Amar Praner Bangladesh

৪২ প্রকার পাখির ডাকসহ হাজারো গানের সুরে মুগ্ধ করেন বাঁশির ফেরিওয়ালা আশরাফ খান

মোঃ একরামুল হক মুন্সী, চিতলমারী (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ॥
নিজের তৈরী হরেক প্রকার বাঁশি বাজিয়ে হাটবাজারে ঘুরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন আশরাফ খান। বয়স এখন তাঁর ৫৫ বছর। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। এটাই তাঁর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ। বাঁশের বাঁশি ভর্তি ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে তিনি সারাবছর ঘুরে বেড়ান বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরে। বাঁশির সুরে তিনি ৪২ প্রকার পাখির ডাকসহ দেশত্ববোধক, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, বিচ্ছেদ, পল্লীগীতি, আধুনিক ও হিন্দি গানে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে তোলেন। বাঁশি ছাড়াও খালিমুখে বিভিন্ন পশু-পাখির ডাক শোনান দক্ষতার সাথে। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিজে শিখিয়ে দেন এই বিশেষ দক্ষতার কলাকৌশল।
গুনী লোকশিল্পী আশরাফ খান গত ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ বুধবার এসেছিলেন বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা সদরের হাটে। ডান কাঁধে তার ঝোলানো ছিল রঙিন বাঁশির ব্যাগ। দু’হাতের আঙ্গুলগুলো ব্যস্ত ছিল সুর তোলায়। কন্ঠ, জিহ্বা, ঠোঁট, মুখসহ নানা অঙ্গের কসরতে সৃষ্ট নানা সুর শ্রোতাদের সাবলীলভাবেই আকৃষ্ট করে তাঁর দিকে। চিতলমারী বাজারের অলিগলি ঘুরে তিনি শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রচেষ্টা করেন নিরলসভাবে।
চিতলমারী বাজার প্রদক্ষিনের অবসরে তিনি আসেন ‘চিতলমারীর অন্তরালে’ পত্রিকা অফিসে। পত্রিকার সম্পাদক মোঃ একরামুল হক মুন্সীর সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি তুলে ধরেন নানা বিষয়।
বাঁশির সুর আর বাঁশির বেসাতি নিয়ে পথচলা অনেক কষ্টসাধ্য। প্রধান বাধা আসে ধর্মীয় দিক থেকে। অনেকে তাঁকে বলে, বাঁশি বাজালে পাপ হয়- গুনাহ হয়, এটা না করা ভাল, ছেড়ে দাও- পরকাল বলে তো একটা জিনিস আছেই। তাৎক্ষনিক তাঁর মনে হয় এ পেশা ছেড়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সংসারে আর কোন আয়ের পথ খোলা নেই। এই বয়োঃবৃদ্ধ বয়সেও তাই তাকে রোজ কসরত করতে হয়। হাঁটতে হয় নানা হাট-বাজারে। তারপরেও ক্লান্তহীন তাঁর পথ চলা। আশরাফ খান বলেন, ‘‘বাঁশি আমার জীবন, বাঁশি আমার প্রাণ-একদিন বাঁশি বাজিয়ে মানুষের সামনে যেতে না পারলে মনে হয় আমি বেঁচে নেই!’’ বাঁশি বাজাতে বাজাতে তাঁর সামনের দাঁতগুলো ক্ষয়ে গেছে। এককালীন ৪০/৫০ হাজার টাকার উপকরণ ক্রয় করতে পারলে বাঁশি শিল্পকে আরো সমৃদ্ধ করা যেত বলে জানান এই লোকশিল্পী।
আশরাফ খান চিতলমারীর অন্তরালের সম্পাদককে আরো বলেন, গোপালগঞ্জ সদর থানা পাড়ার বাসিন্দা তার পিতা মরহুম সরদার খান। আমি গর্ববোধ করি যে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমিতেই আমার জন্ম হয়েছে। পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই ছেলে। বাড়িতে বসেই বাঁশি বানাই। মোহন বাঁশি, ক্লিংটিন কর্নেট, কোকিল বাঁশি, নাগিনীসহ নানা ধরনের বাঁশি করতে পারি। প্রতিটি বাঁশি ২০ টাকা থেকে একশ’ ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ’ টাকা আয় হয়। গোপালগঞ্জ শহরে সামান্য বসতঘর রয়েছে, এর বাইরে নেই কোন আবাদী জমি। বড় ছেলে নাদিম খান (২০) বেকার, মেজ ছেলে সবুর খান (১৮) বেকার, সেজ মেয়ে মুক্তা (১৬) বর্তমানে বিধবা, ছোটমেয়ে মুক্তি (১৫) সদ্য বিবাহিত এবং স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম গৃহিনী।