স্বাধীন বাংলাদেশে গণমাধ্যমের চলার পথে ভাল নেই সাংবাদিকরা

 

(ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চাইলেও সবকিছু লেখা যায় না। পুরো মিডিয়াতে এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে। আর প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত না হওয়ায় মানুষ পত্রিকা পড়তে চায় না। যা পত্রিকার সার্কুলেশন ও আয়ে প্রভাব ফেলছে। এর অন্যতম কারণ হল অদক্ষ ও অপেশাদার লোকজন বাজারে সংবাদপত্র নিয়ে এসেছে। পত্রিকা মিডিয়াভুক্ত করার পূর্বে যে পরিমাণ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়ম কানুনের হিড়িক দেখা যায় সেই তুলনায় পত্রিকার প্রকাশকরা তেমন কোন সুবিধা পায় না।)

 

শের ই গুল :

 

স্বাধীন বাংলাদেশে গণমাধ্যমের চলার পথ কখনও মসৃণ ছিল না। এখনও মসৃণ নেই। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গণতন্ত্রের যাত্রাপথে আমরা যেমন বারবার হোঁচট খেয়েছি। তেমনি মিডিয়ার স্বাধীনতার লড়াইও বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ৪৮ বছরেও তার সামান্যও উন্নতি হয়েছে এমন দাবি করা যায় না।

যদিও একথা সত্য যে, গণমাধ্যমের আকার বেড়েছে। ১৯৭২-৭৫ সময়ে মিডিয়া বলতে শুধু সংবাদপত্রকেই বোঝাতো। তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিকাশ ঘটেনি। টেলিভিশন বলতে ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’। তার কাজই ছিল সরকারের কর্মতৎপতা আর মন্ত্রী ও সরকার দলের নেতাদের বক্তব্য প্রচার। ফলে বাংলাদেশ টেলিভিশন সে সময়ও জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল না। তবু সিনেমা বা নাটক দেখার জন্য মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসতেন। খবর হলে বন্ধ করে দিতেন।

এত বছর পরেও বর্তমানেও চরম দুঃসময় পার করছে দেশের সংবাদপত্র। প্রতিনিয়ত এই সমস্যা বাড়ছে। সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল পত্রিকার নিউজের প্রতি মানুষের আস্থা তলানিতে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চাইলেও সবকিছু লেখা যায় না। পুরো মিডিয়াতে এক ধরনের আতংক বিরাজ করছে। আর প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত না হওয়ায় মানুষ পত্রিকা পড়তে চায় না। যা পত্রিকার সার্কুলেশন ও আয়ে প্রভাব ফেলছে।

আশির দশকে সংবাদপত্র এভাবে চাপের মুখে থাকায় বিবিসি রেডিও বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বর্তমানে সংবাদপত্রের বিকল্প হিসাবে ফেসবুক ও টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এর সুযোগ নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে একটি মহল। আরেকটি সমস্যা হল বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের (জনসংখ্যার বোনাসকাল) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ।

প্রায় ৩ কোটি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। বিশাল সংখ্যক এই জনগোষ্ঠির বেশিরভাগই কাগজে ছাপা সংবাদপত্র পড়ে না। তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইনের উপর নির্ভরশীল। ফলে কাগজের পত্রিকার সার্কুলেশনে এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংবাদপত্রে সংকটের আরেকটি কারণ হল গত ৫ বছরে এখাতে টেকসই কোনো বিনিয়োগ আসেনি।

এর অন্যতম কারণ হল অদক্ষ ও অপেশাদার লোকজন বাজারে সংবাদপত্র নিয়ে এসেছে। শুরুতে এরা উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করার জন্য অবাস্তব কিছু স্বপ্ন দেখায়। ধারনা দেয়, সার্কুলেশনে অমুক পত্রিকাকে টপকে যাবে। ৬ মাস কিম্বা এক বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠান লাভজনক করে দেয়া নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা দেয়। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে বেশি টাকা বেতন দিয়ে ভাল ও পেশাদার কিছু সাংবাদিকও নিয়ে আসে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের পরে কথা আর কাজের মিল না পাওয়ায় মালিক পক্ষ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। এতে আগে থেকে পত্রিকার সম্পাদকসহ কর্তা ব্যক্তিরা মালিক পক্ষের কাছ থেকে নানা ধরনের সুবিধা হাতিয়ে নিলেও পেশাদার সাংবাদিকদের জীবনে দীর্ঘ বেকারত্ব ও দুর্বিসহ কষ্ট নেমে আসে।

এভাবে কয়েকটি প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ায় ভাল কোনো উদ্যোক্তা এখানে বিনিয়োগে আসছে না। সামগ্রিকভাবে যা শিল্পে আভ্যান্তরীণ প্রতিযোগিতা কমেছে। যা সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন, প্রমোশন ও বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি তেল মেরেছে ও অথচ সবচেয়ে কম সুবিধা পেয়েছে সাংবাদিকরা।

সব পেশার লোকজন নিজস্বভাবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, আবাসনসহ সরকারের কাছ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা লুফে নিয়েছে। খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকরা ব্যাংক ঋণের জন্য গেলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে পেশার পরিচয়ে ঋণ পাওয়া কঠিন। সংবাদপত্রের দুর্দিনের অন্যতম আরেক কারণ হল পত্রিকার প্রচার সংখ্যা নিয়ে সীমাহীন মিথ্যাচার ও নজিরবিহীন দুর্নীতি। গত ১১ ফেব্র“য়ারি সংসদে তথ্যমন্ত্রীর দেয়া হিসাব অনুসারে সারাদেশে ১ হাজার ২৪৮টি দৈনিক পত্রিকা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৫০২ এবং সারা দেশে ৭৪৬টি।

এছাড়া সারাদেশে সাপ্তাহিক পত্রিকা রয়েছে ১ হাজার ১৯২টি, মাসিক ৪১৪টি ও অন্যান্য ৪১টি। এর বাইরে দুই হাজার ২১৭টি অনলাইন মিডিয়া রয়েছে। যার মধ্যে অনলাইন পত্রিকা ১ হাজার ৮৭৪টি ও ইন্টারনেট টেলিভিশন ২৫৭টি, অনলাইন রেডিও ৪৫টি এবং ই- পেপার ৪১টি। কিন্তু দৈনিক পত্রিকার প্রচার সংখ্যার ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা ডিএফপি সীমাহীন মিথ্যাচার করছে। ডিএফপির তথ্যে দেয়াল পত্রিকাগুলোরও লাখ লাখ সার্কুলেশন দেখানো হয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, রাজধানীর ফকিরাপুলও বিভিন্ন জায়গা থেকে শুধু মাস্টহেড পরিবর্তন করে অন্যান্য সব সংবাদ ঠিক রেখে একেকটি প্রেস থেকে একাধিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় এই সব ভুইঁফোর পত্রিকার মালিক পক্ষ একদিকে সরকারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, অপরদিকে সংবাদপত্রের নামে কম শুল্কে নিউজ প্রিন্ট আমদানি করে বেশি দামে বাজারে বিক্রি করছে।

এছাড়াও গাড়িতে সংবাদপত্র, প্রেস, সাংবাদিক জাতীয় স্টিকার ব্যবহার এবং মানুষকে ব্লাকমেইল করে টাকায় আদায়ের ঘটনাতো সবার জানা। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও ভোট ব্যাংক তৈরির জন্য এসব পত্রিকার লোকজনকে সংগঠনের মেম্বাররশিপ দিচ্ছে। সংবাদপত্রের আরেকটি সমস্যা হল বেসরকারি বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া। দেশে ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির থাকায় বিজ্ঞাপন কমেছে। এছাড়া যত বেশি গণমাধ্যমের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, ওই হারে বিজ্ঞাপনের বাজার বাড়েনি। ফলে বিদ্যমান বিজ্ঞাপন নিয়ে এখানে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ফলে খুব কম রেটেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ছাপা হচ্ছে।

স্বাভাবিক কথা হল, কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্রান্ডিং ও প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞাপন পেতে হলে তদ্বিরতো লাগেই। এরপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে হচ্ছে। এসব কারণে আগামীতে সংবাদপত্রের জন্য হয়তো অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে। ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

বন্ধ হয়েছে আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান। ভিন্নমতেরই আরও দু’একটি যে সংবাদপত্র আছে, আর্থিক অনটনে সেগুলোও ধুকছে। ১৯৭৫ সালে আইন করে সরকারের গুণ-কীর্তন করার জন্য চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এখন যারা চালু আছে, তার প্রায় সবই সরকারের কীর্তন গাইছে।

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে এই বলে সাবধান করে দিয়েছেন যে, ‘এসব মিডিয়ার লাইসেন্স তিনি দিয়েছেন। যে দিতে পারে, সে নিতেও পারে।’ ফলে এখন সবাই সেলফ-সেন্সরড। সত্য প্রকাশ খাবিখাচ্ছে।

এরমধ্যে সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ধুন্ধুমার ছাঁটাই প্রক্রিয়া চলছে। যেসব চ্যানেল এক সময় লাভজনক ছিল, সেগুলোতে এখন লোকসান গুণছে। ছাঁটাই হচ্ছে সাংবাদিক। ফলে গণমাধ্যমের কর্মীদের জন্য এখন কোনো সুখবর নেই। তবু আমরা সুদিনের অপেক্ষা করছি। শুভবুদ্ধির প্রতীক্ষায় আছি। ‘আমরা তো তিমির বিনাশী হতে চাই-আমরা কি তিমির বিলাসী?