Amar Praner Bangladesh

৬ মাসে লোকসান ৮ হাজার কোটি, এখনও লিটারে ভর্তুকি ৮.১৩ টাকা!

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

 

সাধারণত প্রতি ব্যারেল ডিজেল ৭৪ দশমিক ৪ মার্কিন ডলারে স্থিতিশীল থাকলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দেশের বাজারে ৮০ টাকা লিটার বিক্রি করতে পারে। সেখানে গত ছয় মাসে প্রতি ব্যারেল ৯৭ ডলার থেকে বেড়ে ১৩৯ ডলারে ঠেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের এই অসম দাম বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বিপিসি।

সংস্থাটির হিসাবে, গত ছয় মাসে জ্বালানি তেল বিক্রিতে তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে ৮ হাজার ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এই পরিপ্রেক্ষিতে সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৩৪ টাকা থেকে লিটারে যথাক্রমে ৪৪ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বিপিসি বলছে, এই পরিমাণ দাম বৃদ্ধির পরেও ডিজেলে প্রতি লিটারে ৮ টাকা ১৩ পয়সা করে লোকসান গুনতে হবে।

বিপিসি’র তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল ও অকটেনের দাম দিগুণেরও বেশি বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ১০৮ দশমিক ৫৫ মার্কিন ডলার। আর প্রতি ব্যারেল অকটেন বিক্রি হয় ১০৮ দশমিক ৪ ডলারে। মার্চে ডিজেলের সেই দাম বেড়ে ১৩৭ দশমিক ৫৪ ডলারে গিয়ে ঠেকে। আর অকটেনের দাম গিয়ে পৌঁছায় ১২৭ দশমিক ৩৬ ডলারে। এপ্রিলে প্রতি ব্যারেল ডিজেল ছিল ১৪৪ দশমিক ৬৮ ডলার আর অকটেন ১২২ দশমিক ৬১ ডলার। মে মাসে ডিজেল ছিল ১৪৭ দশমিক ৭০ মার্কিন ডলার প্রতি ব্যারেল এবং অকটেন ১৪০ দশমিক ৯৬ ডলার। জুনে ডিজেলের দাম বেড়ে ১৭০ দশমিক ৭৭ ডলার স্পর্শ করে। ওই সময় অকটেনের দাম গিয়ে ঠেকে ১৪৮ দশমিক ৪৪ ডলার। সবশেষ জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেলে কিছুটা কমে ১৩৯ দশমিক ৪৩ এবং অকটেন ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়।

বিপিসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৪ দশমিক ৪ মার্কিন ডলার এবং অকটেন প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৮৪ ডলারে স্থিতিশীল থাকলে এই দুই ধরনের জ্বালানি যথাক্রমে ৮০ এবং ৮৯ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব। কিন্তু সে পরিস্থিতি না থাকায় বিপিসিকে ক্রমান্বয়ে লোকসান গুনতে হয়েছে। আর গত ছয় মাসে এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

এই লোকসানের বোঝা কমাতে গত শুক্রবার (৫ আগস্ট) দেশের সবধরনের জ্বালানির দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সেখানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১৪৪ টাকা, কেরোসিন ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোলে লিটার প্রতি ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।

বিপিসি বলছে, ডিজেলে লিটার প্রতি ১১৪ টাকা বাড়ানো হলেও তাকে এখনও প্রতি লিটারে ৮ টাকা ১৩ পয়সা লোকসান গুনতে হবে। উদাহরণ দিতে গিয়ে বলা হয়, গত ১২ জুলাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ডিজেল লিটার প্রতি ৯২ দশমিক ৭৬ রুপি বা তার সমান ১১৪ দশমিক শূন্য ০৯ টাকা (১ রুপি সমান ১.২৩ টাকা) বিক্রি করা হচ্ছে। যা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৩৪ দশমিক ০৯ টাকা বেশি এবং পেট্রোল লিটার প্রতি ১০৬ দশমিক ০৩ রুপি বা সমতুল্য ১৩০ দশমিক ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দাম বাংলাদেশের চেয়ে ৪৪ দশমিক ৪২ টাকা বেশি।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, বহু কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে দামের পার্থক্যের কারণে জ্বালানি তেলের পাচার রোধ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমান মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি ও অন্যান্য আয় খাত থেকে বিপিসির গড়ে মাসিক আয় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে জুলাইয়ে ঋণপত্র পেমেন্টসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জ্বালানি তেলের অর্থায়নের জন্য দুই মাসের আমদানি মূল্যের সমান হিসেবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংস্থান রাখা দরকার। বর্তমানে মূলধন কমে যাওয়ায় গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্প ও বিবিধ খাত থেকে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা তুলে ভুর্তুকিসহ জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ করা হয়। যে কারণে জুলাইয়ের হিসাবে সামগ্রিকভাবে বিপিসির হাতে যে ২২ হাজার কোটি টাকা রয়েছে তা দিয়ে সামনের দিকে জ্বালানি আমদানি অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া লোকসানের কারণে বর্তমানে তাদের হাতে যে অর্থ রয়েছে তা দিয়ে চলতি মাসের পর আর জ্বালানি আমদানি সম্ভব হবে না।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বছরে ৬২ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ৭২ শতাংশ ডিজেল, ৪ দশমিক ৮ শতাংশ অকটেন, ৬ শতাংশ অপরিশোধিত তেল। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান সৌদি অ্যারাবিয়ান অয়েল কোম্পানি-সৌদি অ্যারামকো এবং আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেড-অ্যাডনক থেকে এই তেল আমদানি করা হয়। এই পরিমাণ তেলের ৪০ লাখ টন আসে ডিজেল। আরও আমদানি করা হয় ফার্নেস অয়েল, পেট্রোলসহ কিছু তেল। এসব তেল কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (কেপিসি), মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড, চীনের পেট্রোচায়না, পিটিই লিমিটেড ও ইউনিপেক (সিঙ্গাপুর) ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভারত থেকেও কেনে বাংলাদেশ। এর বাইরে খোলা বাজার থেকেও তেল কেনা হয়।

বিপিসির সূত্র মতে, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের ৩০ লাখ ৩৬ হাজার পরিশোধিত তেল আমদানি করে। আর আট লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়।

উল্লেখ্য, বছরের পর বছর লোকসানে থাকা বিপিসি ২০১৪ সাল থেকে মুনাফার মুখ দেখতে শুরু করে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরের মে পর্যন্ত মুনাফা নেমে আসে ১ হাজার ২৬৩ কোটিতে। এরপর গত কয়েক মাসে প্রতিষ্ঠানটি যে লোকসানে পড়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে বড়ধরনের চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছেন নীতি নির্ধারকরা।