Amar Praner Bangladesh

সাতক্ষীরা প্রানসায়ের খাল এখন বড় ডাষ্টবিনে পরিণত হয়েছে

মোঃ আশিকুর রহমান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ঃ প্রাণসায়ের খাল এখন সাতক্ষীরা শহরের বড় ডাস্টবিনে পরিনত হয়েছে। বড় বাজার ব্রিজ এবং কেষ্ট ময়রার ব্রিজের পাশে গেলে বোঝা যায় সমগ্র খালের অবস্থা। শুধু তাই নয়, প্রাণসায়র খালের আরো অনেক জায়গায় এরকম ডাস্টবিনের মত দেখা যায়। শুধু কি তাই দেখা মিলবে চটের বস্তা দিয়ে ঘেরা বাথরুম। খালের পাশে দখলের জন্য এক শ্রেণির মানুষ গাছের গায়ে বস্তা দিয়ে আবর্জনার স্তুব তৈরি করেছে। সাতক্ষীরা পৌরসভার ডাস্টবিনগুলো প্রতিদন পরিস্কার করা হয়। কিন্তু প্রাণসায়ের খালের ডাস্টবিনগুলো কখনো পরিষ্কার করা হয় না। সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রায় সব বড় বড় ড্রেনগুলার বর্জ্য এই খাল দিয়ে নিস্কাশিত হয়। কিন্তু প্রাণসায়ের খাল নিজেই বর্জ্যরে পরিপূর্ণ হওয়ায় সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রায় সব বড় বড় ড্রেনগুলা দিন দিন কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরা শহরের মানুষ ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়তে যাচ্ছে। দূষণে কালো হয়ে গেছে নোংরা পানি। খালের বুকে ময়লার ভাগাড়টা যেনো দাঁত ভেংচাচ্ছে। একটু দূরেই বরফকল, শৌচাগার। বাণিজ্যিক দোকান, বসত ঘর আর মাছের বাজারও আছে খালের বুক জুড়ে। গড়ের কান্দায় পাড় থেকে খালের বুকে এগিয়ে দখলের প্রতিযোগিতা ঘোষণা করছে প্রভাবশালীর পাকা দেওয়াল। পাকা পুলের কাছে খালের ওপর উপহাস ছড়াচ্ছে গড়ে ওঠা ভবণ।
অনেক আগেই মজে গেছে প্রাণসায়ের। জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে ১৮৬৫ সালে কাটা এই খাল তাই এখন প্রাণহীন। বছরের পর বছর ধরে শহরের বর্জ্য মিশতে থাকায় ঐতিহাসিক এই খাল পরিণত হয়েছে ডাস্টবিনে। তাই একসময় যে খালের পানি মানুষ পান করতো, সে পানির কাছে আসতে এখন রুমাল চাপা দিতে হয় নাকে। শহরের মাঝ বরাবর অবস্থানের কারণে শহরবাসিকে নিত্যদিন এই খাল পাড়ি দিতেই হয়। শুনতে হয় প্রাণসায়রের প্রাণ হারানোর আর্তনাদ। কিন্তু সে আর্তনাদও চাপা পড়ে যায় প্রভাবশালীদের খাল দখলের মচ্ছবে। শহরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠার বদলে এই খাল তাই এখন বিষের কাঁটা হয়ে ব্যথা ছড়ায় সাতক্ষীরাবাসির বুকে। জমিদার প্রাণনাথের খোঁড়া এই খালের সংযোগ দক্ষিণের মরিচ্চাপ নদী থেকে উত্তরের নৌখালী খালের সঙ্গে। প্রাণসায়ের আর সায়রের খাল নামেও পরিচিতি আছে এর। খননের পর এই খালই হয়ে উঠেছিলো সাতক্ষীরা শহরের যোগাযোগের অন্যতম রুট। মাল আর যাত্রীবাহী বড় বড় নৌযান চলাচলে এক সময় ব্যাস্ত থাকতো প্রাণসায়ের। খননকালে এর দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১৩ কিলোমিটার। প্রস্থ ছিলো প্রায় ২শ’ ফুট। কিন্তু সেই প্রশস্ততা কমে এখন অনেক স্থানেই ২০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। লঞ্চ-নৌকা তো দূরের কথা, ভেলা ভাসানোর মতো ¯্রােত নেই প্রাণহীন প্রাণসায়রে। অথচ একসময় ইছামতির হাড়দ্দাহ দিয়ে কলকাতা খাল হয়ে বড় বড় স্টিমারই ঢুকত প্রাণসায়ের খালে। এই খাল খননের ফলে সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে দ্রুত। এ শহর তাই পরিণত হয় সমৃদ্ধিশালী নগরে। কিন্তু ১৯৬৫ সালের দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বেশ ক’টি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হলে প্রাণসায়রের মৃত্যুযাত্রা শুরু হয়।
স্লুইস গেট বানানো হয় ইছামতির হাড়দ্দাহ খাল, কলকাতার খাল, বেতনা নদীর সংযোগ খাল, বালিথা, খেজুরডাঙ্গি নারায়ণজোল ইত্যাদি স্থানে। এরই ধারাবাহিকতায় খোলপেটুয়া নদীর ব্যাংদহা খালের মুখে স্লুুইসগেট নির্মাণের  চেষ্টা শুরু হলে প্রাণসায়রের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। নদীর ¯্রােতে খালের মধ্যে ঢুকতে না পেরে পলি জমে ভরাট হতে থাকে প্রাণসায়র। শোনা যায়, এ খালের তীরে নাকি গড়ে উঠবে দৃষ্টি নন্দন পার্ক। যে পার্কের দোলনায় দোল খেতে খেতে একদিন প্রজন্মের শিশুরা জানতে পারবে আমাদের গৌরব গাঁথা ইতিহাস আর ঐতিহ্যের কথা।