Amar Praner Bangladesh

স্বাস্থ্য সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্ড

 

* সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্ড

* মা ও শিশুরা বিনা মূল্যে পাচ্ছে সেবা ও স্বাস্থ্য তথ্য

 * এ প্রকল্প সফল হলে সরকারি ভাবে নেয়া হতে পারে এ কার্যক্রম

 

গোলাম সারোয়ার :

আমাদের দেশে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা বিশেষ করে নারী ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এক প্রকার অপ্রতুল। অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বেশির ভাগ নারীই প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী সেবা সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। তারা জানেন না গর্ভাবস্থায় কখন, কোথায় সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাবে। এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে তাজউদ্দীন আহমদ অ্যান্ড সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্ড।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ কার্ডের মাধ্যমে একজন গর্ভবতী মা চারবার প্রসবপূর্ব সেবা সম্পর্কে অবহিত হবেন। কোথায়, কখন ও কোন ব্যক্তির কাছে এ সেবা পাওয়া যাবে ফোন নম্বরসহ কার্ডে এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। গর্ভাবস্থায় ১ম (৪ মাসে), ২য় (৬ মাসে), ৩য় (৮ মাসে) ও ৪র্থ পরিদর্শনের (৯ মাসে) সময় নির্ধারিত তারিখের তিন দিন আগে গর্ভবতী মায়ের মোবাইল ফোনে জানানো হবে। বাংলায় এসএমএসে জানানো হবে গর্ভবতী মাকে সেবা গ্রহণের জন্য কোথায় যেতে হবে। এমনকি সেবা প্রদানকারী ব্যক্তির ফোন নম্বর উল্লেখ থাকবে এসএমএসে। এছাড়া গর্ভবতী মা ও শিশু বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা কীভাবে পাবেন, কোন নম্বরে ফোন দিয়ে এ সেবা পাওয়া যাবে তাও উল্লেখ করা আছে। যদি নির্ধারিত স্থানে সেবা পাওয়া না যায় তাহলে সরাসরি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসনকে ফোন করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে এ সেবা শুধু গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার জনসাধারণ পাচ্ছেন। পরবর্তীতে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সারা দেশে এ সেবা ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (এমসিএইচ সার্ভিস) ডা. মোহাম্মদ শরিফ দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশকে  বলেন, এটি একটি অসাধারণ উদ্যোগ। আমরা এ হেলথ কার্ড কর্মসূচীকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেখছি। এটি সফল হলে পরবর্তী ওপিতে (অপারেশনাল প্লান) আমরা এটি সংযোজন করে সরকারি ভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। তিনি দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশকে বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি নিজ উদ্যোগে এটি করেছেন। এ কার্ডের মাধ্যমে গর্ভবতী মা ও শিশুকে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে আস্থা অর্জন করতে পারলে ওই মাকে আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা সহজ হবে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কাপাসিয়া উপজেলার কোনো গর্ভবতী প্রসবকালীন জটিলতায় প্রয়োজনীয় রক্তের অভাবে যেন মারা না যায় সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় ‘রক্তদান সেবা সংঘ’র ১৫শ’ বেশি রক্তাদাতার নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর এ কার্ডে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ের গর্ভবতী নারীরা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সংরক্ষণ করতে পারেন না। এ সমস্যা সমাধানে ‘সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্ড’-এ ব্যবস্থাপত্র সংরক্ষণে ১৬টি পৃথক পৃষ্ঠা রয়েছে। ফলে এক কার্ডেই গর্ভবতী মায়ের সব মেডিকেল রেকর্ড রক্ষিত থাকবে। ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা পারভেজ আহমেদ দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশকে জানান, স্থানীয়দের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানতে ২০১৭ সালে কাপাসিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে জরিপ চালানো হয়। এতে গর্ভবতী মায়ের প্রসব-পূর্ববর্তী, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে ২০টি প্রশ্নের একটি তথ্য ফরম ছিল। জরিপের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, শতভাগ মা গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময় বিভিন্ন সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করলেও কোনো ব্যবস্থাপত্র সংরক্ষণ করেন না। ৮৪ শতাংশ গর্ভবতী জানেন না প্রসব পূর্ববর্তী সেবা কখন কোথায় এবং কতবার নিতে হয়। জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্ড’ প্রদানের পরিকল্পনা করে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্প চালু করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দৈনিক আমার প্রানের বাংলাদেশকে বলেন, স্বাস্থ্য সেবায় এটি অনন্য একটি দৃষ্টান্ত। আমরা এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি এভাবে এগিয়ে আসেন তাহলে স্বাস্থ্য সেবায় দ্রুত ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব। স্বাস্থ্য কার্ড চালু প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি দৈনিক  আমার প্রানের বাংলাদেশকে বলেন, দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক হয়েছে, কিন্তু সেবা সীমিত। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পক্ষ থেকে অনেক কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এসব দেখেই মনে হয়েছে এ গুলোর সমন্বয় করতে পারলে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবায় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তিনি বলেন, এ কার্ড চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত রক্তের অভাবে কোনো গর্ভবতী মায়ের মৃত্যু ঘটেনি। তাছাড়া স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তারা এখন জানে চিকিৎসার জন্য কোথায় যেতে হবে। এ কার্ডের ফলে কাউকে আর ভুল করে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে হবে না।