Amar Praner Bangladesh

রেলপথে বেড়েছে দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনা অনিয়মে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

 

(সারাদেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু রেল ক্রসিং সুরক্ষার কেউ দায়িত্ব নেয়নি। বরং দায় চাপিয়েছে একে অপরের। ফলে একের পর এক রেল ক্রসিংয়ে মানুষ মারা গেলেও কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না।)

 

শের ই গুল :

 

ঔপনিবেশিক আমলে সৃষ্ট তখনকার আধুনিক ও নিরাপদ পরিবহন হিসেবে রেলওয়ের জন্ম। সারাবিশ্বে রেলওয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ যাত্রী পরিবহন হিসেবে স্বীকৃত। ইউরোপের আধুনিকতম যাত্রী পরিবহনে এখন রেল পরিবহন সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে রেলওয়ে যাত্রীসেবার মান যেমন খারাপ তেমনি জনমানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টিতে অনন্য। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সারাদেশের অরক্ষিত রেল ক্রসিংগুলো।

সারাদেশের রেলক্রসিংয়ের ৮২ শতাংশই অরক্ষিত। এসব ক্রসিংয়ে ট্রেন চলার সময় যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেই। পাহারাদারও নেই। এ কারণে রেলক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত ছয় বছরে ট্রেন দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়েছে, তার ৮৩ শতাংশই মারা গেছে রেলক্রসিংয়ে। কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রামে মিরসাইয়ে রেললাইনের দূর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়। প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজে পাওয়া যায়, রেল দূর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাজির মোড় রেলক্রসিংয়ে ভটভটিতে ট্রেনের ধাক্কায় তিনজন নিহত হলে, চাঁপাই নবাবগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ঐ রেলক্রসিংটিসহ আরও একটি রেলক্রসিংয়ে বাঁশের বার বসানো হয়েছিলো। এভাবে রেল দূর্ঘটনার মৃত্যুর উদাহরণ রয়েছে শতশত। দীর্ঘদিন দক্ষিণ কোরিয়ায় ছিলেন, লিয়ানা ফ্যাশনের মালিক মিজানুর রহমান, তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর কোরিয়ার রেলে যাতায়াত করেছেন।

তিনি বলছিলেন, সেই দেশের অত্যাধুনিক ট্রেন লাইন এবং নিরাপত্তা বিষয়ের কথা। বাংলাদেশের ট্রেন লাইন দেখে তিনি হতভাগ। টঙ্গী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত শহরের উপর দিয়ে চলছে ট্রেন। বর্তমানে এখানে যতগুলো ট্রেন লাইন আছে, আরো ২টি লাইন এখানে সংযুক্ত হচ্ছে। প্রতি ১৫ মিনিট পর পর আসা যাওয়া করছে ট্রেন। এই সময় আরো কমে যাবে নতুন ট্রেন সংযুক্ত হলে।

এখানে যতগুলো রেল ক্রসিং রয়েছে প্রত্যেক স্থানে থাকা উচিৎ ট্রেন লাইনের নিচ দিয়ে রাস্তা অথবা ট্রেনের পূর্বপাশ দিয়ে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত থাকবে বাইপাস বড় সড়ক প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এবং মহাসড়কের সাথে সরাসরি সংযুক্ত নয় এমন রেল ক্রসিংয়ের স্থানে থাকবে ফুড ওভার ব্রিজ। অতীব জরুরী সড়ক ছাড়া বাকী গুলো বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন। সম্পূর্ণ রেললাইনের দুই পাশে থাকবে নিরাপত্তা বেষ্টিত ওয়াল। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী: সারাদেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১।

এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। এসব ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। আরও আছে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়কে। সরকারের পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের ওপর সড়ক নির্মাণ করার কারণে রেলক্রসিং সৃষ্টি হয়েছে।

রেলের নিজেদেরও রেলক্রসিং আছে। রেলসহ এই সরকারি সংস্থাগুলো গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু রেলক্রসিং সুরক্ষায় কেউ দায়িত্ব নেয়নি। বরং দায় চাপিয়েছে একে অপরের। ফলে একের পর এক রেলক্রসিংয়ে মানুষ মারা গেলেও কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। রেলের তথ্য থেকে জানা যায়: ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৭৫ জন। এর মধ্যে ১৮৫ জনই প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে। আমরা মনে করি এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়। কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ। যে সংস্থার সড়ক হোক না কেন রেলক্রসিংয়ে সুরক্ষা না দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে।

সঙ্গত কারণে রেলক্রসিংয়ের দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের হলেও এইসব হত্যাকাণ্ডের দায় কেউ স্বীকার করে না। আমরা আশা করি এই বিষয়ে সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেবে যা সব সংস্থা সমন্বয় করে রেলক্রসিংগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সংস্কার করবে এবং জনমানুষের চলাচলকে নিরাপদ করবে। নতুবা এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্র পরিচালনার একটি দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত হবে। যা সরকারে জন্য শুভ কোন কিছু বয়ে আনবে না। কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের মিরসরাই-সীতাকুণ্ডে রেললাইনে পাথর কম। লাইনে ত্রুটিও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ফলে এসব জায়গায় ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।

সীতাকুণ্ড ও পাহাড়তলী স্টেশনে ঝুঁকি অন্য রকম। এই দুই স্টেশনে গাছের জন্য আউটার সিগন্যাল (স্টেশনে ট্রেন ঢোকার প্রথম সংকেত বা অনুমতি) দেখতে পান না চালক। এতে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। শুধু তা-ই নয়, অনুমোদিত ৩০ লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান থাকে না। স্টেশনমাস্টাররাও ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় তূর্ণা ট্রেনের সঙ্গে উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১৬ জন।

এ ছাড়া ছোটখাটো আরও অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেছেন, কেউ পঙ্গু হয়েছেন। সব মিলিয়ে ট্রাফিক সিস্টেমের অব্যবস্থাপনায় ‘নিরাপদ’ ট্রেনযাত্রা হয়ে উঠেছে অনিরাপদ। রেল কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনেও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রাফিক সিস্টেমের অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। রেলসচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীরের চট্টগ্রাম যাওয়া উপলক্ষে গত ২৭ মে তূর্ণা এক্সপ্রেসে করে চট্টগ্রামে আসার পথে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। পর্যবেক্ষণকালে আখাউড়া থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে ৩০টি অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান পাননি কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ বিষয়ে সতর্ক করলেও টনক নড়েনি রেল প্রশাসনের। কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে রেলওয়ের ট্রাফিক, প্রকৌশল ও সংকেত বিভাগ মিলে একটি প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এনামুল হক সিকদার। এতে বলা হয়, প্রতিটি স্টেশনে পেপার লাইন ক্লিয়ার (পিএলসি) অর্থাৎ ট্রেন পরের স্টেশনে যাওয়ার অনুমতি যথাযথ নিয়মে দেওয়া হয় না। স্টেশন মাস্টারের সামনে থেকে পিএলসি দেওয়া হয়।

অথচ পিএলসি দেওয়ার নিয়ম হলো স্টেশনের আগে হোম সিগন্যালের পরপরই। অনেক স্টেশনে রেলের কর্মচারী নয় বা বহিরাগতদের দিয়ে পিএলসি দেওয়া হয়। যেমন সদর রসুলপুর স্টেশনে পিএলসি দেয় বহিরাগত লোকজন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবার ইমামবাড়ি স্টেশন, কুমিল্লা জেলার সদর রসুলপুর এবং ফেনীর ফাজিলপুর স্টেশনে প্রসিড সিগন্যাল (স্টেশন মাস্টার বের হয়ে ট্রেন ঠিকঠাকমতো আছে কি না দেখা) দেওয়া হয় না। এতে ট্রেনের কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা নির্ণয় না করায় দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকে যাচ্ছে এসব স্টেশনে। আখাউড়া-চট্টগ্রাম রেলপথের মধ্যে কয়েকটি সেকশনে, যেমন ফেনীর মুহুরিগঞ্জ, মিরসরাইয়ের মাস্তানগর, মিরসরাই-সীতাকুণ্ডে অনেক জায়গায় ট্রেন খুব বেশি ঝাঁকুনি দেয়।

এমনকি ট্রেন এক পাশে হেলে যায়। এসব রেললাইনে পাথর কম ও রেললাইনে ত্রুটির কারণে এমন ঝাঁকুনি দেয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাই দ্রুত মেরামত না করা হলে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটতে পারে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ প্রাণের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সব বিভাগের বিষয়গুলো তদারকি করছি। যাদের গাফিলতি পাচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেখানে সমস্যা, সেগুলো সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি। সম্প্রতি রেলমন্ত্রী বলেছেন ট্রেনকে ধাক্কা দিয়ে কেউ যদি দুর্ঘটনা ঘটায়, এ দায় কি রেলের।