Amar Praner Bangladesh

রাজধানী জুড়ে বেড়েছে ছিনতাই

 

(আলোশূন্য হওয়ায় বেড়িবাঁধ এলাকাগুলো প্রধান টার্গেট, মাদক সেবনকারী সহ পেশাদার ছিনতাইকারীরা প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে এদেরকে গ্রেফতার করলেও জেল থেকে বের হয়ে আবার তারা ছিনতাইয়ের পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। প্রয়োজন আরো কঠোর আইন। শাস্তির পাশাপাশি এদেরকে রিহ্যাবিং করে সংশোধন করা সময়ের দাবী।)

 

শাহিন পারভেজ মুন্না/নাজিম খান :

 

দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশের স্টাফ রিপোর্টার জিহানুল হক রাতুল তার স্ত্রীকে নিয়ে ধানমন্ডি ৭ নং রোড, বায়তুল আমান মসজিদের বিপরীত রাস্তায় রিক্সা যুগে বাসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি চলমান মটরবাইক নিয়ে দুজন যুবক হেলমেট পরিহিত অবস্থায় রাতুলের স্ত্রীর কাধে থাকা ব্যাগ টান দিলে ব্যাগ সহ রাতুলের স্ত্রী রাস্তায় পড়ে গেলে আহত হয়। ঐ সময় রাতুল স্ত্রীকে ধরতে গিয়ে নিজেও আহত হয়। ছিনতাইকারীরা রাতুলের স্ত্রীর ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। রাতুলের স্ত্রীর ব্যাগে ছিল নগদ কিছু টাকা এবং একটি আইফোন টুয়েলভ প্রোমেক্স যার দাম প্রায় ১ লক্ষ টাকা। ছিনতাইকারীদের হাতে ছিল রাম দা, আরেকজন চাপাতি বের করে “দাঁড়া” বলতেই নিমিষের মধ্যেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়ে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি মডেল থানায় একটি জিডি করা হয়। যাহার নং- ২৭২, তাং- ০৫/০৬/২০২২ ইং।

মোবাইল মডেল আইফোন- ১=প্রোমেক্স যার ইএফএমআই-৩৫৪৪৪০৮৯২১২৫৭৬৬ এবং আইএমই নং- ৩৫৪৪৪০১৯২১৫২৬৯৫। অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ ছিনতাইয়ের মামলা করতে বলে। কিন্তু মামলার ভোগান্তি এড়াতে মোবাইল ফোন ও টাকা হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। রাতুল যেখানে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন।সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে ঐ জায়গায় অন্তত পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।

যা গত মাস দুয়েক আগেও ছিনতাইয়ের প্রবণতা এতটা ছিল না বলে স্থানীয় লোকজন জানান। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যার পর অনেক বখাটে ছেলেরা এরকম নির্জন রাস্তায় এসে গাঁজা সেবন ও ছিনতাই করে। এ ব্যাপারে সবাই জানলেও কেউ ভয়ে কিছু বলার সাহস পায়না। এছাড়াও আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে রাজধানীর বেশ কিছু ছিনতাই স্পটের ঘটনা।

শেখেরটেক ৬ নম্বর সড়কের আফসু মিয়ার বাড়ির পাশে ভাঙারির দোকান এবং ময়লার ডাস্টবিনে কাজ করা ছেলেরা ছিনতাই করে থাকে। তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শ্যামলী হাউজিং এলাকার একাধিক দল সহযোগিতা করে। আদাবর থানা এলাকার শেখেরটেক, আদাবর ১০, ১৬, মনসুরাবাদ হাউজিং, সুনিবিড় হাউজিং, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন তুরাগ হাউজিং, হাড্ডিপট্টি, স্লুইজ গেট, আহমেদ নগর এলাকা ঘুরে ছিনতাইয়ের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে। নবোদয় হাউজিংয়ের জায়গাতেই শুধু নয়। মোহাম্মদপুর থানা এলাকার মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়, লাউতলা, কাটাসুর, শ্যামলি, কলেজগেট, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও লেগুনা ষ্ট্যান্ডে এসব ঘটনা এখন নিয়মিত।

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প সূত্র জানায়, ক্যাম্পের উত্তর অংশ, বাবর রোড, শ্যামলী, শিশুমেলা, কলেজগেট, শাহজাহান রোড এলাকায় ছিনতাইয়ে জড়িতদের বেশির ভাগই জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা। ক্যাম্পে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় গত দুই মাস ধরে ক্যাম্পের বেশ কিছু সংঘবদ্ধ চক্র বর্তমানে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের এলাকাজুড়ে আইন-শৃঙ্খলার টহল আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় অপরাধের প্রবনতা বেশি বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। ঐ এলাকাগুলোতে আমরা ডিউটিরত টহল গাড়ির টহল বাড়িয়ে দিয়েছি। যেকোনো ঘটনায় আমরা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।

যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমাদের থানা জুড়ে টহল অব্যাহত রয়েছে। মোহাম্মদপুর, আদাবরের পাশাপাশি রাজধানীর গাবতলী, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, ইসিবি চত্ত্বর থেকে কালসি পর্যন্ত। কল্যাণপুর, সায়েদাবাদ, সদরঘাট, কামরাঙ্গীর চর, হাজারীবাগ এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। গাবতলী দ্বীপনগর এলাকার বাসিন্দা শাহজালাল (ছদ্মনাম) বলেন, ‘বেড়িবাঁধে তো লাইট নাই। তাছাড়াও এই এলাকা জনশুন্য হওয়ায় সন্ধ্যার পর অন্ধকারে ছিনতাইকারীরা খুব সহজে ছিনতাই করার সুযোগ পায়। এছাড়াও তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকায় আশপাশের লোকজন ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পায়না।

গাবতলী এলাকার আরেক বাসিন্দা রেজাউল (ছদ্মনাম) হোসেন বলেন, ‘বাস টার্মিনাল, মাজার রোডের কোনায় প্রায়ই ছিনতাই হয়। কে বা কারা করে কেউ জানে না। এখন এমন কিছু লোক এলাকায় দেখা যায়। যাদের এলাকায় আগে কখনো দেখা যায় নি। মিরপুর-১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ (ছদ্মনাম) আহমেদ বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এখন ফুটওভার ব্রিজে ওঠা রিস্কের। ছোট গলিতে যেতেও ভয় লাগে। যে কোন মুহুর্তে ছিনতাই হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুলিশের টহল আরও বাড়ানো দরকার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, বাবুবাজার ব্রিজের আশপাশের এলাকা, গাবতলী বেড়িবাঁধ, বাড্ডা এলাকায় ছিনতাকারীরা ব্যাটারি চালিত রিকশায় ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে ছিনতাই করে ওই রিকশা করেই পালিয়ে যায়। আর তাদের আড্ডা হয়ে উঠেছে এসব এলাকার রিকশার গ্যারেজ। এদিকে হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, ইসলামবাগ, পোস্তাসহ আশপাশের এলাকায় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন বিক্রির হাঁট বসে বেড়িবাঁধের সিকশন এলাকায়। বেড়িবাঁধ সড়কের দুই পাশে প্রতিদিন বিকালে ৩ টা থেকে এই হাট বসে। রাজধানীর উত্তরা- এয়ারপোর্ট, জসিম উদ্দিন, আজমপুর-হাউজবিল্ডিং- আব্দুল্লাহ্পুর সহ টঙ্গী ষ্টেশন রোড পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে ঘামপার্টি সহ বিভিন্ন ছিনতাইকারীরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই মোবাইল ছিনতাই সহ বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটায়। এসব চোরাই মোবাইল বিক্রি হয় টঙ্গী বউ বাজার এলাকায়। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন বিক্রি হয় এসব অস্থায়ী দোকানে।

উত্তরখান তেরমুখ থেকে উলুখোলা নির্জন এই জায়গাতে প্রায় ছিনতাইয়ের পাশাপাশি দু’একটি করে লাশ পাওয়া যায়। উত্তরখান রাজাবাড়ী ঘাটপাড় থেকে কোটবাড়ী পর্যন্ত তুরাগ নদীরপাড়ে প্রতিনিয়ত চলছে ছিনতাই, মাঝে মাঝে শুনা যায় ছুরির আঘাতে আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনা। শুধু তাই নয় এপাড়ে অন্ধকার নির্জন থাকায় গড়ে উঠেছে মাদক ও পতিতাদের আনাগোনা। ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন জানা সত্ত্বেও এসব মোবাইলের খদ্দের কম নয়। কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, বেড়িবাঁধ সড়কটি আমাদের আওতাভুক্ত নয়।

বেড়িবাঁধের একটি অংশ হাজারীবাগ থানার, আরেকটি অংশ লালবাগ থানার অন্তর্ভুক্ত। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সিকশন এলাকার একজন বলেন, অনেক সময় দামি দামি মোবাইল ফোন কম দামে পাওয়া যায়। তাই অনেকেই এখান থেকে মোবাইল কিনতে আসে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার চারজনকে ছিনতাই করা মোবাইল ফোন বিক্রির দায়ে আটক করে আদালতে চালান করা হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে লালবাগ থানা এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে নাই।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) দৈনিক আমার প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চুরি ছিনতাই ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান শক্তভাবেই চলছে।বিশেষ করে মাদকাসক্তরা নানা অপকর্ম করে থাকে। এছাড়া ছিনতাই দমনে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি এবং নিচ্ছি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতে গেলে মামলা করতে হয়। মামলার ঝামেলায় জড়াতে চান না অনেকে। তাই তারা মোবাইল ফোন, টাকা বা ব্যাগ হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না করে যারা জিডি করছেন তাদের উদ্দেশে ডিসি বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ঝামেলার কথা চিন্তা করে আমরা সবাই এগিয়ে না এলে তো এদের আইনের আওতায় আনা একটু কঠিন হয়। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, মামলা অবশ্যই করবেন। তাহলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া আমাদের পক্ষে সহজ হবে। গ্রাম থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তার স্বামী মনিরুল ইসলাম সহ রাতের লঞ্চে করে ভোরে ঢাকার সদরঘাটে এসে পৌঁছায় হেলেনা।

সদরঘাট থেকে লোকাল বাসে করে ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে নামেন তাঁরা। হেঁটে কলাবাগানের বাসায় যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি প্রাইভেট কার থেকে কেউ একজন হেলেনার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। আচমকা টানে তাল সামলাতে না পেরে ওই প্রাইভেট কারের নিচে পড়েন হেলেনা। চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।হেলেনা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বামী মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা করেন।

বিষয়টি পত্রিকায় আসলে সবার নজরে আসলেও এখন পর্যন্ত এসব এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তার তেমন কোন ব্যবস্থা করা হয়নি।