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বিক্রি হয়।

কাঠগড়া বাজারের আলিম কসাইয়ের কাছ থেকে আমরা গরুর মাংস কিনি। মাংস ল্যাবে পরীক্ষা করে যদি অন্য কিছু পাওয়া যায় আপনারা যে শাস্তি দেবেন, আমরা তাই মাথা পেতে নিব। কাঠগড়া বাজারে আলিম কসাই বলেন, প্রায় বছর ১২ বছর ধরে তাদের কাছে মাংস বিক্রি করি। শুক্রবার (১৩ মে) দেশি ছোট গরুর জবাই করেছিলাম। সেই মাংস নিয়েছে তারা। সেখানে হাড় চিকন হতে পারে। গরু জবাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের বাজার কমিটি প্রতিদিন যাচাই-বাছাই করে এখানে।

অন্যকিছু করার কোনো সুযোগ নেই। আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুব্রত রায় বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে অভিযুক্তকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। আলামত হিসেবে মাংস জব্দ করে পরীক্ষা উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জনের কাছে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। কোনো অভিযোগকারী না থাকায় আমি বাদী হয়ে মামলা দিয়ে আটক রাজীবকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছি। সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, আশুলিয়া থানার একজন কর্মকর্তা মাংস পরীক্ষার জন্য যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু এখনো আলামত হাতে পাইনি। আমাদের এখানে সম্ভব না হলে প্রয়োজনে ঢাকায় ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠাবো।

রাজধানীর আশেপাশে সহ উত্তরা আব্দুল্লাহ্পুর-টঙ্গী-গাজীপুর সহ বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরা বিরিয়ানী হাউজে কুকুর বিড়ালের মাংস সহ মরা গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব হোটেল রেস্তোরা বিরিয়ানী হাউজের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে।