Amar Praner Bangladesh

রিয়েল এস্টেট হাউজিং সিকিউরিটি গার্ড হারবাল ওষুধ এর আড়ালে এমএলএম কোম্পানির প্রতারণা

 

 

আর কে রুবেল :

 

রাজধানীর ঢাকা উত্তরা সহ আশপাশের এলাকাগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো এমএলএম কোম্পানি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের ফন্দি ব্যবহার করে এমএলএম ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যে মধ্যে প্রশাসন অভিযান চালালে কিছুদিন পরে আবার তারা সক্রিয় হয়ে ব্যবসা শুরু করে। তাদের এই ফন্দির জালে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এদেরকে কোন ভাবে থামানো যাচ্ছে না। কোন ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই ক্ষমতার দাপটে এসব ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

উত্তরার কিছু এমএলএম কোম্পানি গোপন ভাবে ব্যবসার পলিসি জানতে চাইলে তারা জানান তাদের সাথে আর্মি পুলিশ R A B তাদের ব্যবসায় জড়িত আছে। এক এক কোম্পানির এক এক ধরনের পলিসি আর এসব বলে সাধারণ মানুষকে তাদের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা এ যেন আলাউদ্দিনের চেরাগ।

নীতিমালা করলেও লাইসেন্স দেয়নি সরকার। সার্টিফিকেট ও ট্রেডলাইসেন্সে চলছে ব্যবসা।
২০০২ সালে ডেসটিনিসহ দেশে এমএলএম কোম্পানি ছিল ১৬টি। ২০০৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৪টিতে। বর্তমানে দেশে ২ শতাধিক এমএলএম কোম্পানি কাজ করছে। কিন্তু একটি কোম্পানিকেও লাইসেন্স দেয়নি সরকার। অর্থাৎ দেশে এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসা একেবারেই নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রতারণার ধরন পাল্টে ই-কমার্স, ই-বিজনেস ও ডিরেক্ট টেলিমার্কেটিং, ক্যাশলেস সোসাইটি প্রভৃতি নামে বিভিন্ন ‘এমএলএম কোম্পানি’ গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো কোম্পানি ফুড সাপ্লিমেন্ট, প্রসাধনসামগ্রী ও হারবাল ওষুধ বিপণনের নামে এমএলএম কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদিও ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৮২-তেও ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আছে। এছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান থেকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসছে। তারা মাল্টিপারপাস আদলের কোনোভাবে একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করেই প্রতারণার পসরা নিয়ে বসছে। কেউবা শুধু ট্রেড লাইসেন্স জোগাড় করেই ‘অলৌকিক পদ্ধতির’ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার, পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইল মহাখালী গুলশান উত্তর সহ কয়েকটি এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বড় পরিসরে অফিস নিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি। এরপর তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিলেই ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্যাকেজের পণ্য। এসব প্যাকেজে আছে গৃহস্থালি পণ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, হোম এপ্লায়েন্স পণ্য, প্রসাধন ও টয়লেট্রিজ পণ্য এবং হারবালসহ নানা ধরনের পণ্য। এরপর এসব পণ্যের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করা এবং অসত্য, কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য না দেয়ার শর্তে লাইসেন্স নেয়ার কথা বলা হয় কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে। কিন্তু লাইসেন্সের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি এড়িয়ে প্রতারক চক্র কেবল জয়েন্ট স্টকের অনুমোদন আর নামের ছাড়পত্র নিয়েই প্রতারণার বাণিজ্য খুলে বসে। সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশনের অনুমোদন নেয়ার সময় তারা ‘ক্যাটাগরি’ কলামে ব্যবসার ধরন হিসেবে আমদানি-রপ্তানি, হারবাল পণ্য উৎপাদন, বিক্রি, আইটি সফটওয়্যার, বহুমুখী পণ্য বিপণন, ট্র্যাভেল এজেন্সি, বৃক্ষে বিনিয়োগ, অদৃশ্য স্বর্ণ ব্যবসা, সর্বরোগমুক্তির ব্রেসলেট বিপণন প্রভৃতি উল্লেখ করে। কেউ আবার রিয়েল এস্টেট হাউজিং ও সিকিউরিটি এর নামে এল এম এল কোম্পানি করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদের বেশির ভাগেরই বৈধ অনুমোদন নেই, দেশে প্রচলিত ব্যবসা-বাণিজ্য, রীতিনীতির সঙ্গেও কোনো মিল নেই। সরকারের অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এরা। অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্য বানাচ্ছে সহজ-সরল তরুণ-তরুণীদের। এর মাধ্যমে নিম্নমানের ইলেকট্রনিকসামগ্রী ৩-৪ গুণ বেশি দামে সদস্যদের ধরিয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা।

ভার্চুয়াল মাধ্যমেও এমএলএম ব্যবসা পরিচলনা করছে কিছু কোম্পানি। বলা হচ্ছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ৫০টি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলেই প্রতিদিন দেড় ডলার করে পাবেন। মাসে ৪৫ ডলার, যা বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পৌনে ৪ হাজার টাকা। কেবল সাড়ে ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে সদস্য হলেই কমপক্ষে ১২ মাস এ ডলার আয়ের সুযোগটি পাওয়া যাবে। এমন লোভনীয় প্রস্তাব ছড়িয়ে দিয়েই ১৫-২০টি নামসর্বস্ব ইন্টারনেটভিত্তিক এমএলএম কোম্পানি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বেকার তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গৃহবধূরাও এ প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন। নিত্যনতুন কৌশলে নিরীহ মানুষজনের জমানো সঞ্চয় লুটে নেয়ার দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছেই না।

আবার, হাতের কবজিতে ব্যবহারযোগ্য অপ্রয়োজনীয় ‘ব্রেসলেট’কে পুঁজি করেও ৭-৮টি এমএলএম কোম্পানি টাকা হাতানোর ফাঁদ পেতে বসেছে। অভিজাত মার্কেট বা অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চাকচিক্যময় অফিস সাজিয়ে বসছে প্রতারকরা। চীন থেকে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে অবৈধভাবে আনা ১৭০ টাকার ব্রেসলেট বিক্রি করা হচ্ছে ৫ হাজার ৮১০ টাকায়। বলা হচ্ছে, এটা ‘বায়ো এনার্জেটিক ব্রেসলেট’। ব্যবহারকারীকে ২০০ রকম রোগমুক্তির গ্যারান্টিও দেয়া হচ্ছে। আধুনিক সমাজের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাও সেসব ব্রেসলেট সংগ্রহের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। কিন্তু প্রকৃত দামের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি দামে ব্রেসলেটটি কেনাবেচা করার বিষয়টি নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছেন না। বহু স্তরবিশিষ্ট বিপণন ব্যবস্থা বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন নয়।

তাদের বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। দেশে করোনা সংক্রমণের আগে এ ধরনের ১৫৬টি এমএলএম প্রতিষ্ঠানের তালিকা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এসব প্রতিষ্ঠান মুদ্রা পাচারের সঙ্গে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখছে দুদক। দেশের সব বিমানবন্দর ও সীমান্ত চেকপোস্টের ইমিগ্রেশন পুলিশের দপ্তরে এমএলএম প্রতারকসহ ৫৯ জনের নামের তালিকা ঝুলছে। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তালিকাভুক্তদের মধ্যে অন্তত ২৬ জন এমএলএম ব্যবসায়ীর কেউ কেউ ইমিগ্রেশনে তালিকা আসার আগেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন।

জানা যায়, ডেসটিনি গ্রুপের অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণার ফাঁদ ধরা পড়ার পর সরকার বিষয়টি প্রথম আমলে নেয় ২০১২ সালে। এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসায়ের মাধ্যমে এক যুগ ধরে (২০০০-১২) ডেসটিনি কোম্পানি মানুষের কাছ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রতারণা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছে। প্রায় সব প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিরা। গ্রাহকের অর্থে তারা নিজেদের নামে বাড়ি গাড়ি করেছেন। শত কোটির বেশি টাকা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে ডেসটিনির ৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর এদিকে ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রণয়ন করা হয় মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন। এ আইনের অধীনে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে করা হয় বিধিমালা, যা আবার সংশোধন হয়ে।

এমএলএম বিতর্কিত পদ্ধতির ব্যবসা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এমএলএম কোম্পানির প্রতারণা ধরা পড়ছে। ডেসটিনির প্রতারণা ধরা পড়ার পর বরং উচিত ছিল বাংলাদেশে এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া। তা না করে উল্টো একটি আইন করা হয়েছে, যার আদৌ কোন কার্যকারিতা নেই। এ বিষয়ে আরও জানা যাবে পরবর্তী প্রতিবেদন।